ইসলামে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার তাগিদ

১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ পৃথিবীর মানচিত্রে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। স্বাধীনতা আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর জন্য এক বিশেষ নিয়ামত। কারণ প্রকৃতিগতভাবে মানুষ স্বাধীন। প্রত্যেক মানুষ মাতৃগর্ভ থেকে স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণ করে। এটাই মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। আল্লাহতায়ালা মানবজাতিকে সহজাত এমন প্রকৃতি দিয়েই সৃষ্টি করেছেন যে, সে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে নতি স্বীকার করতে চায় না। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভ…তি সব ধরনের পরাধীনতা ইসলামে সমর্থনীয় নয়।

ইসলাম মাতৃভূমির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জোরালো তাগিদ দিয়েছে। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরত করার পর মদিনাকে নিজের মাতৃভূমি হিসেবে গণ্য করেন এবং মদিনার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার জন্য সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ, আর মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষার তাগিদ থেকেই ইসলাম মানুষের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা ব্যক্তির মুখের দিকে তাকিয়ে, কারও চাপে বা তোষামোদে পড়ে অন্যের অধিকার বা স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপকে ইসলাম সমর্থন করে না। আর তা নেই বলেই ইসলাম মানুষের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পক্ষপাতী। সেই মূলনীতির আলোকে মানবসমাজ থেকে যাবতীয় অন্যায়ের মূল্যোৎপাটন করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান। কারণ, সব ধরনের শোষণ, নির্যাতন, অন্যায় ও অবিচারের মূলে রয়েছে জুলুম। পরাক্রমশালী শত্রুর অত্যাচার, পরাধীনতার শৃঙ্খল ও অন্যায় দ্বারা ব্যক্তির স্বাধিকার হরণ করা হয়। পরাধীনতা জুলুমের ক্ষেত্র প্রসারিত করতে সাহায্য করে। অথচ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং জুলুমের অবসান ঘটানো ইসলামের অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। তাই মানবজীবনে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র অতীব প্রয়োজনীয়। স্বাধীন রাষ্ট্র ছাড়া সুশৃঙ্খল ও সুসংগঠিত সমাজ তৈরি করা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের ইতিহাসে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ মুক্তিসংগ্রাম, গণ-আন্দোলন, স্বাধীনতা যুদ্ধ বা কঠিনতম কর্মের মধ্যে আত্মদানকারী অসংখ্য দেশপ্রেমিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মহান নেতাদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। আমাদের দেশ ও মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্য যারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন তাদের মর্যাদা অতি মহান। তারা দেশ ও জাতির গৌরব। ইসলামের দৃষ্টিতে তারা শহীদ, শাহাদতের সর্বোচ্চ মর্যাদায় তারা ভূষিত। দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মাতৃভূমি রক্ষার জন্য যারা আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রাম করে শাহাদাত বরণ করেন, তাদের সম্পর্কে কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তাদের তোমরা মৃত বলো না, বরং তারা জীবিত; কিন্তু তোমরা তা উপলব্ধি করতে পারো না।’–সুরা বাকারা: ১৫৪

১৯৭১ সালে যারা স্বাধীনতা অর্জনে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ অবদান রেখেছেন, তারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। সমগ্র জাতি তাদের কাছে চিরঋণী। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রাজনৈতিক হানাহানি ও ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত একটি দেশ রেখে যাওয়ার প্রত্যাশায় লাখো শহীদের আত্মত্যাগ আল্লাহতায়ালা কবুল করুন। স্বাধীনতা যুদ্ধে জীবন দিয়ে শহীদরা ত্যাগের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তার প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো প্রতিটি নাগরিকের পবিত্র দায়িত্ব। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছি? সামগ্রিকভাবে এর উত্তর সন্তােষজনক নয়।  স্বাধীনতার ৪৮ বছরে আমাদের যেমন সাফল্য রয়েছে, তেমনি ব্যর্থতাও আছে। খাদ্যোৎপাদনে সাফল্য, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস, শিক্ষার হার বৃদ্ধি, চিকিৎসাসেবার স¤প্রসারণ, ইন্টারনেট যোগাযোগ ও সামাজিক নেটওয়ার্ক সৃষ্টি, পোশাক খাতে সাফল্য প্রভৃতি আমাদের অনন্য অর্জন। এই অর্জনগুলোকে যেমন ধরে রাখতে হবে তেমনি এর পরিসর আরও সম্পªসারণ এবং সংহত করতে হবে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক শোষণ ও বৈষম্য দূরীকরণ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল চেতনা। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও দেশে গণতন্ত্র পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হয়নি, অনেক মৌলিক মানবাধিকার থেকে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী এখনো বঞ্চিত। ভিন্নমতের দলন নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় এবং সমাজে প্রতিহিংসা এখন চরম আকার ধারণ করেছে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

দেশে শিক্ষার হার বেড়েছে, কিন্তু এর মানের অবনতি এবং নৈতিক অধঃপতনের হার বেড়েছে অনেকগুণ বেশি। ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান ব্যাপকতর হয়েছে। মাদকাসক্তি, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। বিজয়ের এই মাসে আমাদের নিরন্তর কামনা, আমরা এই অবস্থা থেকে অব্যাহতি চাই। সেই সঙ্গে অতীতের ব্যর্থতার সব গস্নানি ভুলে ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাই। দলমত নির্বিশেষে সবাই যদি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সব ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে দুষ্কৃতির মূলোৎপাটন ও সুকৃতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মানবাধিকার এবং ইনসাফভিত্তিক সমাজ কায়েমের চেষ্টা করি তাহলেই কেবল আমরা ভোগ করতে পারব স্বাধীনতার সুফল।

শাহীন হাসনাত : মুফতি ও ইসলামবিষয়ক লেখক