পাসপোর্ট ইস্যু ও নবায়নে ভোগান্তি কমুক

বিশ্বায়নের এই যুগে পাসপোর্ট প্রতিটি রাষ্ট্রের নাগরিকের জন্য অতি প্রয়োজনীয় এক দলিল। দেশের অভ্যন্তরে কি বাইরে, পাসপোর্টের উপযোগিতার শেষ নেই। যুগ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাসপোর্ট প্রযুক্তিতেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। ইতিমধ্যে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ সাধারণ পাসপোর্ট বইয়ের জগৎ থেকে বেরিয়ে এসেছে। তার বদলে চালু হয়েছে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট বা ‘এমআরপি’। এখন ‘এমআরপি’র চৌহদ্দি পার হয়ে বায়োমেট্রিক বা ‘ই-পাসপোর্ট’ যুগে চলে গেছে উন্নত দেশগুলো। বাংলাদেশও ই-পাসপোর্ট যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। অবশ্য, চলতি মাসেই ই-পাসপোর্ট ইস্যুর কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা পিছিয়ে গেছে। কর্মকর্তারা বলছেন, শিগগিরই ই-পাসপোর্ট প্রদানের কাজ শুরু হতে পারে। এদিকে, পাসপোর্ট করার ক্ষেত্রে নিয়মকানুন আগের চেয়ে কঠিন হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। মূলত পাসপোর্ট জালিয়াতি রোধ করতে এখনকার কিছু নিয়ম পাল্টানো হচ্ছে।

ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর বলছে, এতদিন পাসপোর্ট করার আবেদনের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র বা ‘এনআইডি’ কিংবা ‘জন্মনিবন্ধন সনদ’-এর যেকোনো একটির অনুলিপি জমা দিলেই হতো। এ সুযোগে এনআইডি থাকলেও বয়স কম দেখিয়ে বা ভিন্ন পরিচয়ে ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা থেকে জন্মনিবন্ধন সনদ নিয়ে পাসপোর্ট করে নিচ্ছেন অনেকে। এমনকি মিয়ানমার থেকে এসে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারাও ভুয়া জন্মনিবন্ধন সনদ দিয়ে পাসপোর্ট করিয়ে নিয়েছে–এমন অভিযোগ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে পাসপোর্ট জালিয়াতি বন্ধে কঠোর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নতুন নিয়মে এখন থেকে ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে কাউকেই এনআইডি ছাড়া পাসপোর্ট দেওয়া হবে না। আর ১৫ বছরের কম বয়সীদের পাসপোর্ট করার ক্ষেত্রে মা-বাবা উভয়ের এনআইডির কপি দিতে হবে। এছাড়া প্রযোজ্য অন্যান্য ক্ষেত্রে এনআইডির সত্যায়িত কপি জমা নেওয়া হবে। গত ৮ ডিসেম্বর ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর এক অফিস আদেশে এসব নতুন নিয়মের কথা জানিয়েছে।

২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ই-পাসপোর্ট তৈরির কাজ শুরু হয়। ই-পাসপোর্ট প্রকল্পের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে বছর দুয়েক আগে কারিগরি সহযোগিতার জন্য জার্মানির ‘ভেরিডোজ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি হয়। আগারগাঁও, যাত্রাবাড়ী, উত্তরা ও সেনানিবাস অফিস থেকে ই-পাসপোর্টের সুবিধা পাওয়া যাবে। পর্যায়ক্রমে এ সুবিধা ঢাকার বাইরে দেওয়া হবে। বিদেশে বাংলাদেশের ৭০টি মিশনেও ই-পাসপোর্ট কার্যক্রম চালু হবে। দুই ক্যাটাগরির ই-পাসপোর্টে চার ধরনের ফি রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তার মধ্যে থাকবে জরুরি ও অতি জরুরি এবং ৫ বছর ও ১০ বছর মেয়াদের পাসপোর্ট। প্রথম পর্যায়ে ৩০ লাখ ই-পাসপোর্ট বই সরবরাহ করার কথা রয়েছে। ই-পাসপোর্ট হবে ৪৮ ও ৬৪ পৃষ্ঠার। ফি হবে সর্বনিম্ন সাড়ে ৩ হাজার এবং সর্বোচ্চ ১২ হাজার টাকা।

পাসপোর্ট জালিয়াতি রোধ করার দুটো পর্যায় রয়েছে। প্রথমটি পাসপোর্টধারীর বিভিন্ন তথ্য সংরক্ষণ এবং প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট। দ্বিতীয়টি নাগরিকত্ব প্রমাণে প্রয়োজনীয় নানা সনদ এবং ওই নাগরিক কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত কি না সে সংক্রান্ত। এজন্যই পাসপোর্ট করতে হলে সবাইকেই পুলিশের কাছ থেকে একটি অনাপত্তিপত্র সংগ্রহ করে তা পাসপোর্টের আবেদনের সঙ্গে জমা দিতে হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন এক্ষেত্রে আরও কিছু সমস্যা রয়েছে। অনেক নাগরিকের ১৮ বছর বয়স হলেও জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি নেই। এ অবস্থায় চিকিৎসাসহ যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে বিদেশ যাওয়ার দরকার হলে জরুরিভিত্তিতে পাসপোর্ট করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়বেন তারা। সেক্ষেত্রে প্রথমে তাদের এনআইডি করতে হবে। তারপর পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে হবে। এতে অনেক সময় লেগে যাবে। কিন্তু সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী, পৌরসভা থেকে সঙ্গে সঙ্গেই জন্মনিবন্ধন সনদ পাওয়ার সুযোগ থাকায় তা সংগ্রহ করাটা সহজ। অর্থাৎ, দেখা যাচ্ছে দেশের সব নাগরিককে এনআইডি প্রদানের কাজ সম্পন্ন না হওয়াটা পাসপোর্ট করার ড়্গেত্রে একটা সমস্যা সৃষ্টি করছে। তাই দ্রুত ‍এই সমস্যা নিরসনে মনোযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি পাসপোর্ট ইস্যু ও নবায়নে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চালু করা গেলে ভোগান্তি কমে আসতে পারে। খেয়াল রাখা দরকার প্রাযুক্তিক কিংবা নিয়মকানুনের যে পরিবর্তনই হোক পাসপোর্ট করা বা নবায়ন নিয়ে নাগরিকদের ভোগান্তি যেন না বাড়ে।