বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) নিয়ে গতকাল শনিবারও প্রতিবাদমুখর ছিল ভারতের উত্তর প্রদেশ। শনিবার রাজ্যের রামপুরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে এক ব্যক্তি নিহত হয়। এ নিয়ে গত বৃহস্পতিবার থেকে টানা বিক্ষোভ-সহিংসতায় রাজ্যে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৫ জনে দাঁড়িয়েছে। নিহতদের মধ্যে আট বছর বয়সী এক শিশুও রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে এনডিটিভি। গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর শুরু হওয়া প্রতিবাদ থেকে সহিংসতার শুরু
হয়। বৃহস্পতিবার লক্ষেèৗতে একজন ও সম্ভলে একজন নিহত হয়। এতে রাজ্যটিতে নাগরিকত্ব আইন নিয়ে প্রতিবাদ-সহিংসতায় মোট নিহতের সংখ্যা ১৫ জনে দাঁড়িয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, মিরাটে চার জন, ফিরোজাবাদে ও বিজনরে দুই জন করে এবং সম্ভল, কামপুর, বেনারস ও লক্ষেèৗতে একজন করে নিহত হয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে সহিংসতায় উত্তর প্রদেশে পুলিশের ২৬৩ জন সদস্য আহত হয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার সাহারানপুর, দেওবন্দ, শামলি, মুজাফ্ফরনগর, মিরাট, গাজিয়াবাদ, হাপুর, সম্ভল, আলিগড়, বেরাইচ, ফিরোজাবাদ, কানপুর, ভাদোহি ও গোরখপুর জেলায় সহিংসতা হয়েছে। তবে নিহতদের একজনও পুলিশের গুলিতে মারা যায়নি বলে দাবি উত্তর প্রদেশের পুলিশের মহাপরিচালক ওপি সিংয়ের। তিনি বলেন, ‘আমরা একটিও গুলি ছুড়িনি।’ কিন্তু অপর এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘যদি কোনো গুলি হয়ও, তা এসেছে বিক্ষোভকারীদের দিক থেকে।’
উত্তর প্রদেশ ছাড়াও শুক্রবার ভারতের বিভিন্ন জায়গায় বিতর্কিত এ আইনটির বিরুদ্ধে তুমুল বিক্ষোভ হয়েছে। দিল্লিতে পুলিশের অনুমতির তোয়াক্কা না করেই হাজার হাজার মানুষ জামা মসজিদ থেকে মিছিল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। দিল্লি গেইটের কাছে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষও হয়েছে। গতকালও দিল্লিতে ইন্ডিয়া গেটের সামনে বিক্ষোভ হয়। এছাড়া কর্নাটকেও কয়েক হাজার মানুষ রাস্তায় নামে আইনের বিরোধিতা করে।
বিক্ষোভ পরিস্থিতি সামলাতে কেন্দ্রীয় সরকার বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত এলাকায় ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দিয়েছে। অনেক এলাকায় জারি করা হয়েছে কারফিউ। আন্দোলনকারীরা তাদের কণ্ঠরোধে কেন্দ্রীয় সরকারের নানান দমনমূলক পদক্ষেপেরও তীব্র প্রতিবাদ জানান। বিক্ষোভকারীদের ইট-পাটকেল ও পাথর ছোড়ার জবাবে পুলিশ লাঠিচার্জ করে ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে।
দ্য হিন্দু জানায়, গত বৃহস্পতিবার ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের নতুন এক ব্যাখ্যা দিয়েছে।
ব্যাখ্যায় বলা হয়, ১৯৮৭ সালের ১ জুলাইয়ের আগে যারা ভারতে জন্মেছেন, তারা সবাই ভারতের নাগরিক। এছাড়া ১ জুলাই ১৯৮৭ সাল থেকে ৩ ডিসেম্বর ২০০৪-এর মধ্যে যারা জন্ম নিয়েছেন এবং যাদের বাবা-মায়ের মধ্যে কোনো একজন ভারতের নাগরিক, তিনিও ভারতীয়। পাশাপাশি ৩ ডিসেম্বর ২০০৪ সালের পরে যারা জন্মেছেন এবং যাদের বাবা-মা দুজনেই ভারতের নাগরিক কিংবা একজন ভারতীয় নাগরিক এবং অন্য জন সেই সময়ে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ নন, তারাও ভারতের নাগরিক হিসেবেই গণ্য হবেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ ব্যাখ্যা নিয়েও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন অনেকে। তাদের ভাষ্য, ১৯৮৭ সালের ১ জুলাইয়ের আগে জন্মের নথি বাধ্যতামূলক ছিল না। নথি না থাকলে তারা এখন কী দেখাবেন? ২০০৪ সালের ৩ ডিসেম্বরের পরে জন্মানো কেউ যদি বাবা বা মায়ের মধ্যে কোনো একজনকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করতে না পারেন, তা হলে তার নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। কিন্তু তিনি যেহেতু ভারতে জন্মেছেন, তাই অ-মুসলিম হলেও নিজেকে শরণার্থী হিসেবে দাবি করে নতুন নাগরিকত্ব আইনের সুবিধা নিতে পারবেন না। দেশজুড়ে চলমান বিক্ষোভ-প্রতিবাদ দমনে এ ধরনের ‘নতুন নতুন ব্যাখ্যা’ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলেও আশঙ্কা বিরোধীদের।
এদিকে উত্তর প্রদেশে জনতা-পুলিশ সংঘর্ষে নিহতদের পরিজনের সঙ্গে দেখা করতে তৃণমূলের এক প্রতিনিধিদল আজ লক্ষেèৗ পৌঁছাবে। গতকাল তৃণমূলের তরফে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়েছে। চার সদস্যের ওই দলে আছেন লোকসভার প্রাক্তন তৃণমূল সাংসদ দীনেশ ত্রিবেদী, জয়নগরের তৃণমূল সাংসদ প্রতিমা মণ্ডল, রাজ্যসভার সাংসদ মহম্মদ নাদিমুল হক এবং আবির বিশ্বাস।
গতকাল পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার রাজপথ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দখলে ছিল। শহীদ মিনার থেকে মিছিল মুরলীধর সেন লেনের বিজেপির দপ্তরের দিকে যেতে শুরু করে। কিন্তু পুলিশের বাধায় মিছিলটি সেদিকে যেতে পারেনি।
গত শুক্রবার দিল্লি পুলিশের হাত গলে পালিয়ে গিয়েছিলেন ভীম আর্মির প্রধান চন্দ্রশেখর আজাদ। কিন্তু পুলিশের সঙ্গে লুকোচুরি খেলায় শেষ পর্যন্ত ছেদ টানতে হলো তাকে। শনিবার তাকে দিল্লির জামা মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে গ্রেপ্তার করেছে দিল্লি পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ। পরে আদালত আজাদকে ১৪ দিনের কারাদণ্ড দেয়। এসময় আরও পনের জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। দিল্লি পুলিশকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদে ফের বিক্ষোভ করতে শুরু করেছেন জামিয়ার শিক্ষার্থীরা।
দেশজুড়ে নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হলেও, গতকাল দিল্লিতে আইনের পক্ষে রাস্তায় নামেন এক হাজারের বেশি শিক্ষক ও গবেষক। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সমর্থনে তারা রাস্তায় নামেন। জওয়াহেরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার প্রমোদ কুমার, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক স্বপন দাশগুপ্ত, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর সুনয়না সিং স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এই আইন পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানে চাপে থাকা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ভারতে আশ্রয় নিতে সাহায্য করবে। ১৯৫০ সালে লিয়াকত-নেহরু চুক্তি ব্যর্থ হওয়ার পর কংগ্রেস, সিপিআই (এম)সহ অনেক দল তাদের আদর্শিক অবস্থান থেকে সরে এসেছে।’