এমডিকে অবরোধ

বেতন কমে যাওয়ায় বেসিক ব্যাংকে বিক্ষোভ

অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে লোকসানে পড়া এক সময়ের সেরা রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক টিকে থাকতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতা কমিয়েছে। পদভেদে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কমবে ১০ থেকে ৫০ হাজার টাকারও বেশি। ‘সাত বছর ধরে ক্রমাগত লোকসানের কারণে বিদ্যমান অতিরিক্ত বেতনভাতা ব্যাংকের পক্ষে বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে’ উল্লেখ করে নিজস্ব বেতন কাঠামো বাদ দিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর জন্য সরকারের জারি করা বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতনভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্যাংকটি। এ বিষয়ে গত রবিবার আদেশ জারি করেছে

ব্যাংকটি, যা ওইদিন থেকেই কার্যকর হবে বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে। গতকাল সোমবার সকালে ওই আদেশ প্রকাশ পাওয়ার পর থেকে রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রফিকুল আলম ও মহাব্যবস্থাপক (জিএম) আহম্মদ হোসেনকে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন। বাংলাদেশে কোনো রাষ্ট্র মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে এর আগে কর্মীদের বেতন কমিয়ে দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।

দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ঋণ বিতরণের উদ্দেশ্যে শতভাগ রাষ্ট্রীয় মালিকানায় ১৯৮৮ সালে গড়ে ওঠা ব্যাংকটি শুরু থেকেই সরকারের নিয়ন্ত্রণ ছাড়া অন্য বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মতো চলছিল। সবচেয়ে লাভজনক হিসেবে পরিচালিত হতে থাকা ব্যাংকটির বেতনভাতাও নিজেরাই নির্ধারণ করত। ব্যাংকটির কর্মীদের বেতনভাতা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বেতনভাতার চেয়ে অনেক বেশি ছিল। এমনকি অনেক বেসরকারি ব্যাংকের চেয়েও বেশি বেতন পাচ্ছিলেন বেসিক ব্যাংকের কর্মীরা। সর্বশেষ ২০১৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতনভাতা পাচ্ছিলেন তারা। আর অন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো বেতন দিচ্ছে সরকার ঘোষিত ২০১৫ সালের বেতন কাঠামো অনুযায়ী। এখন বেসিক ব্যাংক সরকার ঘোষিত ২০১৫ সালের বেতন কাঠামোতে কর্মীদের বেতনভাতা দেবে।

২০০৯ সালে আবদুল হাই বাচ্চু ব্যাংকটির চেয়ারম্যান নিয়োগ পাওয়ার পর ২০১২ সাল পর্যন্ত গুলশান, দিলকুশা ও শান্তিনগর শাখা থেকে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণের নামে লোপাটের ঘটনা ঘটে। চার বছর অনুসন্ধানের পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে ব্যাংকের ২৬ জন কর্মকর্তাসহ ১৫৬ জনের বিরুদ্ধে ৫৬টি মামলা করে। ওই টাকার বড় অংশই এখন খেলাপি এবং অনেক ঋণগ্রহীতার পরিচয়ও চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। অনিয়ম-দুর্নীতির পর ২০১২ সালে প্রথম লোকসানে পড়ে বেসিক ব্যাংক, যা এখনো অব্যাহত আছে। গত ১২ ডিসেম্বর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. আসাদুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির অনাদায়ী ও খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৪ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা। এটি ব্যাংকটির বিতরণ করা মোট ঋণের ৬০ ভাগ।

গত রবিবার বেসিক ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) আহম্মদ হোসেন স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়েছে, বেসিক ব্যাংকের বিগত সাত বছর ক্রমাগত লোকসান হওয়ায় বিদ্যমান অতিরিক্ত বেতনভাতা ব্যাংকের পক্ষে বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে বিধায় এবং বেসিক ব্যাংকের সমরূপ অন্যান্য রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের তুলনায় অত্যধিক বেতনভাতা চালু আছে বিধায় ব্যাংকের বিদ্যমান বেতন কাঠামো ও অন্যান্য সুবিধাদি বাতিল করা হলো। এর বদলে ২০১৫ সালে অর্থ মন্ত্রণালয় জারি করা ‘চাকরি (ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান) (বেতন ও ভাতাদি) আদেশের অনুরূপ বেতন কাঠামো গৃহীত হলো। এটি ২২ ডিসেম্বর, ২০১৯ থেকে কার্যকর করা হলো। ব্যাংকের বেতন কাঠামো বহির্ভূত অন্যান্য সুবিধাদি পর্ষদের অনুমোদনক্রমে দেওয়া হবে বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, গত ১১ ডিসেম্বর ব্যাংকটির ৪৮৭তম বোর্ডসভায় এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বেসিক ব্যাংকের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে গতকাল দিনভর আলাপ করে জানা গেছে, তারা এখনো জানেন না, তাদের কার বেতন কত কমবে। তবে সবাই নিশ্চিত যে, তাদের বেতন এতদিন ধরে যা পেয়ে আসছিলেন, তার চেয়ে কমে যাবে। সিনিয়র অফিসার পর্যায়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমার বেতন হয়তো ১০-১২ হাজার টাকা কমে যাবে। কিন্তু আমি কত পাব, তা এখনো জানি না। কারণ, মূল বেতন কমানোর এখতিয়ার কোনো ব্যাংকের নেই। এখন ব্যাংকের হিসাব শাখা ও মানবসম্পদ শাখা মিলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ করবে। অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কতটা থাকবে, তাও জানি না।

তিনি বলেন, ব্যাংকটি তো লাভজনক ছিল। ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে ব্যাংকটি ধ্বংস করা হয়েছে। এজন্য তো আমরা দায়ী নই। যারা অনিয়ম-দুর্নীতি করে ব্যাংক ধ্বংস করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিছু লোকের ‘পাপে’ সবার বেতন কমিয়ে দেওয়া মেনে নেওয়ার মতো নয়।

ডিজিএম পর্যায়ের এক কর্মকর্তা জানান, নিয়মানুযায়ী সরকারি চাকরিজীবীদের কোনো সুবিধা কর্তনের সুযোগ নেই। সরকার যখন নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করে, তখন কারও বেতন কমে গেলে বিশেষ ইনক্রিমেন্ট দিয়ে তার বেতন বাড়ানো হয়। আমরা বেসিক ব্যাংকের বেতন কাঠামো দেখে চাকরিতে ঢুকেছি। তখন আমরা আরও ভালো চাকরি নিতে পারতাম। এখন বয়স হয়ে গেছে, চাইলেও অন্য চাকরি নিতে পারব না। এখন এভাবে বেতন কমিয়ে দেওয়া অন্যায়, অযৌক্তিক ও বেআইনি।

জনসংযোগ শাখার এক কর্মকর্তা গতকাল রাত ৮টায় বলেন, এখনো ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেতন কমানোর প্রতিবাদে এমডি-জিএমকে তাদের কক্ষে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন। কর্র্তৃপক্ষের বেতন কমানোর সিদ্ধান্তে ব্যাংকের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

গত মার্চে বেসিক ব্যাংকের বেতন কমানোর পরিকল্পনা নেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। তার ভিত্তিতে বেতন পর্যালোচনা করতে একটি কমিটি গঠন করা হয়। পরে গত আগস্টে বেসিক ব্যাংকের এক অনুষ্ঠানে গিয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ‘আপনারা ৩৫৪ কোটি টাকা লোকসান করেছেন। মাত্র ৭২টা শাখার জন্য এখানে প্রায় ২ হাজার ১০০ জনবল আছে। এত লোকের এখানে কী কাজ?’

তিনি বলেন, ‘আপনারা একদিকে অন্যান্য ব্যাংকের তুলনায় বেতন বেশি নেন। অন্যদিকে ব্যাংক লোকসানে। এটা কোনোভাবেই সম্ভব হতে পারে না। আপনাদের বেতন কমানো হবে। আপনারা কর্মকর্তারা সবাই বসে সিদ্ধান্ত নেন। কীভাবে কত টাকা বেতন কমাবেন। সিদ্ধান্ত আমাকে জানান। এরপর আমি আমার সিদ্ধান্ত জানাব।’ মন্ত্রীর এ বক্তব্যের পর বেতন কমানোর কাজ গতি পায়।

বেসিক ব্যাংক ও রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকের বেতন কাঠামোয় বড় ধরনের তারতম্য রয়েছে। বেসিক ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালকের (ডিএমডি) মূল বেতন দেড় লাখ টাকা, সেখানে রাষ্ট্রায়ত্ত অন্য ব্যাংকের ডিএমডির মূল বেতন ৬৬ হাজার টাকা। বেসিক ব্যাংকের জিএমের মূল বেতন ১ লাখ টাকা, রাষ্ট্রায়ত্ত অন্য ব্যাংকে ৫৬ হাজার ৫০০ টাকা; বেসিক ব্যাংকে উপমহাব্যবস্থাপকের (ডিজিএম) মূল বেতন ৬৬ হাজার টাকা, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে ৫০ হাজার। বেসিক ব্যাংকে সহকারী মহাব্যবস্থাপকের (এজিএম) মূল বেতন ৪৮ হাজার, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে ৪৩ হাজার। প্রিন্সিপাল অফিসারের মূল বেতন বেসিক ব্যাংকে ৩৭ হাজার, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা। সিনিয়র অফিসারের বেতন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে ২২ হাজার টাকা, বেসিক ব্যাংকে ২৫ হাজার টাকা। অফিসার পদে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে মূল বেতন ১৬ হাজার, বেসিক ব্যাংকে ছিল ২০ হাজার টাকা। আর মূল বেতন বেশি হলে বাড়িভাড়া ভাতাসহ অন্যান্য ভাতাও বেড়ে যায়।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বেসিক ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বেতনভাতা বেশি হওয়ায় আরও কিছু সমস্যা হচ্ছিল। যেমন, ডিজিএম, জিএম ও ডিএমডিদের এক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে অন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে বদলি করা হয়। বেসিক ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বেতনভাতা অন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর চেয়ে বেশি হওয়ায় তাদের বদলি করা যেত না। তাছাড়া ভবিষ্যতে সরকারের বিভিন্ন ব্যাংক একীভূত করার পরিকল্পনা রয়েছে। অভিন্ন স্কেলে বেতন না হলে একীভূত করাও সম্ভব হবে না।