একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ঢাকার রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুই শিক্ষক-ছাত্র শহীদ হন। তারা হলেন কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ মনজুরুর রহমান ও সাবেক শিক্ষার্থী নিজামউদ্দিন আজাদ। এদের মধ্যে মনজুরুর রহমান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। সে সময় একদিন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কলেজে ঢzকে নির্মমভাবে হত্যা করে নিরীহ এ শিক্ষককে। তার হাত ধরেই এ ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠা পায়। অন্যদিকে একাত্তর সালের ১১ নভেম্বর ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের প্রশিক্ষিত গেরিলা বাহিনীর একটি গ্রুপের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রবেশের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রামের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে বেতিয়ারা নামক স্থানে শহীদ হন নয়জন মুক্তিযোদ্ধা। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন নিজামউদ্দিন আজাদ।
মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ও মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্যোগে এ দুই শহীদের নামে কলেজের দুটি ছাত্রাবাসের নামকরণ করা হয়। এর মধ্যে বড় ছাত্রাবাস জিন্নাহ হাউজের নাম বদলে রাখা হয় ‘শহীদ কর্নেল রহমান হাউজ’ এবং অপেক্ষাকৃত ছোট আইয়ুব হাউজের নাম বদলে ‘শহীদ নিজামউদ্দিন আজাদ হাউজ’ রাখা হয়। কলেজের ওয়েবসাইটে প্রিন্সিপালের তালিকায় এখনো ‘শহীদ লেফটেন্যান্ট কর্নেল মনজুরুর রহমান’ লেখা রয়েছে।
জাতীয় পার্টির প্রয়াত চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮২ সালে ক্ষমতায় এসে ভবন দুটি থেকে শহীদের নাম মুছে ফেলেন। শহীদ কর্নেল রহমান হাউজের নামফলকে ‘কুদরত-এ-খুদা হাউজ’ বসিয়ে দেওয়া হয় এবং নিজামউদ্দিন আজাদ হাউজের নাম রাখা হয় ‘জয়নুল আবেদিন হাউজ’।
তখন এ দুই শহীদের নাম মুছে ফেলার ঘটনায় এ দুই শহীদের সাবেক শিক্ষার্থী ও সহপাঠীরা প্রতিবাদ জানালেও তা কর্ণপাত করেনি এরশাদ সরকার। এরশাদ সরকারের পতনের পর গত ২৯ বছরেও শহীদদ্বয়ের নাম পুনর্বহাল করেনি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সরকারও। কলেজ কর্তৃপক্ষও কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ওই কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী এবং বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের বর্তমান ও বিএনপির তৎকালীন কয়েকজন মন্ত্রীকে বারবার বিষয়টি জানানো হয়েছে। তারাও এ ব্যাপারে এগিয়ে আসেননি।
গত দুদিন ঢাকা রেসিডেনসিয়াল স্কুল ও কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী, দুই শহীদের নামে রাখা হলের আবাসিক ছাত্র এবং দুই শহীদের সহপাঠীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
ছাত্রাবাস থেকে দুই শহীদের নাম মুছে ফেলার ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজী শামীম ফরহাদ। গত শনিবার তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন যে নাম আছে, সেটা অফিশিয়ালি নাম। এর আগে কোনো নাম ছিল কি না, থাকলে কেন নাম বদলানো হয়েছে, তা কাগজপত্র না দেখে বলতে পারব না। কীভাবে নাম বদলে ফেলা হলো, সেটা দেখব। তাছাড়া যে নামের কথা বলা হচ্ছে, সেটা অফিশিয়ালি গেজেট হয়েছিল কি না, সেটাও দেখব।’ তবে এ নিয়ে কলেজের কোনো শিক্ষকই কথা বলতে চাননি।
বিষয়টি নিয়ে ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক ছাত্র ও বর্তমানে লার্ন এশিয়ার সিনিয়র পলিসি ফেলো আবু সাঈদ খান গত শনিবার তার ফেইসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘গণভবনের ঠিক উল্টোদিকে ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল ও কলেজ। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এজুকেশন কোরের লে. কর্নেল মোহাম্মদ মনজুরুর রহমান ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল (১৩ই মার্চ, ১৯৬১-৩০শে এপ্রিল, ১৯৬৩)। এই বিদ্যাপীঠের যাত্রা শুরু হয় দুটি ছাত্রাবাস দিয়ে। বড়টির নাম জিন্নাহ হাউজ আর অপেক্ষাকৃত ছোটটি আইয়ুব হাউজ। মুক্তিযুদ্ধের সময় লে. কর্নেল রহমান ছিলেন ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের প্রিন্সিপাল। পাকসেনারা নিরীহ কর্নেল রহমানসহ তিনজন শিক্ষককে ক্যাডেট কলেজের ভেতরেই হত্যা করে। রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুলের ছাত্র নিজামুদ্দিন আল আজাদও (নিজামউদ্দিন আজাদ) মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে শহীদ হন। তাদের স্মরণে স্বাধীনতার পর জিন্নাহ হাউজের নাম বদলে কর্নেল রহমান হাউজ এবং আইয়ুব হাউজের নাম নিজামুদ্দিন আল আজাদ হাউজ রাখা হয়। আমি কর্নেল রহমান হাউজের একজন গর্বিত প্রাক্তন আবাসিক ছাত্র।’
ফেইসবুকে তিনি আরও লেখেন, ‘গত ২০১০ সালে এই বিদ্যামন্দিরের সুবর্ণজয়ন্তী অর্থাৎ ৫০ বছর পালিত হয় জাঁকজমকের সাথে। অনুষ্ঠানের চাঁদা দিতে গিয়ে ছেলেবেলার স্মৃতিবিজড়িত ছাত্রাবাসটি দেখে চমকে গেলাম। কর্নেল রহমানের নামফলকে কুদরত-এ-খোদা বসিয়ে দেওয়া হয়েছে আর নিজামুদ্দিন আল আজাদকে হটিয়েছে জয়নুল আবেদিন। খোঁজ নিয়ে জানলাম সামরিক শাসক এরশাদ এই ঘৃণ্য অপকর্মটি করেছে। কিন্তু সেটা তো এক দশকেরও আগের কথা। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের এই দুই শহীদের নাম পুনরুদ্ধার করা হয়নি কেন?’
এ ব্যাপারে আবু সাঈদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশ স্বাধীনের পর ’৭২ সালে হল দুটির নাম দুই শহীদের নামে রাখা হয়। আমি নিজে ’৭৩ থেকে ’৭৬ সাল পযন্ত শহীদ কর্নেল রহমান হাউজের বোর্ডার ছিলাম। গত ২০১০ সালে কলেজের সুবর্ণ জয়ন্তীর চাঁদা দিতে গিয়ে প্রথম চোখে পড়ল হল দুটি আর তাদের নামে নেই। দুই ছাত্রাবাসের নামই বদলে ফেলা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানলাম সামরিক শাসক এরশাদ এই ঘৃণ্য অপকর্মটি করেছে। কিন্তু পরে আর দুই শহীদের নাম পুনরুদ্ধার হয়নি। খুব কষ্ট পেয়েছি। মনের দুঃখে পরে আমি আর সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানেই যাইনি। কোনোদিনই আর সেখানে যাওয়ার রুচি হয়নি।
দুই শহীদের নামে হলের নামকরণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন একাত্তরের গেরিলা যোদ্ধা ও ক্রাক প্লাটুন বাহিনীর সদস্য হাবিবুল আলম বীরপ্রতীক। তিনি রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুলে শহীদ নিজামউদ্দিন আজাদের এক ব্যাচ জুনিয়র ছিলেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, যতদূর মনে পড়ে, দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালের দিকে আমি ও আমাদের আরেক সহপাঠী মুক্তিযোদ্ধা শমসের মবিন চৌধুরী বীরবিক্রমসহ কয়েকজন গিয়ে দুই হলের নাম দুই শহীদের নামে লিখে দিয়ে এসেছিলাম। জিন্নাহ হাউজের নাম রাখি মনজুরুর রহমান স্যারের নামে ‘শহীদ কর্নেল রহমান হাউজ’ ও আইয়ুব হাউজের নাম ‘শহীদ নিজামউদ্দিন আজাদ’। পরে যতদূর মনে পড়ে এরশাদ সরকারের সময় ’৮৫-৮৬ সালের দিকে শহীদের নামটা বদলে ফেলা হয়।
‘যখন নাম বদলানোর খবর পেলাম, তখন আমরা প্রতিবাদ করেছি। কলেজে গিয়ে শহীদের নাম পুনর্বহালের দাবি জানিয়ে এসেছি। তখনকার প্রিন্সিপাল কথা দিয়েছিলেন, তিনি করবেন। কিন্তু এখনো করেননি। এটা মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অবমাননাকর। কলেজ কর্তৃপক্ষের উচিত এ ব্যাপারে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া’– বলেন এই মুক্তিযোদ্ধা।
এই কলেজের সাবেক শিক্ষার্থীরা আরও জানান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছেলে শেখ জামাল, বর্তমান সরকারের দুই মন্ত্রী ও বিএনপির সাবেক মন্ত্রী এবং পদকপ্রাপ্ত অনেক মুক্তিযোদ্ধা এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ছিলেন।
হাবিবুল আলম বীরপ্রতীকের সঙ্গে কথা বলে ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র (অষ্টম খণ্ড) থেকে জানা যায়, কর্নেল মনজুরুর রহমান ১৯৬১ সালের ১৩ মার্চ থেকে ১৯৬৪ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। পরে তার হাত ধরেই ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়। তিনি ছিলেন এই ক্যাডেট কলেজের তৃতীয় অধ্যক্ষ। ১৯৭১ সালের ১৮ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী গেট ভেঙে কলেজে ঢুকে অধ্যক্ষ, এক শিক্ষক ও এক বাবুর্চিকে বাংলোর নিচে নিয়ে যায়। সেখানে শিক্ষককে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারতে থাকলে অধ্যক্ষ প্রতিবাদ করেন এবং কষ্ট দিয়ে না মেরে একবারে গুলি করে মেরে ফেলার অনুরোধ জানান। পরে তারা অধ্যক্ষ মনজুরুর রহমানকেও গুলি করে হত্যা করে।
অন্যদিকে শহীদ নিজামউদ্দিন আজাদ রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুলের ছাত্র ছিলেন। সেখান থেকে ম্যাট্রিক পাস করে ঢাকা কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পড়েন। পরে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। ১৯৭১ সালের ১১ নভেম্বর সম্মুখযুদ্ধের একপর্যায়ে তিনি না পালিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর বিপক্ষে প্রতিরোধব্যূহ রচনা করে নিজের যোদ্ধাদের নিরাপদে পশ্চাদপসরণের সুযোগ করে দেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার অস্ত্র নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে এবং আহতাবস্থায় শত্রু বাহিনী তাকে গ্রেফতার করে। এরপর বহু অনুসন্ধানের পরও তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।