২১তম সম্মেলনে দলের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি এবার ছুটি চাচ্ছিলাম।’ গতকাল শনিবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলনের শেষ দিনে সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি। এরপর তিনি কাউন্সিলরদের উদ্দেশে বলেন, ‘আসলে আমি চাচ্ছিলাম যে দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের দায়িত্বে ছিলাম, অন্তত আমাকে একটু ছুটি দেবেন। সামনে আপনাদের ভাবতে হবে। আমার ৭৩ বছর বয়স হয়েছে। এটা ভুলে গেলে চলবে না। নতুন নেতা নিয়ে ভাবতে হবে। দলকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে।’
টানা নবমবার সভাপতি নির্বাচিত হয়ে তিনি বলেন, ‘যে গুরুদায়িত্ব আপনারা আমাকে দিয়েছেন তা যেন যথাযথভাবে পালন করতে পারি তার জন্য সবার দোয়া চাই, সমর্থন চাই। এই কাউন্সিল থেকেই সংসদীয় বোর্ড ও স্থানীয় সংসদ মনোনয়ন বোর্ড কাউন্সিল গঠন করে নিতে চাই। আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মীর হ, ভালোবাসাই আমার চলার পথের শক্তি, অর্থসম্পদ নয়। আওয়ামী লীগ নেতা বানিয়েছে বলেই আমি সংগঠন গড়ে তোলার চেষ্টা করতে পেরেছি।’
দলের প্রতি নিজের অবস্থানের বিষপ্রেধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের দায়িত্বে আছি। ৩৯ বছর চলছে। আমি কোনো পদে থাকি বা না থাকি আওয়ামী লীগে আছি, এখানেই থাকব। এটাই আমার পরিবার। আমার আপনজন যাদের রেখে গিয়েছিলাম তাদের কাউকে পাইনি। তবে আমি পেয়েছিলাম বিশাল একটা পরিবার, সেটা হচ্ছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। নেতাকর্মীদের ভালোবাসাই আমার চলার পথের শক্তি। আমার অর্থসম্পদ নেই। নেতাকর্মীদের ভালোবাসাই আমার একমাত্র শক্তি। সেজন্য চেষ্টা করেছি সংগঠনকে গড়ে তুলতে। আমি আওয়ামী লীগে আছি, এখানেই থাকব। এটাই আমার পরিবার। ’৭৫ সালে আমি মা-বাবা, ভাইবোন হারিয়ে বিশাল এক পরিবার পেয়েছি। সেটা হলো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পরিবার।
ওবায়দুল কাদেরকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, এবার আপনারা আমাদের দায়িত্ব দিয়েছেন নতুন পর্ষদ গঠনের। ওবায়দুল কাদের পুনরায় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। আর সভাপতি হিসেবে আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন। আমি আমার সাধারণ সম্পাদককে অভিনন্দন জানাই। আমরা দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে কাজ করছি। ছাত্রলীগ থেকেই আমাদের সবার যাত্রা শুরু।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করতে হবে, মানুষ যাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়ে আমাদেরকে নির্বাচিত করে এবং আমরা যেন দেশসেবা করে যেতে পারি। জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ আমরা গড়তে পারি। এখানে কাউন্সিলরবৃন্দ আছেনÑ সংগঠনকে শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে হবে। আর জাতির পিতার যে আদর্শ সেই আদর্শ মেনেই চলতে হবে। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ যে স্বাধীনতা অর্জন করেছে সেই রক্ত যেন বৃথা না যায়, সে লক্ষ্য নিয়েই তার সরকার কাজ করে বিগত ১০ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। লক্ষ্য আরও অনেক দূর যেতে হবে। সেজন্য সংগঠনকে শক্তিশালী করতে হবে।
নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, দেখা যায় যে, অনেকেই ক্ষমতায় আসার পর জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারে না। কিন্তু আমরা সেটা পেরেছি। মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করেছি। সেক্ষেত্রে আমি বলব সকলকে সেই চিন্তা থেকেই কাজ করতে হবে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জাতির পিতার হাতে গড়া সংগঠন এবং জাতির যে কোনো ক্রান্তিলগ্নে এর নেতাকর্মীরা জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং জনগণের কল্যাণে কাজ করেছে। প্রতিটি কাউন্সিলরকে এটা মাথায় রাখতে হবেÑ জাতির পিতার সেই আদর্শ নিয়েই আমরা দেশকে গড়ে তুলব। জনগণ যে সরকারের সেবা পেতে পারে, জনগণের কল্যাণ করতে পারে, তাদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে, এটা কেবল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরই জনগণ উপলব্ধি করতে পেরেছে।
তিনি বলেন, উড়ে এসে জুড়ে বসারা সব সময় নিজেদের ভাগ্য নিয়ে এবং অসৎ উপায়ে ক্ষমতা দখলকে বৈধ করার কাজেই ব্যস্ত ছিল। তারা জনগণের কথা চিন্তা করেনি। ’৭৫-এ জাতির পিতাকে হত্যার পর এদেশে যে হত্যা, ক্যু এবং ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু হয়েছিল যেখানে গণতন্ত্র ছিল না, কারফিউ গণতন্ত্র ছিল। যেখানে সেনাতন্ত্র ছিল, সামরিক স্বৈরশাসকরা রাষ্ট্র শাসন করেছে দীর্ঘ ২১ বছর, এরপর আবার ২০০১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত। এদেশে ঋণখেলাপি কালচার, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, মাদক, দুর্নীতি এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেধাবী ছাত্রদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে তাদেরকে ব্যবহার করাসহ পুরো সমাজটাকে তারা ধ্বংসের পথে টেনে নিয়ে যায়। যে সরকারের কোনো নীতি-আদর্শ থাকে না, কোনো লক্ষ্য থাকে না, সে সরকার চলে কী করে, প্রশ্ন তোলেন তিনি। এ সময় তিনি বঙ্গবন্ধুর লেখা অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা এবং বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের গোপন প্রতিবেদন নিয়ে প্রকাশিত ১৪ খ- ভলিউমের বইগুলো দলের প্রতিটি নেতাকর্মীকে পড়ার পরামর্শ দেন।