পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘সান্ধ্যকালীন কোর্স’ বন্ধ করা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা-সমালোচনা চলছিল। বিভিন্ন সময়ে নানা ছাত্রসংগঠন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সান্ধ্যকালীন কোর্স বন্ধের দাবিতে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ-আন্দোলনও করেছেন। কিন্তু এতদিন এ বিষয়ে সরকার বা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন-ইউজিসির কোনো সুস্পষ্ট অবস্থান দেখা যায়নি। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি ও আচার্য মো. আবদুল হামিদ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গণহারে চালু হওয়া সান্ধ্য কোর্সের কড়া সমালোচনা করেন। তার সমালোচনার দুই দিনের মাথায় ইউজিসি বলেছে, সান্ধ্যকালীন কোর্স পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশিষ্ট্য ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে বিধায় এসব কোর্স বন্ধ হওয়া বাঞ্ছনীয়। একইসঙ্গে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব কোর্স বন্ধ করতে ১৩ দফা পরামর্শ দিয়েছে তারা। ইউজিসির এই নির্দেশনা তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, তড়িঘড়ি করে দেওয়া এই নির্দেশনায় এই সংকট থেকে উত্তরণের কোনো সুস্পষ্ট পথনির্দেশ মেলেনি।
ইউজিসির পরামর্শপত্রের ১৩ দফায় সান্ধ্যকালীন কোর্স বিষয়ক প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো হলো– পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন অনুষদ, বিভাগ, প্রোগ্রাম বা ইনস্টিটিউট খোলার ক্ষেত্রে ইউজিসির পূর্বানুমোদন নিতে হবে। নতুন পদ সৃজনে পূর্বানুমোদন, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ এবং পদোন্নতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন এবং সরকারের নিয়মনীতি প্রতিপালন করতে হবে। সরকারি আর্থিক বিধিমালা অনুযায়ী আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। এ বিষয়গুলো সান্ধ্যকালীন কোর্সের সঙ্গে যতটা সম্পর্কিত ঠিক ততটাই সাধারণভাবে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রেও অনুসরণীয়। বাকি প্রসঙ্গগুলো মূলত ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশ ও অন্যান্য বিষয়ে। এখন প্রশ্ন হলো, যেসব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সান্ধ্যকালীন কোর্স পরিচালনা করছে তারা রাতারাতি এসব কোর্স বন্ধ করে দিতে পারবে কি না? সেটা যেহেতু সম্ভব নয় সেক্ষেত্রে কোন নীতিমালা অনুসরণ করে এসব কোর্স বন্ধ করা হবে? একইসঙ্গে এই প্রশ্নও জরুরি যে, বিভিন্ন পেশাজীবীর জন্য পরিচালনা করা ‘প্রফেশনাল ডিগ্রি’ এবং নানা বিষয়ের সাধারণ ‘মাস্টার্স ডিগ্রি’ উভয়ক্ষেত্রে কি একই নীতি অনুসরণ করা হবে? অর্থাৎ সব সান্ধ্যকালীন কোর্সই কি বন্ধ করে দেওয়া হবে নাকি এ বিষয়ে একটা সুস্পষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করা হবে? ইউজিসি এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অবশ্যই এসব প্রশ্নের বিহিত করতে হবে।
বলা হয়ে থাকে, দেশে মানসম্মত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাবের কারণে শিক্ষার্থীদের চাহিদা পূরণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সান্ধ্যকালীন কোর্স চালু করেছে। অন্যদিকে, এই আলোচনাও রয়েছে যে, চাকরির বাজারে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি বা সনদের উচ্চমূল্যই অনেক শিক্ষার্থীকে এসব কোর্স করতে উৎসাহিত করে থাকে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব কোর্সের মাধ্যমে পেশাজীবীদের জন্য বিশেষায়িত শিক্ষার অভাব পূরণের কথাও বলা হয়। এসব আলোচনায় কয়েকটি বিষয় উপেক্ষিত থেকে যায়। প্রথমত, দেশে বর্তমানে পাবলিক ও প্রাইভেট মিলিয়ে প্রায় দেড় শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও ‘মানসম্মত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান’-এর অভাব থেকে গেল কেন? তাহলে কি বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না? দ্বিতীয়ত, পেশাজীবীদের জন্য বিশেষায়িত কোর্স পরিচালনা করার জন্য বিভিন্ন ইনস্টিটিউট, গবেষণাকেন্দ্র বা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ না দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলো কেন? তৃতীয়ত, সান্ধ্যকালীন কোর্স পরিচালনা করা হয়ে থাকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষা ব্যয়ের তুলনায় অনেক বেশি টিউশন ফির বিনিময়ে; যা এসব কোর্স চালুর অন্যতম মূল প্রণোদনা বললেও অত্যুক্তি হবে না। এ নীতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে না কেন?
দেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সামগ্রিক সংকট থেকে আলোচ্য বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই। নব্বই দশকের পর দেশে একের পর এক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে উচ্চশিক্ষার দৃশ্যপট বদলে যেতে থাকে। শুরু থেকেই নামকরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক চাহিদার বড় অংশ পূরণ করে আসছেন। অস্বীকার করার উপায় নেই, এক্ষেত্রে বাড়তি আয়-উপার্জন শিক্ষকদের ড়্গেত্রে বড় প্রণোদনা হিসেবে কাজ করেছে। এর ধারাবাহিকতায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেরাই সান্ধ্যকালীন কোর্স চালু করে শিক্ষকদের বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা চালু করেছে। কিন্তু এ ব্যবস্থা একই বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই ধরনের শিক্ষার্থী ও দুই রকম শিক্ষার এক অভূতপূর্ব দ্বৈতনীতির জন্ম দিয়েছে। এই প্রশ্নে কেউ কর্ণপাত করেননি যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কেন উপার্জনের জন্য দিনে-রাতে দুই বেলা শ্রেণিকক্ষে পড়াতে হবে? তাহলে তারা জ্ঞান-বিজ্ঞানের মৌলিক গবেষণার সময় পাবেন কীভাবে? একইসঙ্গে এই প্রশ্নও জরুরি যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতনকাঠামো এবং শিক্ষা ও গবেষণার জন্য অন্যান্য ভাতা-প্রণোদনা কেন পর্যাপ্ত নয়?
বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য কেবল শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের পাঠ দেওয়া নয়; বরং জ্ঞানচর্চা করা, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিবিড় আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে সেই জ্ঞানের চর্চা হবে এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণার মধ্য দিয়ে নতুন জ্ঞান বিকাশের পথ তৈরি হবে। এজন্য শ্রেণিকক্ষের মতোই বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক জ্ঞানতাত্ত্বিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক পরিসরও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তাই ডিগ্রি বা সনদ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত না করে শিক্ষা ও গবেষণামুখী করা জরুরি। এজন্য শুধু সান্ধ্যকালীন কোর্সই নয় বরং দেশের উচ্চশিক্ষা পদ্ধতি ও পরিবেশের সামগ্রিক মূল্যায়ন জরুরি।