দেশীয় ও বহুজাতিক তালিকাভুক্ত কোম্পানি থেকে বিদেশিদের বিনিয়োগ প্রত্যাহারের চাপেই বড় ধরনের পতন হয়েছে পুঁজিবাজারে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা নিষ্ক্রিয় থাকায় তৈরি হয়েছে ক্রেতাসংকট। ফলে গতকাল সোমবারও অধিকাংশ শেয়ারের দরপতনে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক (ডিএসইএক্স) ৬২ পয়েন্ট কমেছে। এতে সূচকটি ফিরে গেছে সোয়া তিন বছরের আগের অবস্থানে। টানা দুই দিনের বড় পতনে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। বিদেশিদের পাশাপাশি সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও পুঁজির নিরাপত্তায় শেয়ার বিক্রি করছেন।
গত রবিবার ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ৭৫ পয়েন্ট হারায়। এ নিয়ে গত সাত কার্যদিবসে সূচকটি ১৯৮ পয়েন্ট হারিয়েছে। সূচকের বড় ধরনের পতনের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল দুপুর ৩টায় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) চেয়ারম্যান ড. খায়রুল হোসেন। এ সময় ব্যাংকিং সচিবও উপস্থিত ছিলেন বলে জানিয়েছেন এসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সাইফুর রহমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, বৈঠকে পুঁজিবাজারকে সার্বিকভাবে সহায়তা দেওয়ার আশ্বস দিয়েছেন
অর্থমন্ত্রী। এ ছাড়া ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণ চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আবেদনটি অর্থ মন্ত্রণালয় যাচাই করছে।
এদিকে পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালনা পর্ষদও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গতকাল স্টক এক্সচেঞ্জটির পর্ষদ সভার সিদ্ধান্তে অর্থমন্ত্রী ছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গেও বৈঠক করবে।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিদেশিদের বিনিয়োগ রয়েছে এমন প্রভাবশালী কোম্পানিগুলোর শেয়ার দর গতকাল উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে। বিদেশিদের বড় অঙ্কের বিনিয়োগ থাকা কোম্পানিগুলোর বেশিরভাগেরই সূচকে বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে। বিদেশিদের পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপকরা জানিয়েছেন, চলতি বছরের মার্চ থেকেই বিদেশিরা শেয়ার বিক্রি করছেন। সম্প্রতি এর পরিমাণ বেড়েছে। আবার কোনো বিদেশি নতুন করে শেয়ার কিনছেনও। মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বিদেশিদের নিট বিক্রি ৮৭৭ কোটি টাকা। যা চলতি মাসেও অব্যাহত রয়েছে।
গতকাল সূচক পতনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে স্কয়ার ফার্মা, বিএটি বাংলাদেশ, গ্রামীণফোন, ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন, আইসিবি, বার্জার, অলিম্পিক, বেক্সিমকো ফার্মা, আল আরাফা ইসলামী ব্যাংক ও ম্যারিকো। ডিএসইতে গতকাল ৬৬ শতাংশ শেয়ারের পতনে প্রধান মূল্যসূচকটি ৪৫৩৩ পয়েন্টে নেমেছে, যা ২০১৬ সালের ৩১ আগস্টের পর সর্বনিম্ন। সে সময় ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ছিল ৪৫২৬ পয়েন্ট। দরপতনের সঙ্গে সঙ্গে ডিএসইতে কেনাবেচার পরিমাণও কমে গেছে। গতকাল ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ২৭৫ কোটি টাকা, যা আগের দিনের তুলনায় ২১ শতাংশ কম।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের রপ্তানি খাত ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার পাশাপাশি অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে নেতিবাচক পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে পুঁজিবাজারে। এ ছাড়া তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর একটি বড় অংশের নিট মুনাফাও কমে গেছে। এতে লভ্যাংশের হার কমার পাশাপাশি লভ্যাংশ না দেওয়া কোম্পানির সংখ্যাও বেড়েছে। এসব কারণেই পুঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। টানা পতনে চলতি বছর ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচকটি ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ পয়েন্ট হারিয়েছে। আগের বছরও সূচকটি ১৪ শতাংশের বেশি হারায়।
গতকালের দরপতনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা ছিল ব্যাংক খাতের। খাতটি গতকাল ২ দশমিক ১ শতাংশ বাজার মূলধন হারায়। এনবিএফআই হারিয়েছে ২ দশমিক ৪ শতাংশ দর। কাগজ ছাড়া জীবন বীমা, প্রকৌশল, খাদ্য, বস্ত্র, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, ফার্মাসিউটিক্যালসসহ সব খাতই দর হারিয়েছে।
গতকাল শেয়ার বিক্রির চাপ সবচেয়ে বেশি এসেছে লংকাবাংলা সিকিউরিটিজ থেকে। প্রতিষ্ঠানটি ১২ কোটি ৭৬ লাখ টাকার শেয়ার ক্রয়ের বিপরীতে বিক্রি করেছে ২১ কোটি ৯১ লাখ টাকার শেয়ার। এ ছাড়া প্রিমিয়ার ব্যাংক সিকিউরিটিজ ও জিকিউ সিকিউরিটিজ থেকেও শেয়ার বিক্রির চাপ ছিল।
বিভিন্ন পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপক সূত্রে জানা গেছে, অক্টোবরের পর থেকে স্কয়ার ফার্মার শেয়ার বিদেশিদের মধ্যে হাতবদল হচ্ছে। গত নভেম্বর থেকে বেড়েছে বিক্রিচাপ। কারণ হিসেবে তারা বলেছেন, নিট মুনাফায় গত কয়েক বছর ধরেই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি না থাকার ফলে কোম্পানিটির শেয়ার দর গত দুই বছর ধরেই ধারাবাহিকভাবে কমছে। গতকালও স্কয়ার ফার্মার শেয়ার দর ৩ দশমিক ৮ শতাংশ কমে ১৯১ টাকায় নেমেছে, যা গত দুই বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সব মিলিয়ে চলতি বছর এ কোম্পানিটি প্রায় ২০ শতাংশ দর হারিয়েছে।
সূচকে প্রভাব বিস্তারকারী আরেক কোম্পানি বিএটি বাংলাদেশ চলতি বছর প্রায় ১২ শতাংশ দর হারিয়েছে। এদিকে মোট শেয়ারের ৪৩ শতাংশের বেশি বিদেশিদের হাতে থাকলেও চলতি বছর ব্র্যাক ব্যাংকের দর কমেছে ৯ শতাংশ। বিদেশিদের প্রায় একই পরিমাণের শেয়ার ছিল খাদ্য খাতের কোম্পানি অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজে। চলতি বছর এ কোম্পানির উদ্যোক্তারা মামলায় জড়িয়ে পড়ায় শেয়ারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। নিট মুনাফায় ধারাবাহিকতা থাকলেও চলতি বছর কোম্পানিটির শেয়ার দর কমেছে ২৮ শতাংশ। গতকালও এর শেয়ার দর দুই শতাংশের বেশি কমেছে। এ কোম্পানি থেকেও বিদেশিরা বিনিয়োগ তুলে নিচ্ছেন। পাওনা নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির সঙ্গে বিরোধের জেরে গ্রামীণফোন লিমিটেডের শেয়ার চলতি বছর ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ দর হারিয়েছে।
সব মিলিয়ে চলতি বছরের দরপতনে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত ৮০ শতাংশের বেশি শেয়ারের দর কমেছে। এসব শেয়ারের দর গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনি¤œ অবস্থানে রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শেয়ার দর আরও কমতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা। এই অবস্থায় তারা বিষয়টি পর্যবেক্ষণের পরেই নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেবেন।
এ বিষয়ে ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজারের ওপর ভরসা রাখতে পারছেন না বিনিয়োগকারীরা। দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন নেতিবাচক খবরে তারা বিনিয়োগ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। এ ছাড়া শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বিমাতাসুলভ আচরণ, শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ও লভ্যাংশের পরিমাণ কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে তারা বাজারের ওপর আস্থা ধরে রাখতে পারছেন না। এমন পরিস্থিতিতে বাজারের তথা বিনিয়োগকারীদের আরও বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাওয়ার আগেই সরকারের শীর্ষ মহল থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।