আসামে কী হচ্ছে

জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর নতুন করে উত্তপ্ত ভারত। এবারের ইস্যু বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল (ক্যাব)। যার মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার সংবিধানে সাম্প্রদায়িকতার কালি লেপন করল ক্ষমতাসীন বিজেপি। ক্যাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-বিক্ষোভে ফুঁসছে গোটা ভারত। অগ্নিগর্ভ রূপ ধারণ করেছে দিল্লি থেকে পশ্চিমবঙ্গ। জ্বলছে উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলো, বিশেষ করে আসাম। তবে এই প্রতিবাদ-বিক্ষোভে আছে ভিন্ন রাজনীতি, আছে ভিন্ন ভাষা। সংখ্যালঘু মুসলিমদের অধিকার রক্ষায় ভারতীয় জনতার আওয়াজের বিপরীতে ক্যাবকে ঘিরে রাজ্যগুলোতে দাগ বসিয়েছে বাঙালিবিদ্বেষ। নাগরিক তালিকাকে ঘিরে যা কয়েক যুগ ধরে সেখানে চলমান আছে।

আসাম সংকটে ভারতে নতুন আরেকটি পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। এনআরসিকে ঘিরে কয়েক মাস আগে রাজ্যটিতে যে আগুন লাগার কথা ছিল, এ যেন তারই বিপরীত স্ফুলিঙ্গ। ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী বিলটিতে বলা হয়েছে, ‘ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার’ হয়ে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিস্টানদের বেআইনি অনুপ্রবেশকারী হিসেবে ধরা হবে না। তাদের ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। তবে বিলটিতে মুসলিমদের বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই। মুসলিম ছাড়া ভারতে বসবাসকারী অন্যান্য ধর্মের অনাগরিকদের সুবিধা দিতেই এই আইন। আগের সংশোধনীতে নাগরিকত্ব পেতে সর্বশেষ ১৪ বছরের মধ্যে ১১ বছর ভারতে থাকার শর্ত ছিল। এখন সেটা করা হয়েছে পাঁচ বছর। হিন্দুরাই সবচেয়ে সুবিধাভোগী হলেও এখানে জটিলতা রেখে দিয়েছে বিজেপি। ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করতে হবে অমুসলিমদের।

হিন্দুরাষ্ট্র বানানোর আরএসএস-বিজেপির দীর্ঘদিনের এজেন্ডা প্রতিফলিত হয়েছে ক্যাবে। ধর্মীয় বিভেদরেখা টেনে ইসরায়েলকেই অনুসরণ করল বিজেপি। পুরো বিশ্বের হিন্দুরা প্রকারান্তরে ভারতে বসবাসের নিশ্চয়তা পেতে যাচ্ছে। ‘মুসলিমরা কেন নাগরিকত্ব পাবে?’ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপি সভাপতি অমিত শাহের এমন প্রশ্নেই স্পষ্ট হয়ে যায় বিষয়টি। আসামের এনআরসি নিয়ে খারাপ অভিজ্ঞতায় বিজেপির জন্য জরুরি ছিল ক্যাব। এখন যে এনআরসি করা হবে, সেখান থেকে সহজেই বাদ দেওয়া যাবে মুসলিমদের। মিয়ানমারের নীতিই কি গ্রহণ করছে না বিজেপি সরকার? রাখাইন থেকে উচ্ছেদের আগে রোহিঙ্গা মুসলিমদেরও একইভাবে অনাগরিক করা হয়েছিল। শুরু থেকেই তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়ে বিলটি। কেবল অমুসলিমদের কেন সুবিধা দেওয়া হলো, প্রশ্ন বিরোধীদের। ক্যাবের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন কেরালা, পাঞ্জাব, মধ্যপ্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীরা। সংখ্যালঘু মুসলিমদের অধিকার রক্ষায় ক্যাব বাস্তবায়ন করবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তারা। হাজারেরও বেশি বুদ্ধিজীবী, বিজ্ঞানী, সিনেমা নির্মাতা, অবসরপ্রাপ্ত আমলা, লেখক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ক্যাব ‘বিভাজনমূলক, পক্ষপাতদুষ্ট এবং অসাংবিধানিক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। রাজধানী নয়াদিল্লিসহ অধিকাংশ রাজ্যেই ক্যাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে মানুষ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলছে তীব্র বিক্ষোভ। উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতে সৃষ্টি হয়েছে সহিংস আন্দোলন। বিশেষ করে আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরায় কারফিউ ও সেনা মোতায়েন হয়েছে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ইন্টারনেট সংযোগ। স্থানীয় অধিবাসীদের হামলায় শিকার হয়েছে রাজ্যগুলোর বাঙালি এলাকা। আসামে কারফিউ ভেঙে রাস্তায় নামে মানুষ। বাঙালি এলাকা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে রাস্তা দখল নিয়েছে অসমিয়ারা। আক্রান্ত হয়েছে বিজেপি এমপি-মন্ত্রী-নেতাদের ঘরও। অসমিয়াদের রুখতে গুলি চালিয়েছে পুলিশ। নিহত হয়েছে পাঁচজন

নানা সংশোধনের মাধ্যমে ২০১৬ সালে প্রথম এই বিল লোকসভায় তোলা হয়। সংসদীয় কমিটির রিপোর্ট, মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদনের মধ্য দিয়ে গত সপ্তাহে শেষমেশ ক্যাব পাস হয়। এর মধ্যে আন্দোলন চলে আসামে। ২০১৮ সালেও রাস্তায় নামে অসমিয়া সংগঠন আসু (সারা আসাম ছাত্র সংস্থা)। এতে যোগ দেয় মুসলিমদের সংগঠন সারা আসাম সংখ্যালঘু ছাত্র সংস্থাও (আমসু)। রাজ্যটিতে বাঙালি হিন্দু ও মুসলিম উভয়েই নাগরিকত্ব হারানোর ঝুঁকিতে থাকলেও স্বার্থ ও বিভেদের রাজনীতি নতুন করে সামনে এসেছে। বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফাকেও দেখা যায় এই আন্দোলনে অংশ নিতে। আসুই এখন আসামে বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিচ্ছে। উলফার নামে সেøাগান দেওয়ার বিষয়টি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে এসেছে। ক্যাবকে ঘিরে উলফার নতুন করে শক্তি সঞ্চয় ও ক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ তৈরি হয়েছে সেটি গত বছরের নভেম্বরের আন্দোলনেই স্পষ্ট হয়। বিল বিরোধীদের অনেক তরুণ নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনে ঢুকছে।

৬০ এর দশক থেকে ৮০ দশক পর্যন্ত বাঙালিবিদ্বেষী আন্দোলন ও সহিংসতার ফলে ১৯৮৫ সালে রাজীব গান্ধীর সঙ্গে অসমিয়াদের একটি চুক্তি হয়। অসমিয়াদের দাবি, সেই চুক্তি লঙ্ঘন করে নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করেছে বিজেপি। রাজ্যটিতে ‘বাংলাদেশিদের’ অনুপ্রবেশ এবং তার জেরে রাজ্যের রাজনৈতিক, সামাজিক,

সাংস্কৃতিক ও আর্থিক জীবনের ওপর প্রভাব ঠেকাতে চুক্তিটি করা হয়েছে। সেটির ভিত্তিতেই এই বছরের আগস্টের শেষে রাজ্যটিতে বহুল বিতর্কিত এনআরসি হয়। অসমিয়াদের দাবি ছিল ৫০-৭০ লাখ ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ তালিকার বাইরে থাকবে। কিন্তু বাদ পড়েছে মাত্র ১৯ লাখ। বিজেপির টার্গেট ছিল রাজ্যের মুসলিম বাঙালিরা। দেখা গেল বাদ পড়াদের অধিকাংশই হিন্দু। এখন বাদ পড়া হিন্দুদের নাগরিকত্ব দিতে বদ্ধপরিকর বিজেপি। সেটি সম্ভব হবে ক্যাবের মাধ্যমেই। আসাম চুক্তির ভিত্তিতে হওয়া এনআরসিতে অসন্তুষ্ট অসমিয়াদের দাবি, এতে চুক্তি প্রতিফলিত হয়নি। অনুপ্রবেশকারীই তালিকায় থেকে গিয়েছে। এখন বাদ পড়াদেরও ক্যাবের মাধ্যমে নাগরিকত্ব দিতে চাচ্ছে বিজেপি।

বাঙালিবিদ্বেষ থেকে সৃষ্ট আসুর প্রথম প্রজন্ম থেকেই উলফার সৃষ্টি বলা হয়ে থাকে। ফলে ক্যাবকে ঘিরে নিষিদ্ধ ঘোষিত বিচ্ছিন্নতাবাদী এই সংগঠনের তৎপরতা আবার সামনে আসছে। এনআরসির বিরুদ্ধে ছিল বাঙালি হিন্দু-মুসলিম সবাই। তবে বিজেপি সরকারের আশ্বাসে হিন্দুরা চিন্তামুক্ত ছিল, যদিও পরে পালটে যায় চিত্র। ক্যাবের ফলে রাজ্যটিতে নতুন করে এনআরসি হবে, এতে নাগরিক ঘোষিত হওয়া মুসলিমদের চিন্তা শুরু হয়েছে। ফলে ক্যাবের বিরোধিতায় মুসলিমরা। এতে আছে বাঙালি হিন্দু বিরোধিতাও। কারণ ক্যাব হিন্দুদের সুরক্ষা দিচ্ছে। ক্যাবের বিরুদ্ধে এখন দুই পক্ষ অসমিয়া আর মুসলিম। আসামের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে অন্য রাজ্যগুলোও। এসব রাজ্যের বিশাল বিশাল এলাকা ক্যাবের আওতার বাইরে পড়লেও অসমিয়াদের মতো শঙ্কা তাদেরও। ঐতিহাসিকভাবে বাঙালিবিদ্বেষের সঙ্গে যুক্ত ছিল এসব রাজ্যও।

লেখক : অনুবাদক