শিশুর হার্টের ছিদ্র ও আধুনিক চিকিৎসা

হৃৎপিণ্ডের চারটি প্রকোষ্ঠ থাকে। ওপরের দুটি হলো অলিন্দ ও নিচের দুটি নিলয়। ওপরের দুটি প্রকোষ্ঠ একটি পর্দা বা ইন্টার এট্রিয়াল সেপটাম দিয়ে আলাদা করা থাকে এবং নিচের দুটি প্রকোষ্ঠকে আলাদা করে রাখে আরেকটি পর্দা, যাকে বলে ইন্টার ভেন্ট্রিকুলার সেপটাম। দুটি আলাদা আলাদা রক্তনালি নিচের দুটি চেম্বার থেকে রক্ত বহন করে সরবরাহ করে ফুসফুস ও পুরো দেহে। এদের মহাশিরা ও মহাধমনি বলে। হৃৎপিণ্ডের বাঁ দিকে ওপর ও নিচের চেম্বার এবং সরবরাহকারী রক্তনালিতে দূষিত রক্তনালি থাকে, যা ফুসফুসে যাওয়ার পর বিশুব্ধ হয়। বিশুদ্ধ রক্ত হৎপি-ে বাঁয়ের চেম্বারগুলোতে থাকে যা মহাধমনির মাধ্যমে পুরো দেহে ছড়ায়।

শিশুর হার্টে ছিদ্র : কোনো কোনো শিশু হার্টে বিভিন্ন ছিদ্র নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। ওপরের চেম্বারের মাঝের পর্দায় কোনো ছিদ্র থাকলে তাকে অ্যাট্রিয়াল সেপ্টাল ডিফেন্ট (এএসডি) বলে। নিচের পর্দার মধ্যে কোনো ছিদ্র থাকলে তাকে ভেল্ট্রিকুলার সেপ্টাল ডিফেক্ট (ভিএসডি) বলে। আর মহাশিরা ও মহাধমনিকে সংযোগকারী রক্তনালিকে বলে প্যাটেন্ট ডাক্টাস আর্টারিওসাস (পিডিএ)।

চিকিৎসা : হার্টের জন্মগত এসব ছিদ্রের চিকিৎসা নির্ভর করে ছিদ্রের আকার ও অবস্থানের ওপর। ছোট আকারের এএসডি নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যায়। কিছু ক্ষেত্রে ওষুধ প্রয়োগ করে ফুসফুসের বাড়তি রক্তের চাপ কমিয়ে রাখা হয়। বড় বা মাঝারি আকারের ছিদ্র হলে ডিভাইসের মাধ্যমে বন্ধ করা হয়। সে ক্ষেত্রে ইকোকার্ডিওগ্রাফি করে দেখা হয় ডিভাইসটি ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট পরিমাপ পর্দা ছিদ্রের চারপাশে রয়েছে কি-না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সুবিধাজনক স্থানে থাকলে ছোট ডিভাইস-ও এমনিতেই বন্ধ হয়ে যায়। আবার রক্তনালির ভালভের খুব কাছে থাকলে ডিভাইস দিয়ে বন্ধ করা যায় না, অপারেশনের দরকার হয়। কিন্তু ছিদ্রটি যদি সুবিধাজনক স্থানে থাকে এবং তা আপনাআপনি বন্ধ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা না থাকে, তখন ডিভাইস দিয়ে বন্ধ করা বেশ সহজ হয়। প্যাটেন্ট ডাক্টাস আর্টারিওসাসের (পিডিএ) ক্ষেত্রেও বিষয়টি তা-ই। জন্মের পরপর পিডিএ নির্ণয় করা গেলে শুধু ওষুধ প্রয়োগ করেই তা সারানো সম্ভব।

ডিভাইস ক্লোজার : শিশুদের হার্টের ছিদ্র বন্ধে ব্যবহৃত ডিভাইসগুলো একটি কৃত্রিম বস্তু। এগুলোকে হার্টের ছিদ্রের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে ছাতাসদৃশ অংশটি ছিদ্রের দুই প্রান্তে বোতামের মতো বসিয়ে দেওয়া হয়। ছোট এই ডিভাইসগুলো নিটিনল তারের বস্তু (হরঃরহড়ষ রিৎব সবংয) যার মধ্যে থাকে ভধনৎরপ/ড়পপষঁফবৎ ভধনৎরপ এই ডিভাইসটি বসানো হয় হার্টের ছিদ্রের দুই পাশের প্রকোষ্ঠ বা রক্তনালির রক্তমিশ্রণ পুরোপুরি বন্ধ করার জন্য। কৃত্রিম বস্তু প্রতিস্থাপন করার পর পরই শরীরের নতুন কোষ ডিভাইসের ওপর তৈরি হতে থাকে যেন প্রতিস্থাপনের পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে তা শরীরের নিজস্ব অংশ হয়ে যায়। ছয় মাস পর্যন্ত এএসডি ও ভিএসডি ডিভাইস বসানোর পর মাত্রা অনুযায়ী এসপিরিন জাতীয় ওষুধ সেবন করতে হয়।

সতর্কতা : ডিভাইসটি লাগানোর পর ঝাঁকুনি দিলে বা শিশুটি লাফালাফি করলেও খুলে আসার আশঙ্কা থাকে না। তবে শিশুর দাঁতের যত্ন নিতে হয়। দাঁতের গোড়ায় রক্তপাত হলে, সার্জারির প্রয়োজনে পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্টের পরামর্শ নিন। দাঁতের গোড়ার রক্তপাত থেকে ইনফেকটিভ এন্ডোকার্ডাইটিস জাতীয় ইনফেকশন হতে পারে। নিয়মিত ফলোআপ করতে হবে।

এম এস জহিরুল হক চৌধুরী

ক্লিনিক্যাল নিউরোলজি বিভাগ

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস ও হাসপাতাল

চেম্বার:  পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লি. শ্যামলী শাখা, ঢাকা

০১৮৬৫-৪৪৪৩৮৫, ০১৮৬৫-৪৪৪৩৮৬