রাজধানীর বনানীতে নিহত চীনা ব্যবসায়ী জিয়ানহু গাওয়ের (৪৭) প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা তার ব্যবসায়িক অংশীদার বা অংশীদাররা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গত কয়েক দিন ধরে নিহত গাওয়ের স্বজনরা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে এমন অভিযোগ করেছেন। এ তথ্য জানিয়েছেন ডিবির উত্তর বিভাগের উপ-কমিশনার মশিউর রহমান। তিনি গতকাল শনিবার রাতে মোবাইল ফোনে দেশ
রূপান্তরকে বলেন, ‘নিহত চীনা ব্যবসায়ীর স্বজনদের এসব অভিযোগ আমরা খতিয়ে দেখছি। এখনো এ বিষয়ে নিশ্চিত করে বলার মতো সময় হয়নি।’
এদিকে গাওয়ের হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা শনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত মরদেহ সৎকার করবেন না তার পরিবারের সদস্যরা। তার স্ত্রী ও স্বজনদের উদ্ধৃত করে গতকাল তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য জানান। তিনি জানান, গাওয়ের খুনি কে বা কারাÑ এটি নিশ্চিত হওয়ার জন্যই তার স্বজনরা অপেক্ষা করছেন। তাদের ধারণা, তার ঘনিষ্ঠ লোকজনই এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত। তাই খুনি বা খুনিরা শনাক্ত হওয়ার পরই মরদেহ সৎকার করবেন তারা। তাদের বিশ্বাস, এতে তার আত্মা শান্তি পাবে। এ বিশ্বাস থেকেই স্বজনরা আপাতত তার মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেখেছেন। এ বিষয়ে গাওয়ের স্ত্রী কিংবা মামলার বাদী জং সু হং কারও সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মরচুয়ারির দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, চীনা ব্যবসায়ীর মরদেহ কিছুদিন ফ্রিজিং করে রাখার জন্য নির্দেশনা দিয়ে গেছেন তার পরিবার ও ঘনিষ্ঠ লোকজন। তবে কী কারণে মরদেহ নিয়ে যাচ্ছেন না, সে বিষয়ে কিছু জানাননি তারা।
বনানী থানার ওসি নূরে আযম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটি তাদের আবেগের বিষয়। আমরা এ হত্যারহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সার্বক্ষণিকভাবে চীনা দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে চলেছি। খুনিদের শনাক্তে তাদের সহায়তা নিচ্ছি।’ তদন্তকারী ডিবির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ব্যবসায়িক অংশীদারদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জের ধরে জিয়ানহু গাও হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এ কারণে তার ব্যবসায়িক অংশীদার অনেককেই জিজ্ঞাসাবাদ শেষে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। পলাতক আরেক চীনা নাগরিককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চীনা দূতাবাসের সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে।
গত বুধবার পুলিশ বনানীর ২৩ নম্বর রোডের ৮২ নম্বর বাড়ির উত্তর পাশ থেকে জিয়ানহু গাওয়ের মাটিচাপা দেওয়া লাশ উদ্ধার করে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক সোহেল মাহমুদ গতকাল দুপুরে সাংবাদিকদের প্রশ্নে বলেন, জিয়ানহু গাওকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। তার গলায় শ্বাসরোধকারী ব্যক্তির আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, চীনা ব্যবসায়ী জিয়ানহু গাওকে গত মঙ্গলবার গভীর রাতের যেকোনো সময় তার বাসায়ই হত্যা করা হয়। এরপর লাশ গুমের জন্য বাসার নিচে খালি জায়গায় মাটিচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সকাল হয়ে যাওয়ায় কিংবা লোকজনের উপস্থিতির আশঙ্কা করে একাধিক খুনি ঠিকমতো লাশ মাটিচাপা না দিয়েই পালিয়ে যায়।
রাজধানীতে অবস্থানরত চীনা ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে এই হত্যাকা-ের ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার জং সু হং নামে এক ব্যক্তি বনানী থানায় মামলা করেন। মামলার বাদী জং সু হং উত্তরার সুমেক লিয়াজোঁ অফিস নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কান্ট্রি ম্যানেজার। এজাহারে তিনি বলেন, ‘আমরা গত বুধবার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে গাওয়ের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করি। কিন্তু তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এ সময় তার কয়েক বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করি। কিন্তু কেউই তার খোঁজ দিতে পারেননি। এরপর আমি উত্তরা থেকে বনানীতে তার ফ্ল্যাটে যাই। এ সময় সেখানকার কয়েকজন আমাকে বলেন, ভবনের উত্তর পাশে একজনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। পরে পুলিশ ও সিআইডিকে জানালে তারা ওই লাশ উদ্ধার করে জানতে পারেন তিনিই জিয়ানহু গাও।’