বাংলাদেশের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ পাকিস্তানের সম্পর্ক সব সময়ই বৈরিতাপূর্ণ। যা বর্তমান যুগে মোটেও কাক্সিক্ষত নয়। এ ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরি করতে হলে সবার আগে দুদেশের মধ্যে বিরাজমান ঐতিহাসিক বিষয়গুলোর সুরাহা করা দরকার।
রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান পরিকল্পিতভাবে ১৯৭১ সালের ইতিহাস থেকে নিজ জনগণকে অন্ধকারে রেখেছে। পাকিস্তানি নাগরিকরা ছোটবেলা থেকেই বাংলাদেশ সম্পর্কে মিথ্যা বয়ান শিখে বড় হয়। তারা জানেন ভারত পাকিস্তানকে ভেঙে দু-টুকরা করিয়েছে। আর বাংলাদেশ ভারতের ক্রীড়নক হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। বেশিরভাগ পাকিস্তানি নাগরিকই জানেন না ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়েছিল এবং সামরিক জান্তা জেনারেল ইয়াহিয়া খান তাদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে গণহত্যার পথ বেছে নেন। তাতে করে সাধারণ পাকিস্তানিদের অনেকেই বাংলাদেশকেও একটি শত্রুরাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করে। খোদ আইনপ্রণেতারা পাকিস্তানের পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে এখনো বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেন। বিগত বছরগুলোতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলাকালে একাধিকবার পাকিস্তানের পার্লামেন্টে তারা নির্লজ্জভাবে কুখ্যাত অপরাধীদের পক্ষে কথা বলেছেন। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বিবেচনা করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একাধিকবার পাক-রাষ্ট্রদূতকে তলব করে শাসিয়েছে। প্রায় সবক্ষেত্রেই পাকিস্তানও পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের কতগুলো ঐতিহাসিক অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে। এসবের মধ্যে তিনটি বিষয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ : আটকেপড়া পাকিস্তানিদের ফেরত নেওয়া, একাত্তরে অন্যায়ভাবে যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া এবং গণহত্যার জন্য বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং বাংলাদেশ থেকে লুণ্ঠিত সম্পদ ফেরত দেওয়া। অতীতে বিভিন্ন সময় পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশে আটকেপড়া তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে তারা বিষয়টি অস্বীকার করেছে। পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান অতীতে অনেকবার বাংলাদেশের জনগণকে নিজের ভাই বলে দাবি করেছেন। তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিজের জনগণের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল বলেও মন্তব্য করেছিলেন। কাজেই, আটকেপড়া পাকিস্তানিদের ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে সেই মন্তব্যকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে তার সরকারকে চাপ দেওয়া দরকার।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে আটকেপড়া ওই সময়কার আড়াই লাখ পাকিস্তানি নাগরিকের পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারে যে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছিল, সেই জটিলতা দীর্ঘ ৪৮ বছরেও দূর হয়নি। ওই সব পাকিস্তানির সংখ্যা আজ বেড়ে ২০ লাখ বা তারও বেশি। ওই সব নাগরিকের প্রায় সবাই পাকিস্তানে ফিরে যেতে চায়। একসময় সৌদি আরবভিত্তিক ইসলামিক সাহায্য সংস্থা রাবিতা আল ইসলাম আটকেপড়া পাকিস্তানি নাগরিকদের পুনর্বাসনের ব্যাপারে আর্থিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সে ব্যাপারেও অগ্রগতি হয়েছে কম। ১৯৯২ সালের জুন মাসে প্রত্যাবাসনের কিছু কাজ শুরু হয়েছিল এবং কিছু নাগরিক পাকিস্তানে চলেও গিয়েছিল। কিন্তু তা থেমে গেছে। বাংলাদেশ সরকার একাত্তর সালে গণহত্যার জন্য বরাবরই আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনার জন্য পাকিস্তানকে চাপ দিয়ে আসছে। পাকিস্তানকে ক্ষমা চাইতে রাজি করানোর ব্যাপারে এখন বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। কারণ ইমরান খান যখন ক্ষমতায় ছিলেন না, তখন তিনি অনেকবার নিজ সরকারকে ঠিক এই কাজটিই করতে বলেছেন। এখন ক্ষমতায় থেকে তিনি এই কাজটি যেন করেনÑ এ ব্যাপারে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে।
মুক্তিযুদ্ধের ক্ষতিপূরণ বাদেও একাত্তর সালে ঢাকায় স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান থেকে সরিয়ে নেওয়া অর্থ বাবদ পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের পাওনা প্রায় ২৪০ কোটি মার্কিন ডলার। ২০১০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের কাছে এই ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিল বাংলাদেশ। পাকিস্তান বাংলাদেশের এই দাবিকে বাক্সবন্দি করে এবং এ বিষয়ে আলাপ থেকে নিজেদের দূরে রাখে। এছাড়া জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী একাত্তর সালে বাংলাদেশের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১২ লাখ ডলার। এসব দাবি-দাওয়ার ব্যাপারে নতুন করে উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো কোনো সন্ত্রাসী সংগঠনকে সাহায্য ও সমর্থনেরও অভিযোগ আছে। লস্কর-ই-তৈয়বা ও এর নেতা হাফিজ সাইদ জাতিসংঘ কর্র্তৃক সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত ও নিষিদ্ধ। কিন্তু এসব সংগঠন এখনো পাকিস্তানে তাদের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তান যত দিন পর্যন্ত না নিষিদ্ধ ঘোষিত এসব সন্ত্রাসী সংগঠনকে সহযোগিতা করা থেকে বিরত থাকবে ততদিন পর্যন্ত সার্কভুক্ত দেশগুলোর আস্থা পাকিস্তান নিশ্চিত করতে পারবে না। খোদ ইমরান খানের বিরুদ্ধে একটা বড় অভিযোগ, তিনি তালেবানদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে আসছেন। সন্ত্রাসবাদীদের মদদ ও পৃষ্ঠপোষকতার বিরুদ্ধেও পাকিস্তানের সঙ্গে কথা বলা দরকার।
বাংলাদেশ-পাকিস্তান বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়েও কথা বলা প্রয়োজন। বাংলাদেশ হচ্ছে পাকিস্তানের অষ্টম বাজার। বাংলাদেশ পাকিস্তানে রপ্তানি করে কম, আমদানি করে বেশি। ২০০৯-১০ সালে রপ্তানি-আমদানির হার ছিল ১:৪, অর্থাৎ চার গুণ বেশি পণ্য আমরা আমদানি করতাম (৭৭.৬৭ মিলিয়ন ডলার রপ্তানি, ৩২৩.৭ মিলিয়ন ডলার আমদানি)। ২০১৫-১৬ সালে এই ব্যবধান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ গুণে, অর্থাৎ ওই সময় রপ্তানি করা হয় ৪৭.০৭ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। অথচ আমদানি করা হয় ৫০৭.৪৬৮ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। এই বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। এই বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
গত ৪৮ বছরের যে ইতিহাস তাতে দুদেশের মধ্যে সম্পর্ক কখনই উষ্ণ ছিল না। বর্তমানে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক চূড়ান্ত টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০১৬ সালে পাকিস্তান আয়োজন করতে ব্যর্থ হয়েছে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন। ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশের অংশগ্রহণে অনীহা আঞ্চলিক সংস্থার অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্রতিক্রিয়া হিসেবে পাকিস্তান ২০১৭ সালে ঢাকায় আয়োজিত আন্তর্জাতিক পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের বৈঠক বর্জন করেছিল। একাধিকবার বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড নিরাপত্তাজনিত কারণে পাকিস্তানে দল পাঠাতে অস্বীকার করেছে। দেশে জঙ্গি অর্থায়নে পাকিস্তানের সম্পৃক্ততার অভিযোগে বাংলাদেশ পাকিস্তানকে বরাবরই দায়ী করে আসছে। এজন্য বহিষ্কার করা হয় পাকিস্তানি কূটনীতিককে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এতটা খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছে যে, উভয় দেশ একে অপরের পেশাজীবীদের জাতিসংঘের হয়েও নিজ নিজ দেশে কাজ করতে ভিসা প্রদান বন্ধ রেখেছে!
আমাদের স্মৃতিতে ১৯৭১ একটা বড় রকমের ক্ষত তৈরি করেছে। আমরা চাই, পাকিস্তান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের জনগণের কাছে ক্ষমা চাক। পাকিস্তানের সিভিল সমাজ থেকেও এ দাবি উঠেছে এবং গত ৪৮ বছরে অনেকেই প্রকাশ্যে এ দাবির প্রতি সমর্থন দিয়েছেন। এ দুই দেশের সিভিল সমাজের প্রতিনিধিরা যখন বিভিন্ন আঞ্চলিক ফোরামে একত্র হন, তখন এ আশাবাদ জাগে, এ রকম একটি দাবির প্রতি পাকিস্তানের সর্বস্তরের নাগরিক একদিন না একদিন সমর্থন দেবেনই। এ জন্য একটা অনুকূল আবহ দরকার, প্রয়োজন সিভিল সমাজের আরও অগ্রণী ভূমিকা পালন। এ ব্যাপারে আমাদের জোরদার কূটনৈতিক ও সামাজিক উদ্যোগ অব্যাহত রাখা দরকার। রাজনৈতিক সমঝোতা ও স্বাভাবিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং তা বজায় রাখার পথটি সহজ নয়। এটিকে সহজতর করা যায়, যদি সম্পর্কের অন্য জানালাগুলো আমরা খুলে দিই। নাগরিকদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য বাড়ানোর মধ্য দিয়ে আমরা সম্পর্কের সিঁড়িগুলো তৈরি করতে পারি। যদিও তা সহজ নয়।
উদারনীতিবাদীরা বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য, গণতন্ত্র ও উদারমনস্ক সমাজ ক্রমে পরিবর্তনের পথ দেখাবে। কিন্তু কেমন করে? আত্মপরিচিতির রাজনীতির হাত ধরে কি পরিবর্তন আসতে পারে? এই রাজনীতি যে শান্তিকামী হবে, তার নিশ্চয়তা কোথায়? বাংলাদেশ-পাকিস্তানের জটিল সম্পর্কের মৌলিক চরিত্রগত পরিবর্তনের ক্ষমতা তাই ইমরান কেন, কোনো রাজনৈতিক নেতার হাতেই নেই। পাকিস্তানের রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনীতির পরিকাঠামোয় পরিবর্তন না এলে তার বাংলাদেশবিরোধিতারও অবসান হবে না। তবে বাস্তবতা যাই হোক না কেন, বাংলাদেশকে তাদের দাবি এবং এই দাবি আদায়ে কূটনৈতিক প্রয়াস অব্যাহত রাখতে হবে।
লেখক
লেখক ও কলামনিস্ট