আমাদের দেশে এই বছরের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় পেঁয়াজ। পেঁয়াজের মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা জনগণের ধৈর্যের একটা পরীক্ষাও করে ফেলল। তারপর তারা অন্যান্য জিনিসের দামও বাড়িয়ে দিল। কিন্তু তা-ও প্রতিবাদে শেষ হয়ে গেল। সরকারের মন্ত্রণালয় থেকে নানা রকম পদক্ষেপ নেওয়ার পরেও কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং দেশের নাগরিকদের সাধারণ জ্ঞান বাড়ল। কোন কোন দেশ পেঁয়াজ উৎপাদন করে তা জানা গেল। বাংলাদেশের মানুষ চীনের পেঁয়াজ খাবে, মিসর, তুরস্ক, মিয়ানমারের পেঁয়াজ খাবেÑ এ কখনো কল্পনা করা যায়নি। আমদানিকারকরা তাদের আন্তর্জাতিক বাজারের খোঁজখবর যে খুব ভালো করে রাখেন তা জানা গেল। একদা পেঁয়াজ বিদেশ থেকে আমদানির সংবাদই আমরা জানতাম না। পরে জানলাম ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি হয়। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, আমাদের দেশের পেঁয়াজের ঘাটতি প্রধানত ভারতের পেঁয়াজ দিয়েই পূরণ হয়। এবং এসব ঘটনায় সর্বনাশ হয় কৃষকের।
এক সময় কৃষক হলুদের খুব ভালো দাম পেল। পরের বছর প্রচুর পরিমাণে হলুদ বুনল কিন্তু বিদেশি হলুদ এসে এমন দাম কমিয়ে দিল যে কৃষকদের মাঝে হাহাকার পড়ে গেল। সরকারি আনুকূল্যে আমদানিকারকরা আমদানি শুল্ক কম পাওয়ার ফলে কৃষকের এমন অবস্থা হলো যে রাস্তার খরচও উঠল না। আশঙ্কা করা হচ্ছে পেঁয়াজের ক্ষেত্রেও তাই ঘটবে। এবারে
কৃষক প্রচুর পেঁয়াজ ফলাবে, ভারত থেকে প্রচুর পেঁয়াজ আসবে, আমদানি শুল্ক কমিয়ে দেওয়া হবে আর সর্বনাশ হবে কৃষকের। এ ক্ষেত্রে সরকার যদি কৃষককে বাঁচানোর কথা ভাবে তাহলে সরকারকে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক একজন কৃষিবিদ। নিশ্চয়ই তিনি কৃষকের সমস্যার কথা ভাববেন এবং বিষয়টি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওপর ছেড়ে দেবেন না। কারণ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দুঃখজনকভাবে পেঁয়াজের সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। পারেনি বলেই ব্যবসায়ীরা সব কিছুর দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। সেখানে লাগাম ধরার সবগুলো অস্ত্রই ব্যর্থ হয়েছে। আসলে সংসদ যদি ব্যবসায়ী নির্ভর হয় তাহলে কোনো ব্যবস্থাই কার্যকর করা সম্ভব হয় না।
মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত জীবন ক্রমশই দ্রব্যমূল্য ও বাড়ি ভাড়ার জাঁতাকলে পিষ্ঠ হচ্ছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবহন খরচের চাপ। পরিবহন ব্যবসায়ীদের চাপে কোনো আইনই কার্যকর করা যাচ্ছে না। প্রতি পদে পদে ধর্মঘটের বাধা এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের একটা পর্যায়ে আপোসের ফলে এই ব্যবস্থাটাকে নাগরিকবান্ধব করা যাচ্ছে না। এ বছরটি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, পরিবহন নৈরাজ্যের মধ্য দিয়ে কেটে গেল। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সারা বিশ্বকে অস্থির করে রেখেছেন। অস্থিরতা এমন একটা পর্যায়ে গেছে যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট অভিশংসিত হতে হতে আবার বেঁচেও যাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ধারণা হচ্ছে অভিবাসন পৃথিবীর সব দেশের মানুষের জন্য ন্যায্য অধিকার। রাষ্ট্রটি সেভাবেই গড়ে উঠেছে। একসময় মনে হতো পৃথিবী থেকে বর্ণবাদ বোধহয় উঠেই গেল। মার্টিন লুথার কিং থেকে শুরু করে নেলসন ম্যান্ডেলার ভূমিকার কথা শ্রদ্ধাভরে সারা পৃথিবীর মানুষ স্মরণ করেছে। আব্রাহাম লিংকনও বর্ণবাদবিরোধী ভূমিকা নিয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে ট্রাম্পের ভূমিকা এবং তার কর্মকা- রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্টের জাতীয় ধারণাই বদলে দিচ্ছে। এর প্রভাব পৃথিবীর দেশে দেশে যেমন পড়েছে তেমনি আমাদের দেশেও পড়েছে। ন্যায্য অভিবাসন প্রত্যাশী লাখ লাখ মানুষ অপেক্ষা করছেন কবে তারা প্রিয়জনদের সঙ্গে মিলিত হবেন।
আরও একটি ঘটনা আমাদের তাড়িত করছে। আমাদের প্রতিবেশী ভারতে নাগরিকত্ব আইন চারদিকে দাবানল জ্বালিয়ে দিয়েছে। যার সূচনা আসাম থেকে। আসামকে বেছে নেওয়ার কারণ সম্ভবত বহুদিন আগে থেকেই আসামে বাঙালিবিরোধী একটা তৎপরতা আছে। মেঘালয় যখন আসামের মধ্যে ছিল তখনো অনেক ধরনের আন্তঃবিরোধ সেখানে দানা বেঁধেছিল। সেগুলো কালের আবর্তে কিছুটা মিটেও গেছে। কিন্তু নাগরিকত্ব বিল সংশোধন করার পর আসাম থেকে শুরু করাতে অন্যান্য রাজ্যেও লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। বিশেষ করে নাগরিত্ব বিরুদ্ধে ভারতের কোটি কোটি মুসলমান তাদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে চলেছেন। ভারত গণতান্ত্রিক দেশ বলে মানুষের সহনশীলতা যেমন বেশি তেমনি মতামত ব্যক্ত করার ক্ষমতাও তারা ধারণ করেন। মুক্তবুদ্ধি এবং অসাম্প্রদায়িকতার চর্চাকেও যুগের পর যুগ উৎসাহিত করা হয়েছে। কিন্তু সেখানেও যদি এত বছর পরে তিরিশের দশকের দ্বিজাতি তত্ত্বের ভূত যদি ফিরে আসে তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক।
বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে এসেছে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য। এ ক্ষেত্রে ভারতের একটা বড় সহায়ক ভূমিকা ছিল। একসময় ভারতে যে সাম্প্রদায়িকতা আছে এটাই আমরা ভুলে গিয়েছিলাম। কিন্তু দেখা যাচ্ছে এতগুলো বছর পরও তিরিশের দশকের সেই দ্বিজাতি তত্ত্ব রয়ে গেছে ভারতের রাজনীতিতে। সুস্পষ্টভাবে ভারতে মুসলিম শব্দটি ব্যবহার করা ঘোরতর আপত্তির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশ বিভাগের পর নানা কারণে বেশ বড় ধরনের একটা অভিবাসন হয়েছিল। এ দেশেও সাম্প্রদায়িক শক্তির কারণে কিছু কিছু জায়গা থেকে সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগ করতে হয়েছিল। কিন্তু মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে কেউ দেশত্যাগ করেছে বলে জানা যায়নি। এ অবস্থায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন। কারণ সাতচল্লিশের পরে ছিন্নমূল এ মানুষগুলো শরণার্থী শিবিরে থেকে কঠোর জীবন সংগ্রাম করে ভারতের নাগরিক হয়েছেন। যদি দেখা যায় আজ কোনো শত্রুতাবশত বা আইনের মারপ্যাঁচে তাকে দেশহীন করা হয় তাহলে সে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? বাবরি মসজিদের ঘটনার পরও কিছু লোক ভারতে অভিবাসন করেছে, যদিও খুব কঠোর হাতে বাংলাদেশের মানুষ সাম্প্রদায়িকতার মোকাবিলা করেছে। ভারতে জনগণের কন্ঠস্বর রোধ করা খুবই কঠিন ব্যাপার। কারণ গণতন্ত্রের চর্চার মধ্যেই তারা বড় হয়েছেন। খুব অবাক হই যখন ভারতের ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়, টেলিফোনে কথা বলা যায় না, মেইল পাঠানো যায় না। ভারতের মতো দেশে এখনো ১৪৪ ধারা ও কারফিউ জারি করতে হয়। এসবের আসলে মীমাংসা কী? বর্ণবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতার প্রত্যাবর্তন কি কোনো প্রাকৃতিক ব্যাপার? নাকি এর কোনো কারণ আছে?
সম্ভবত গণতন্ত্রের দুর্বল জায়গা হচ্ছে ভোট। এই ভোট নানা কারণে রাজনীতিকে প্রভাবিত করে। কোনো একটা বিষয় উসকে দিলে যদি মানুষ অন্ধ হয়ে যায় তাহলে এর চেয়ে ত্বরিত ব্যবস্থা আর কী হতে পারে। পৃথিবীটা কি আবার অমানবিক হয়ে যাচ্ছে? বিংশ শতাব্দীতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে উন্নতি হয়েছিল, শিল্প-সাহিত্যের যে বিকাশ ঘটেছিল তা সবই ছিল উন্নততর মানবিক উদ্দেশ্যে। কিন্তু হঠাৎ করেই তা থমকে দাঁড়াল। মানুষের জীবনযাপনের জন্য যে সুষম অর্থনীতি প্রয়োজন তা ব্যবসায়ীদের হাতে আটকা পড়ল। আর মানুষের ভবিষ্যৎ আশা-আকাক্সক্ষার যেখানে আশ্রয় সেই রাষ্ট্র যদি অনিরাপদ হয়ে যায় তাহলে পৃথিবীর দেশে দেশে যে উগ্রবাদ ও বিশৃঙ্খলার জন্ম নেবেÑ আমরা সে অবস্থা কেউ চাই না। ভারত বহুবার আঞ্চলিকতা এবং উগ্রবাদের সঙ্গে লড়াই করেছে। তাদের অভিজ্ঞতা সবচেয়ে বেশি। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা কি এই ধরনের নিবর্তনমূলক ব্যবস্থার কথা বলবে নাকি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করবে? এসব প্রশ্ন মানুষকে তাড়া করছে। ওদিকে প্রচার মাধ্যমের ব্যাপক অগ্রগতির ফলে প্রতিদিনই আমরা সংবাদ হিসেবে দুঃসংবাদই দেখে আসছি। তার মানে পৃথিবীতে আর কোনো সুসংবাদ নেই; দুঃসংবাদে ভরা এই পৃথিবীটা কি মানুষের বাসযোগ্য পৃথিবীতে পরিণত হবে?
লেখক
নাট্যব্যক্তিত্ব