পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব বিনিয়োগকারীরা

পুঁজিবাজারের বিনিয়োগ নিয়ে মহাদুশ্চিন্তায় রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। নিয়মিত বড় দরপতনে পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন তারা। আরও পতনের শঙ্কায় নতুন বিনিয়োগও আসছে না। এমন পরিস্থিতিতে ক্রেতা সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। টানা দরপতনে মার্জিন ঋণে কেনা শেয়ার ফোর্সড সেল (বাধ্যতামূলক বিক্রি) হচ্ছে। ফলে বড় ধরনের বিক্রিচাপে বাজারের সব সূচক ফিরছে পেছনে।

গতকাল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ৭৬ শতাংশ শেয়ারের দরপতনে প্রধান মূল্যসূচকটি প্রায় ৭৯ পয়েন্ট কমে ৪৪১৯ পয়েন্টে নেমেছে, যা গত সাড়ে তিন বছরে সর্বনিমœ। এর আগে ২০১৬ সালের ২৭ জুন এ সূচকটি ৪৪১২ পয়েন্টে নেমেছিল। চলতি বছর ডিএসইর এ সূচকটি প্রায় ১৮ শতাংশ পয়েন্ট হারিয়েছে। গতকাল মূল্যসূচকের বড় পতনের সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগকারীরাও শেয়ার কেনাবেচার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন।

এদিকে সূচকের টানা পতন ঠেকাতে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য সরকারের কাছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাবসিডিয়ারিগুলোর তহবিল গঠনের প্রস্তাবের অনুমোদন দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। গতকাল অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এ অনুমোদন দেন। তবে কত টাকার তহবিল গঠন করা হচ্ছে, সে বিষয়ে জানা যায়নি। ওই প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সরকারের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল চেয়ে গত ৪ ডিসেম্বর লিখিত প্রস্তাব দেন অর্থ মন্ত্রণালয়ে।

গতকালের লেনদেন পর্যালোচনায় দেখা যায়, লেনদেন শুরুর পর বেলা সোয়া ১১টা পর্যন্ত ডিএসইর প্রধান সূচকটি স্থিতিশীল অবস্থায় ছিল। কিন্তু এরপর থেকেই বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউজ থেকে শেয়ারের বিক্রিচাপ আসতে শুরু করে। আর পর্যাপ্ত ক্রেতা না থাকায় বেলা সাড়ে ১১টা থেকে সূচক নিমœমুখী ধারায় চলে আসে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বড় মূলধনী কোম্পানির শেয়ারের দর কমতে থাকায় সূচকের পতনও ত্বরান্বিত হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত পৌনে ২ শতাংশ পয়েন্ট হারিয়ে দিনের লেনদেন শেষ হয়েছে।

গতকাল শীর্ষ ব্রোকারেজ হাউজগুলোর মধ্যে ব্র্যাক ইপিএল, শান্তা সিকিউরিটিজ, ইউসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট, ইবিএল সিকিউরিটিজ, ইউনাইটেড ফিন্যান্সিয়াল ট্রেডিং কোম্পানি, জিকিউ সিকিউরিটিজ ও ইউনিক্যাপ সিকিউরিটিজ থেকে বড় ধরনের বিক্রিচাপ আসে। এসব প্রতিষ্ঠান গতকাল অন্তত ২০ কোটি টাকা নিট বিক্রিচাপ আসে। বিপরীতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান আইসিবি সিকিউরিটিজ ট্রেডিং কোম্পানি থেকে কিছুটা সাপোর্ট দেওয়া হয়। কিন্তু বিক্রিচাপ সামাল দিতে তা ছিল নগণ্য। গতকাল আইসিবির এই প্রতিষ্ঠানটি নিট ২ কোটি ৪৩ লাখ টাকার শেয়ার কেনে।

বড় ব্রোকারেজ হাউজগুলো থেকে বিক্রিচাপ আসায় গতকাল ডিএসইতে পাট ও কাগজ খাত ছাড়া অন্যসব খাত বাজার মূলধন হারিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দর হারিয়েছে টেলিকম খাত। এ খাতটি গতকাল প্রায় ৩ শতাংশ বাজার মূলধন হারিয়েছে। সূচকে প্রভাব বিস্তারকারী ব্যাংক খাত হারিয়েছে ১ দশমিক ৫ শতাংশ বাজার দর। গতকাল ২ দশমিক ৮ শতাংশ বাজার মূলধন হারিয়ে পতন তালিকার দ্বিতীয় স্থানে ছিল এনবিএফআই খাত। এছাড়া সাধারণ বীমা, বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি, ভ্রমণ, সিরামিক, সিমেন্ট, প্রকৌশল, সেবা ও নির্মাণ খাত ১ দশমিক ৭ থেকে ২ দশমিক ৪ শতাংশ পর্যন্ত দর হারিয়েছে। স্কয়ার ফার্মার দরপতনে ওষুধ খাত ১ শতাংশ বাজার মূলধন হারিয়েছে। বস্ত্র, বিবিধ ও ট্যানারি খাতও দর হারিয়েছে। গতকালের দরপতনে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ৫ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা। আর চলতি বছর ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। এদিকে দরপতনের সঙ্গে সঙ্গে স্টক এক্সচেঞ্জে শেয়ার কেনাবেচার পরিমাণও কমে গেছে। গতকাল ডিএসইতে কেনাবেচা হয়েছে ২৮১ কোটি টাকা, যা আগের দিনের চেয়ে ৮ শতাংশ কম।

গতকাল সূচক কমাতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব রাখা কোম্পানিগুলো হচ্ছে– গ্রামীণফোন, স্কয়ার ফার্মা, বিএটি বাংলাদেশ, এমজেএল বাংলাদেশ, লাফার্জহোলসিম, এসপিসিএল, ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন, আরএকে সিরামিকস, এমটিবি, ইবিএল, বেক্সিমকো ফার্মা, আইপিডিসি, ডিবিএইচ, সামিট পাওয়ার ও আইসিবি।