যশোরের চৌগাছায় একটি ডাকাতি মামলার আসামি আবদুল আজিজের পরিবর্তে আরেক আবদুল আজিজকে আটক করে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ। শুধু নামের মিল থাকায় নিরপরাধ দিনমজুর আবদুল আজিজকে গত ৯ ডিসেম্বর গ্রেপ্তারের পর কারাগারে পাঠায় চৌগাছা থানা পুলিশ। অন্যদিকে ওই মামলার প্রকৃত আসামি আবদুল আজিজ দেড় বছর আগেই কাতারে পালিয়ে গিয়ে প্রবাস জীবন কাটাচ্ছেন। তবে পুলিশের ভাষ্য, নাম-ঠিকানা মিলিয়ে দেখার পরই দিনমজুর আবদুল আজিজকে আটক করা হয়েছে। তিনি যদি মামলাটির প্রকৃত আসামি না হন, তাহলে তাকেই আদালতে তার প্রমাণ দিতে হবে। পুলিশের কিছুই করার নেই।
প্রকৃত আসামি আবদুল আজিজের আইনজীবী ছিলেন যশোর বারের সাবেক সম্পাদক শাহিনূর আলম শাহিন। তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান, ২০০৯ সালের ২২ অক্টোবর রাতে যশোরের বাঘারপাড়ার নারিকেলবাড়িয়া গ্রামের লোহিতমোহন সাহার ছেলে নবকুমার সাহার বাড়িতে ডাকাতি হয়। এ ঘটনায় পরদিন নবকুমার সাহা বাদী হয়ে অজ্ঞাত পরিচয় কয়েকজনকে আসামি করে বাঘারপাড়া থানায় একটি মামলা করেন। মামলা নম্বর জিআর-১২৭/০৯। পরে ২০১১ সালের ৩০ মার্চ ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই গাজী আবদুল কাইয়ুম নয়জনকে অভিযুক্ত করে লুটতরাজ ও বিস্ফোরক আইনে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। এতে সাত নম্বর আসামি করা হয় যশোরের চৌগাছার সিংহঝুলি গ্রামের আহাদ আলী কারিগরের ছেলে আবদুল আজিজকে। অভিযোগপত্রে এই আজিজের বয়স উল্লেখ করা হয় ৩০ বছর। অভিযোগপত্র দাখিলের পর মামলাটি জেলা ও দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হয়। সেখানে মামলাটির নম্বর হয় এসটিসি ৬১/১২। আদালত পলাতক আসামি আবদুল আজিজসহ অন্যদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালের ১ মার্চ পুলিশ আবদুল আজিজকে গ্রেপ্তারের পর কারাগারে পাঠায়। একই বছরের ৫ মার্চ তিনি জামিনে মুক্তি পান। আইনজীবী শাহিনূর আলম শাহিন তার পক্ষে ওকালতনামা ও জামিননামা দাখিল করেন। তখন থেকে আবদুল আজিজ আদালতে নিয়মিত হাজিরা দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু বছর দেড়েক আগে আসামি আবদুল আজিজ কাতারে চলে যান। তার গ্রাম সিংহঝুলির একাধিক বাসিন্দা দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য জানিয়েছেন। আর কাতারে চলে যাওয়ায় আসামি আবদুল আজিজ আদালতে গরহাজির থাকেন। ফলে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত-৪ চলতি বছরের ৭ নভেম্বর তার বিরুদ্ধে ফের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। ওই পরোয়ানার ভিত্তিতে গত ৯ ডিসেম্বর রাতে চৌগাছা থানার এএসআই আজাদ প্রকৃত আসামি আহাদ আলী কারিগরের ছেলে আবদুল আজিজকে বাদ দিয়ে মৃত আহাদ আলী দফাদারের ছেলে আবদুল আজিজকে গ্রেপ্তার করেন। পরদিন নিরপরাধ আবদুল আজিজকে আদালতে হাজির করা হয়। সেদিন জজ আদালত অবকাশকালীন বন্ধ থাকায় ম্যাজিস্ট্রেট আদালত আবদুল আজিজকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। এরপর থেকে নিরপরাধ আবদুল আজিজ কারাগারে বন্দি।
সিংহঝুলি গ্রামের বাসিন্দারা জানান, প্রকৃত আসামি আবদুল আজিজের বর্তমান বয়স প্রায় ৪০ হলেও নিরপরাধ আবদুল আজিজের বয়স প্রায় ৬১ বছর। আর আসামি আবদুল আজিজের বাবা আহাদ আলী কারিগর জীবিত। কিন্তু নিরপরাধ আবদুল আজিজের বাবা আহাদ আলী দফাদার মারা গেছেন। এক্ষেত্রে ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করলেই পুলিশ তাদের ভুল বুঝতে পারত।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নিরপরাধ আবদুল আজিজকে আটক করা চৌগাছা থানার এএসআই আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওয়ারেন্ট এবং ওই ব্যক্তির (নিরপরাধ আবদুল আজিজ) জাতীয় পরিচয়পত্র ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের সময় তিনিই স্বীকার করেছেন তার নামে একটি মামলা ছিল, যা তিনি মিটিয়ে ফেলেছেন। এছাড়া গ্রেপ্তার আবদুল আজিজের পরিবার থেকেও জানানো হয়নি যে, সে মামালার আসামি নয়।’
এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘গ্রেপ্তার আবদুল আজিজ যদি মামলার আসামি না হন তাহলে তাকে আদালতে প্রমাণ করতে হবে। নাম-ঠিকানা মিল থাকার কারণে আমাদের কিছুই করার নেই।’
তবে নিরপরাধ আজিজের স্ত্রী জলি বেগম এএসআই আজাদের ভাষ্যকে মিথ্যা বলে জানিয়েছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আটকের সময় আমরা অনুরোধ করে পুলিশকে বলি, তিনি (নিরপরাধ আজিজ) দিনমজুরি করে সংসার চালান। তার নামে কোনো মামলা নেই। পুলিশের ভুলেই তিনি দোষ না করেও এখন জেল খাটছেন।’