যারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করে খেলাপি হয়েছেন, তাদের দেওয়া বিশেষ সুবিধা আরও ‘খারাপ’ ঋণখেলাপিদেরও দিতে চায় ব্যাংকগুলো। যেসব খেলাপি ঋণ আদায়ের সুযোগ খুবই কম, অবলোপন করা সেই ঋণগ্রহীতাদেরও সরকার ঘোষিত ঋণ পুনঃতফসিল ও এককালীন এক্সিট নীতিমালায় সুবিধা দিতে চায় রাষ্ট্রায়ত্ত চার বাণিজ্যিক ব্যাংক। এছাড়া ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়ার পরও ব্যাংক যাতে জামানত বিক্রি করে অর্থ আদায় করতে না পারে, সেজন্য করা রিট মামলাকারীদেরও এ সুবিধা দেওয়া হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারা যৌথভাবে স্বাক্ষর করে গত ২ ডিসেম্বর একটি আবেদন পাঠিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। আবেদনে রিট মামলায় আটকে থাকা খেলাপি ঋণ ও অবলোপন করা ঋণগুলোকেও ঘোষিত নীতিমালার আওতায় বিশেষ সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ওই আবেদন পর্যালোচনা করে জরুরিভিত্তিতে কার্যক্রম গ্রহণ করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশনা দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কী করছে, তাও জানাতে বলেছে বিভাগটি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. ফজলে কবিরও এ ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন একটি ব্যাংকের এমডি। ফলে তারা আশা করছেন, শিগগিরই এ বিষয়ে সার্কুলার জারি করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে ব্যাংক খাত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রিটকারী ও অবলোপনকৃত ঋণের খেলাপিরা আরও বেশি ‘খারাপ’ ও শক্তিশালী। তাদের এ ধরনের সুবিধা দিয়ে খুব একটা লাভ হবে না। কারণ যাদের ঋণ অবলোপন করা আছে বা হাইকোর্ট থেকে স্থগিতাদেশ নিয়েছে, তারা খুবই শক্তিশালী। অর্থ পরিশোধের কোনো ইচ্ছা তাদের নেই।
২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণখেলাপিদের মাত্র ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট পরিশোধ সাপেক্ষে ১০ বছর মেয়াদে পুনঃতফসিল সুবিধা দিয়ে বিশেষ নীতিমালা জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ওই ১০ বছরের মধ্যে প্রথমবার কোনো কিস্তিপরিশোধ করতে হবে না। ৯ শতাংশ সুদে পরবর্তী ৯ বছরে গ্রাহক ওই ঋণ পরিশোধের সুযোগ পাবেন। এছাড়া বিশেষ সুবিধায় খেলাপি গ্রাহকদের ঋণ এককালীন পরিশোধ করার সুযোগও রয়েছে এই নীতিমালায়। এই নীতিমালার আওতায় ২০২০ সালের ফেব্রম্নয়ারি পর্যন্ত খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধা দিচ্ছে ব্যাংকগুলো।
কোনো গ্রাহক ঋণ নেওয়ার পর তা নিয়মিত পরিশোধ না করলে প্রথমে তা খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি থাকা ঋণ একপর্যায়ে মন্দ ও ক্ষতিজনক মানে শ্রেণিকৃত হয়। একপর্যায়ে টাকা আদায়ের জন্য অর্থঋণ আদালতে মামলা করে ব্যাংক। ঋণ আদায়ে এ ধরনের সব চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ব্যাংক যখন বুঝতে পারে, এই টাকা আদায় হওয়ার নয়, তখন এ ধরনের হিসাব খেলাপির হিসাব থেকে আলাদা করে রাখা হয়। এটাকেই বলে অবলোপন। যেমন, অর্থঋণ আদালতে মামলার পর হলমার্কের কারখানা ও জমিজমা কয়েকবার নিলামে তোলার পর কোনো ক্রেতা পায়নি সোনালী ব্যাংক। টাকা পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা না দেখে হলমার্কের ঋণও অবলোপন করেছে ব্যাংকটি। গত অক্টোবর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ ৪০ হাজার ৮ কোটি টাকা।
এছাড়া ব্যাংক কোনো খেলাপি গ্রাহককে খেলাপি দেখালে, অর্থঋণ আদালতে মামলা করলে বা জামানতের সম্পত্তি নিলামে তুলতে গেলে ঋণখেলাপিরা উচ্চ আদালতে তার বিরুদ্ধে রিট মামলা করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত হাইকোর্টে ৫ হাজার ৩৭৬টি রিট মামলা রয়েছে, যার বিপরীতে ৫২ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা আটকে আছে। এসব রিটের মাধ্যমে আবেদনকারীরা আদালত থেকে খেলাপির ওপর স্থগিতাদেশ পেয়েছেন। ফলে এসব ঋণ গ্রহীতা থেকে ব্যাংক টাকাও পাচ্ছে না, আবার তাদের ঋণখেলাপি হিসেবে উল্লেখও করতে পারছে না। শীর্ষ ব্যাংকাররা এই ‘রিট আবেদনই’ খেলাপি ঋণ আদায়ে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন।
অবলোপন করা ও রিট মামলায় আটক খেলাপি ঋণের বাইরে গত নভেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা।
গত ১২ ডিসেম্বর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. আসাদুল ইসলাম রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকের কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের এমডিরা জানান, তারা চারজন স্বাক্ষর করে যৌথভাবে গত ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি আবেদন পাঠিয়েছেন। তাতে ঋণ পুনঃতফসিল ও এককালীন এক্সিট নীতিমালার আওতায় অবলোপন করা ঋণ ও রিট মামলায় আটকে থাকা ঋণগুলোকেও সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। আবেদনে তারা লিখেছেন, যেসব ঋণ ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর বা তার আগে রিটকৃত এবং রিটকালীন মন্দ বা কু-মানে শ্রেণিকৃত ছিল, সেসব রিটকৃত ঋণের ড়্গেত্রে রিটকারীদের সঙ্গে আলোচনা করে রিট মামলা প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেওয়া হবে। তারা মামলা প্রত্যাহার করে নিলে রিট মামলা দাখিলের তারিখ হতে ঋণটিকে মন্দ বা কু-মানে শ্রেণিকৃত বিবেচনায় নিয়ে বিশেষ নীতিমালার আওতায় পুনঃতফসিল বা এককালীন এক্সিট সুবিধা দেওয়া হবে। এতে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ তাৎপর্যপূর্ণভাবে কমে যাবে।
চার ব্যাংকের এমডি জানান, বিশেষ নীতিমালার আওতায় যতগুলো আবেদন পাওয়া গেছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ অবলোপন করা ঋণসংশ্লিষ্ট। অবলোপন করা ঋণগুলো ওই বিশেষ নীতিমালার আওতাবহিভূ©ত হওয়ায় তা আদায়ের ক্ষেত্রে নীতিমালার সুবিধা প্রয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থায় অবলোপন করা ঋণগুলোকে বিশেষ নীতিমালার আওতাভুক্ত করা হলে এর বড় একটি অংশ আদায় করা সম্ভব হবে। তারা আরও বলেন, অবলোপন করা ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ নেই। তবে এ ড়্গেত্রে এককালীন এক্সিট বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংকের এমডি ও সিইও শামস উল ইসলাম গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা চার ব্যাংকের এমডি একযোগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আবেদন করে অবলোপন ও রিট মামলায় আটকে থাকা খেলাপি ঋণগুলোকে ঘোষিত বিশেষ নীতিমালার আওতাভুক্ত করার প্রস্তাব করেছি।’ তিনি বলেন, ‘উচ্চ আদালতে রিট মামলায় আটকে থাকা ঋণগুলো প্রকৃতপক্ষে খেলাপি। আমরা যখন ঋণগুলোকে ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোতে (সিআইবি) খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করতে বলি, তখন খেলাপি ঋণগ্রহীতা উচ্চ আদালতে রিট করে বলে, তাকে খেলাপি দেখানো যাবে না। তার পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত থেকে তিনি রায় পান। তখন সিআইবিতে ওই ঋণ খেলাপি হিসেবে দেখানো না হলেও বাস্তবে কিন্তু খেলাপিই থাকে। আর ওই ঋণের বিপরীতে আমাদের শতভাগ প্রভিশনিং রাখতে হয়।’
‘আমরা যদি রিটকারীদের সঙ্গে আলাপ করে তাদের রিট মামলা তুলে নিতে বলি, তারা তুলে নেওয়ার পর ওই ঋণকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত বিশেষ নীতিমালার আওতায় ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্টে ১০ বছর মেয়াদে পরিশোধ করার সুযোগ দিতে পারব। তাতে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমবে। এতে রিট মামলার সংখ্যাও কমবে’– যোগ করেন শামস উল ইসলাম।
অবলোপন করা ঋণ সম্পর্কে অগ্রণী ব্যাংকের এমডি বলেন, ‘এ ধরনের ঋণ আরও বেশি খারাপ। এই ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা খুবই কম থাকে। অবলোপন করা ঋণের বিপরীতেও শতভাগ প্রভিশনিং রাখতে হয়। এ ধরনের খেলাপি ঋণ গ্রহীতাদের কিছুটা সুবিধা দিয়ে এককালীন এক্সিট সুবিধা দিতে পারলে ব্যাংকের জন্য ভালো।’
রিটকৃত ঋণ ও অবলোপন করা ঋণগুলোকে এ সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ‘ইতিবাচক’ জানিয়ে আরও তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। তিনি খুবই ইতিবাচক। অবশ্যই আমাদের প্রস্তাব অনুযায়ী রিটকৃত ও অবলোপনকৃত ঋণের ড়্গেত্রে ওই বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সবকিছু আদায়ের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু যারা হাইকোর্টে রিট করে খেলাপি ঋণকে নিয়মিত করে দেখাচ্ছে, তারা রাজনৈতিকভাবে অনেক শক্তিশালী। সুবিধা দিয়ে তাদের কাছ থেকে ঋণের অর্থ আদায় করা যাবে– এমন কথায় আমার কোনো আস্থা নেই। অবলোপন করা ঋণের ড়্গেত্রেও এটি সত্য। এতে ব্যাংক ও দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো কিছু হবে না।’