কৃষকের জমি থেকে বালু তুলছেন প্রতিমন্ত্রী জাকির!

কুড়িগ্রামের রৌমারীর ফলুয়ার চর, খনজনমারা ও বালুয়ার চর এলাকার চার শতাধিক কৃষকের আবাদি জমি থেকে অবৈধভাবে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে। আর এ কাজে রৌমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল ইমরান প্রতিমন্ত্রীর সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন বলে ভাষ্য ভুক্তভোগী কৃষকদের। তারা জানান, সরকারের উন্নয়ন কাজে মাটি লাগবে এমন অজুহাত দেখিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এর প্রতিবাদ করায় ব্যক্তিমালিকানা হিসেবে রেকর্ডভুক্ত এসব কৃষিজমির মালিকদের দেওয়া হচ্ছে নানা হুমকি।

এ পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত ২০০ কৃষক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করে তার দপ্তরে একটি আবেদনপত্র পাঠিয়েছেন। দেশ রূপান্তরে পাঠানো ভুক্তভোগীদের একটি চিঠিতে এসব তথ্য জানানো হয়। তবে প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন ও ইউএনও আল ইমরান দুজনই এসব অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করেছেন।

ভুক্তভোগী কৃষকরা বলছেন, তাদের জমিগুলো দুই ফসলি। বছরে দুবার তারা সেখান থেকে ফসল তোলেন। মালিকানা থাকা সত্ত্বেও কৃষকদের জমি থেকে মাটি উত্তোলনের এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত আছেন রৌমারী ৪ নম্বর সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শহিদুল ইসলাম এবং ৩ নম্বর বন্দবের ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. কবির হোসেন। ক্ষতিগ্রস্তরা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেনকে বারবার অনুরোধ করার পরও তিনি বালু উত্তোলনের কাজ বন্ধ করেননি। এ কাজ চলতে থাকলে পরবর্তী বর্ষা মৌসুমে এসব অঞ্চলে পানি ওঠার পাশাপাশি শত শত ঘরবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ভুক্তভোগী কৃষকদের করা লিখিত অভিযোগে বলা হয়, গত ২৩ নভেম্বর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন ও রৌমারীর ইউএনও মো. আল ইমরান তাদের লোকজন নিয়ে কৃষকদের

নামে রেকর্ডকৃত নিজস্ব মালিকানা সম্পত্তি থেকে জোরপূর্বক ড্রেজার মেশিন দিয়ে মাটি তুলে বিক্রি করার কাজের উদ্বোধন করেন। তখন জমির মালিকরা মাটি তুলতে নিষেধ করলে স্থানীয় ক্ষমতাশালীরা তাদের হুমকি দেন। অভিযোগকারীরা আরও বলেন, নদীভাঙনের কারণে এলাকার মানুষ নিঃস্ব হয়ে গেছেন। জীবনযাপনের জন্য একমাত্র ভরসা কৃষি। ফলে কৃষিজমি থেকে মাটি খনন করলে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বেন কৃষকরা। এই অঞ্চলে সরকার ঘোষিত কোনো বালুমহাল না থাকায় অবৈধভাবে কৃষিজমি থেকে বালু উত্তোলন করলে মূল ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন হয়ে শস্যক্ষেতসহ শত শত ঘরবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশংকা রয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ফুলুয়ার চর এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক মো. মজিবর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিগত প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ বছর ধরে আমার জমিটা নদীতে ছিল, এহন হুট কইরা চর ভাইসা উঠছে। কিন্তু আমরা তো জমিতে নামতে পারতাছি না। ১০ কি ১৫ দিন আগে একদিন প্রতিমন্ত্রী তার লোকজন নিয়ে আমার জমিসহ আরও দুই শতাধিক কৃষকের জমি থেকে জোর করে মাটি কাটার কাজের উদ্বোধন করছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি মেলা দিন থ্যাইকা এই জমির খাজনা দেই, এই জমি আমার।’

বালু উত্তোলন বন্ধ করতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা কয়েক দফায় প্রতিমন্ত্রীকে অনুরোধ করলেও তিনি তাদের কথা রাখেননি উল্লেখ করে জব্বার নামে আরেক কৃষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সব কৃষক প্রতিমন্ত্রী ও চেয়ারম্যানের লগে দেহা করছিলাম, কিন্তু কেউ অ্যামাগো কোনো কথা রাহেনি। উল্টা প্রতিমন্ত্রী আমাগো কয়ছিল, সরকারের উন্নয়নের কাজে এই মাটি লাগব।’

নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে ভুক্তভোগী আরেক কৃষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা তাগো কাছে গেছি, কিন্তু হ্যারাতো কোনো কথাই হুনে না। খালি কয় সরকারের উন্নয়নের কাজে লাগব এ মাটি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার জমি থ্যাইকা নাকি আরও ২০০ বিঘা পর্যন্ত যাইব এই মাটি কাটার কাজ। এই জমিতে বোরো ধান ও বাদামসহ নানা ধরনের ফসল হয়। আমরা মইরা যামু যদি এমন মাটি কাটার কাজ চলতে থাকে।’

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রৌমারী সদরসহ জেলার তিন উপজেলায় একসঙ্গে চলছে মালিকানাভুক্ত জমি থেকে মাটি কাটার কাজ। তবে কী করা হবে এসব মাটি দিয়ে তা জানেন না কৃষকদের কেউই। তারা বলছেন, কিছুদিন আগে হুট করেই প্রতিমন্ত্রী, ইউএনও ও সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের চেয়ারম্যানসহ তাদের লোকজন মাটি কাটার কাজ শুরু করে দেয়। তখন কৃষকরা কাজ বন্ধের জন্য শত অনুরোধ জানালেও কোনো সুফল মেলেনি, বরং তাদের নানাভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাটি তোলার অভিযোগ সত্যি নয়। এ সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না।’

অন্যদিকে রৌমারীর ইউএনও মো. আল ইমরান গতকাল মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে করা এ অভিযোগ একেবারেই অসত্য। এ বিষয়ে যারা আমার কাছে অভিযোগ নিয়ে আসছেন, আমি সঙ্গে সঙ্গে ওই এলাকার তহশিলদারকে ডেকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। তবে যতটুকু জানি মন্ত্রী মহোদয় স্থানীয় উন্নয়ন কাজের জন্য বালু ও মাটি উত্তোলন করছেন।’