ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি ছাড়া পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্র বা গবেষণা চুল্লির অপারেশন থেকে উৎপাদিত উচ্চ, মধ্যম ও নিম্ন মাত্রার তেজস্ক্রিয় বর্জ্যরে ব্যবস্থাপনা দেশেই করতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত তেজস্ক্রিয় জ্বালানি সরবরাহকারীর কাছে ফেরত পাঠানোর মতো যথেষ্ট পরিমাণে ক্ষয়প্রাপ্ত না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্র বা গবেষণা চুল্লি থেকে উৎপাদিত পারমাণবিক জ্বালানি নির্দিষ্ট স্থাপনায় সংরক্ষণ করতে হবে। এসব বিধান রেখে ‘তেজস্ক্রিয় বর্জ্য এবং ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক জাতীয় নীতি-২০১৯’ প্রণয়ন করেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। এ নীতিমালাটি অনুসরণের জন্য গত ৮ ডিসেম্বর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে পাঠানো হয়েছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার আগেই বলেছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য রাশিয়া নিয়ে যাবে এবং তা তাদের দেশে নিষ্পত্তি করবে। শুধু রূপপুর নয়, যেকোনো পারমাণবিক বর্জ্যই উৎপাদক দেশে ফেরত পাঠানোর নিয়ম রাখা হয়েছে। তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ও পারমাণবিক জ্বালানিতে ক্ষয়ক্ষতি ও যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা প্রতিরোধের জন্য নীতিমালাটি করা হয়েছে।’
নীতিমালাটি গত ১৪ অক্টোবর অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। এতে বলা হয়েছে, পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকবে আরডব্লিউএমসি (রেডিওঅ্যাকটিভ ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি) নামে একটি কোম্পানি। তেজস্ক্রিয় বর্জ্য অপসারণের জন্য দূষণকারীকে ব্যয় বহন করতে হবে। দেশের বিভিন্ন খাত থেকে তৈরি হওয়া পারমাণবিক বর্জের নিষ্পত্তি করতেই এ নীতিমালা প্রস্তুত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নীতিমালা মেনে এ নীতি তৈরি করা হয়েছে জানিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, আইএইএর নীতিমালার বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’
নীতিমালায় বলা হয়েছে, গবেষণা চুল্লি থেকে উদ্ভূত পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহকারীর নিকট চুক্তি অনুযায়ী ফেরত পাঠাতে হবে। তবে জ্বালানি সরবরাহকারীর কাছে প্রেরণ না করা পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান এই ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানির জন্য অস্থায়ী সংরক্ষণের ব্যবস্থা করবে। ভবিষ্যতে সব নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট এবং গবেষণা চুল্লি কর্র্তৃপক্ষকে নিজ নিজ জ্বালানি সরবরাহকারীর সঙ্গে এ সম্পর্কিত চুক্তি করতে হবে। অব্যয়িত সিলকৃত তেজস্ক্রিয় উপাদানসমূহ সরবরাহকারী দেশে প্রত্যপর্ণ করতে হবে। সিলকৃত তেজস্ক্রিয় উপাদান আমদানি করার পর তাদের ব্যবহারিক উপযোগিতা শেষ হয়ে গেলে প্রস্তুতকারক দেশে ফেরত পাঠানো হবে। যেসব অব্যয়িত সিলকৃত তেজস্ক্রিয় উপাদান প্রত্যর্পণ করা যাবে না, সেসব ক্ষেত্রে আইএইএ
এবং অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় অংশীদারদের কাছ থেকে সহায়তা গ্রহণ করা হবে। আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকা, অতিরিক্ত খালাস খরচ, উৎপাদনকারী শনাক্ত করতে না পারা বা বিশেষ ধরনের সনদপত্র হারিয়ে যাওয়ার কারণে প্রত্যর্পণে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
এই নীতির প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে, তেজস্ক্রিয় বর্জ্য, ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি, অব্যয়িত সিলকৃত তেজস্ক্রিয় পদার্থ এবং প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট তেজস্ক্রিয় পদার্থের নিরাপদ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা করা। লক্ষ্যমাত্রা ও প্রয়োজন সীমা এমনভাবে নির্ধারণ করা যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর কোনো প্রকার অনাকাক্সিক্ষত দায় না চাপিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ মানব-স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষিত রাখা যায়। তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ও ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনা সব স্তরে সম্ভাব্য ঝুঁকির বিপরীতে কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা এমনভাবে নিশ্চিত করা–যাতে ব্যক্তি, সমাজ, পরিবেশ বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রেডিয়েশনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা পায়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চাহিদা ও আকাক্সক্ষা পূরণের সামর্থ্যরে প্রশ্নে কোনো প্রকার আপস না করে বর্তমান প্রজন্মের চাহিদা ও আকাক্সক্ষা মেটানো নিশ্চিত করা হয়েছে নীতিমালায়।
এই নীতিতে পারমাণবিক শক্তি কর্মসূচির টেকসই বাস্তবায়নের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অব্যয়িত সিলকৃত তেজস্ক্রিয় উৎস, ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি ও প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট তেজস্ক্রিয় পদার্থসহ সব ধরনের তেজস্ক্রিয় বর্জ্যÑযা বর্তমানে বাংলাদেশে উৎপাদিত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে উৎপাদিত হবে তার সঙ্গে সম্পৃক্ত।
অপারেশন চলাকালীন এবং অপারেশন শেষ হওয়ার পর তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্থাপনার নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও প্রহরা নিশ্চিত করা হয়েছে নীতিমালায়। অপারেশন চলাকালীন ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি অন্তর্বর্তীকালীন সংরক্ষণ স্থাপনার নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও প্রহরা নিশ্চিত করবে। ব্যয়-সাশ্রয়ী উপায়ে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হবে। টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক ও কারিগরি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। তেজস্ক্রিয় বর্জ্য এবং ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় জনআস্থা অর্জন এবং তা বজায় রাখা নীতিমালার অন্যতম উদ্দেশ্য।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ও ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি আমদানি করা যাবে না। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টে উৎপাদিত ও ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহকারীর কাছে ফেরত পাঠানোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ আইন ও আন্তর্জাতিক বিধিবিধান ছাড়া অন্য সব তেজস্ক্রিয় বর্জ্য যথাযথভাবে লাইসেন্সকৃত নির্দিষ্ট স্থাপনায় নিষ্পত্তি করা হবে নিরাপদ ব্যবস্থাপনার শেষ-বিন্দু। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাতীয় তেজস্ক্রিয় বর্জ্য শ্রেণিকরণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হবে। তেজস্ক্রিয় বর্জ্য এবং ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনার সব কাজ উন্মুক্ত ও স্বচ্ছভাবে পরিচালনা করা হবে। বর্জ্য ও জ্বালানি সংক্রান্ত তথ্যে জনগণের প্রবেশাধকিার থাকবে।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ও পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য জাতীয় বিধান প্রণয়ন এবং নিয়ন্ত্রণ কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা সরকারের দায়িত্ব। পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহকারী দেশের সঙ্গে ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি ফেরত পাঠানোর পদক্ষেপ গ্রহণবিষয়ক আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তিপত্র স্বাক্ষর হবে। বর্জ্য ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনা কর্মকাণ্ড এবং স্থাপনার লাইসেন্স দেওয়ার জন্য একটি দায়িত্বশীল পদ্ধতি প্রবর্তন করা হবে। দেশে উৎপাদিত সব তেজস্ক্রিয় বর্জ্য নিরাপদ ব্যবস্থাপনার জন্য একটি মাত্র স্বতন্ত্র নিষ্পত্তিকরণ স্থাপনার স্থান নির্ধারণ, নির্মাণ ও পরিচালনার বিধান রয়েছে।