শরণার্থী শিবিরে শিশুদের দিকে তাকিয়ে দেখুন, তাদের ছোট্ট হাড় থেকে আলগা হয়ে ভাঁজে ভাঁজে ঝুলে পড়েছে ত্বক, এমনকি তাদের মাথা তোলার শক্তিও নেই। শিশুদের মা-বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখুন, তাদের সন্তান আর কখনো সুস্থ হয়ে উঠবে না, সেই হতাশা তাদের চোখে। আর সবচেয়ে করুণ দৃশ্যটি দেখুন–গত রাতে যে শিশুটি মারা গেছে তার মৃতদেহও এখানে। পূর্ব বাংলার ট্র্যাজেডি শুধু পাকিস্তানের জন্য ট্র্যাজেডি নয়, শুধু ভারতের জন্য ট্র্যাজেডি নয়, এটা সমগ্র বিশ্ব সম্পªদায়ের জন্য ট্র্যাজেডি–শরণার্থী শিবির ঘুরে এসে সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি এ কথাই বলেছেন।
বরেণ্য চিত্রগ্রাহক রোমানো ক্যানোনি লিখেছেন, ছয় মাস আমি বায়াফ্রাতে ছিলাম। আমি ভেবেছিলাম সে মাপের বড় ট্র্যাজেডি আমাকে আর দেখতে হবে না। শুরুতেই বাংলার অবস্থা যুদ্ধক্ষেত্রের বায়াফ্রার চেয়েও ভয়াবহ। শরণার্থীর প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ভারত সরকারের পরিসংখ্যানটি উৎসাহী পাঠক ও গবেষকদের কাজে লাগবে। সেই পরিসংখ্যান অনুযায়ী শরণার্থীর মোট সংখ্যা ৯৮ লাখ ৯৯ হাজার ৩১৫ জন।
শরণার্থীদের ফিরে আসতে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সত্যের সঙ্গে সম্পর্কহীন একটি হাস্যকর আহ্বান জানান:
‘গত মার্চে পূর্ব পাকিস্তানে রাষ্ট্রবিরোধীদের সহিংসতায় কিছুসংখ্যক নিরপরাধ মানুষ তাদের বাড়ি ছেড়ে আশপাশের এলাকায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। অনেক দুষ্কৃত ও অনুপ্রবেশকারী তাদের অপকর্মের পরিণতি বুঝতে পেরে ভারতে পালিয়ে গেছে। ভারতের প্ররোচনায় আরও কিছুসংখ্যক মানুষ পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক জীবন বিপন্ন করার উদ্দেশ্যে দেশ ছেড়েছে।
ভারত সরকার অত্যন্ত অতিরঞ্জিত ও বিকৃত তথ্য প্রচার করতে থাকলে এ সীমান্ত পারাপারের ঘটনা ঘটে। পূর্ব পাকিস্তান থেকে যারা ভারতে গিয়েছে তাদের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের বেকার ও গৃহহীন মানুষ যোগ করে ফাঁপিয়ে-ফুলিয়ে সংখ্যা বাড়াচ্ছে। এটা খুবই দুঃখজনক, মানবিক কারণে প্রকৃত শরণার্থীকে বিবেচনায় না এনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য প্রচার চালাচ্ছে। ভারত এ বিষয়টিকে নিয়ে খেলছে শুধু পাকিস্তানকে হুমকি দেওয়ার জন্য নয়, অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার জন্যও। যে লাখ লাখ ভারতীয় মুসলমানকে বাস্তুচ্যুত করা হয়েছে এবং তারা পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছে তাদের জন্য ভারত সরকারের কোনো উদ্বেগ দেখা যায়নি।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় যে, প্রেসিডেন্টের আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে প্রত্যাবাসনের জন্য ফিরে আসা শরণার্থীর সহায়তার জন্য সারা প্রদেশে ২০টি অভ্যর্থনা কেন্দ্র খোলা হয়েছে। যেসব স্থানে অভ্যর্থনা কেন্দ্র খোলা হয়েছে–খুলনা জেলার সাতক্ষীরা, যশোরে বেনাপোল, কুষ্টিয়ার চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর, রাজশাহীতে গোদাগাড়ী, রহনপুর ও ধামইরহাট, দিনাজপুরে খানপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, রংপুরে কালীগঞ্জ, ময়মনসিংহে নালিতাবাড়ী ও দুর্গাপুর, সিলেটে জৈন্তাপুর, কুলাউড়া ও চুনারুঘাট, কুমিল্লায় আখাউড়া ও বিবিরবাজার, নোয়াখালীতে ফেনী ও চট্টগ্রামে টেকনাফ। যে ভাষায় তাদের ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে তাতে আতঙ্কই বেশি ছড়িয়েছে।
ভারতীয় হিসাব অনুযায়ী, ২৫ মার্চ ১৯৭২ ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের শরণার্থীদের ৩ হাজার ৮৬৯ জনের একটি ব্যাচ বাংলাদেশের পথে ভারত ত্যাগ করে। ঠিক এক বছর আগে ২৫ মার্চ ১৯৭১ থেকে পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থী আসা শুরু হয়। ৩ হাজার ৮৬৯ জনের এ ব্যাচটিই শেষ ব্যাচ। এর পরপরই কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সব শরণার্থী শিবির বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ভারত থেকে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডকুমেন্ট, দ্বিতীয় খণ্ডে’ বলা হয়েছে আরও ৬০ হাজার শরণার্থী আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে রয়ে গেছে, তারা নিজেদের সুবিধামতো সময়ে দেশে ফিরবে।
২৫ মার্চ থেকে ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ পশ্চিমবঙ্গে ৭৪ লাখ ৯৩ হাজার ৪৭৪, ত্রিপুরায় ১৪ লাখ ১৬ হাজার ৪৯১, মেঘালয়ে ৬ লাখ ৬৭ হাজার ৯৮৬, আসামে ৩ লাখ ১২ হাজার ৭১৩, বিহারে ৮৬৪ জন শরণার্থী নিবন্ধিত হয়।
দেশছাড়া শরণার্থীদের সবাই শরণার্থী শিবিরে ঠাঁই পায়নি কিংবা থাকতে চায়নি। যাদের আর্থিক সংগতি ছিল বাড়ি ভাড়া নিয়ে তুলনামূলকভাবে উন্নততর জীবনযাপন করেছেন। আত্মীয় ও সুহৃদরা আশ্রয় দিয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শরণার্থী। ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর যারা শরণার্থী হয়ে পূর্ব বাংলায় এসেছিলেন তাদেরও কাউকে কাউকে পুনরায় শরণার্থী হয়ে পশ্চিমবঙ্গে ফিরে যেতে হয়েছে।
দিল্লি ছেড়ে যাওয়ার আগে সিনেটর কেনেডি বলেন, এর মধ্যেই তিনি পাকিস্তানে মার্কিন অস্ত্র সরবরাহের বিরোধিতা করেছেন এবং তিনি আরও বলেন: যেসব অস্ত্রের সরবরাহ ইতিমধ্যেই প্রক্রিয়াধীন তা বন্ধ করাসহ আগামীতে যাতে অস্ত্র সরবরাহ না হয় এবং একটি রাজনৈতিক সমাধান না হওয়া পর্যন্ত যেন আর্থিক সহায়তাও বন্ধ করা হয়, আমি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে সে লক্ষ্যে সব পদক্ষেপ গ্রহণ করব।
ক্রমবর্ধমান শরণার্থী ভারতের আর্থিক অবকাঠামের ওপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করে। শরণার্থীর উপস্থিতি এবং শরণার্থী আগমনের অব্যাহত ধারা ভারতের জন্য বহুমাত্রিক নিরাপত্তা সংকটের সৃষ্টি করে। বিদ্রোহীদের দমনের নামে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কার্যক্রম সীমান্ত ও সীমান্তসংলগ্ন এলাকাকে যুদ্ধাঞ্চল বানিয়ে রাখে।
নিকোলাস টোমালিন লিখেছেন, গত ৩০ বছরে পৃথিবী যত দুর্যোগ মোকাবিলা করেছে, তার মধ্যে ভয়াবহতমটি হচ্ছে পাকিস্তান সংকট। নৈতিকতার প্রশ্নেও এটি সবচেয়ে সরল। পাকিস্তানি জেনারেল–সেই খলনায়করা, যারা গত ২৫ মার্চ নিজ দেশবাসীর ওপর সামরিক আক্রমণের আদেশ দিয়েছেন, হিটলার-পরবর্তী যেকোনো সামরিক আগ্রাসনে, স্পষ্টতই সবচেয়ে বড় অন্যায় কাজটি করেছেন।
এর শিকার ভারতে আসা ৯০ লাখ শরণার্থী, পূর্ব পাকিস্তানে রয়ে যাওয়া সাড়ে ছয় কোটি বাঙালি–আমরা যা ভাবি তারা তার চেয়েও বেশি নিষ্পাপ, তার চেয়েও বেশি যন্ত্রণাক্লিষ্ট এবং সংখ্যায়ও তার চেয়ে বেশি। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, সাইক্লোন, চরম অবিচার, মানুষের ও পৃথিবীজুড়ে সরকারগুলোর উদাসীনতা মিলিয়ে পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, তা ভিয়েতনাম, বায়াফ্রা কিংবা গত ১৫ বছরে সংঘটিত যেকোনো রক্তাক্ত আফ্রিকান দ্বন্দ্বকে ছাড়িয়ে গেছে। এ বিশাল অতিনাটকীয় ট্র্যাজেডিতে যা নেই তা হচ্ছে একজন নায়ক এবং একটি সমাধান।
একজন স্থানীয় কূটনীতিক, যাকে দেখে মনে হয় পুনর্জন্ম পর্যন্ত একই রকম পরিশীলিত থাকবেন, তিনি আবেগের মধ্য দিয়ে যুদ্ধের কথা বলছেন। তিনি মনে করেন, এ নভেম্বরে ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে শুধু একটিই থাকবে, যদি এই নভেম্বরে না হয়, আগামী নভেম্বরে। তিনি যুক্তি দেখিয়ে বলেন, ভারত অনুৎপাদনশীল এই ৯০ লাখ নতুন মানুষের অর্থনৈতিক ভার বহন করতে কোনোভাবেই সক্ষম হবে না।
আসামে এর মধ্যে দাঙ্গা শুরু হয়েছে। সমতলের যেসব বাঙালি পালিয়ে আসামের পাহাড়ে এসেছে, আসামের মানুষ তাদের পছন্দ করছে না। এমনকি কলকাতার আশপাশের ক্যাম্পেও অবিরাম কলহ ও মারামারি লেগেই আছে। ভারতীয় কৃষকরা শুরুতে তাদের এই বিপদাপন্ন ভাইদের স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু এখন যখন দেখছে এই আগন্তুকরা নামমাত্র মজুরিতে তাদের কাজ নিয়ে নিচ্ছে, তাদের মাঠ নষ্ট করে ফেলছে, তাদের জিনিসপত্র নিয়ে যাচ্ছে, তখন শত্রুতা বাড়তে শুরু করে। এই কূটনীতিবিদ যুক্তি দিয়ে বলছেন, অতএব, এ কারণেই ভারত শিগগিরই পূর্ব পাকিস্তান ভূখণ্ডে সামরিক আক্রমণ চালাতে বাধ্য হবে।