ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) নুরুল হক নুর ও ছাত্র পরিষদের নেতাদের ওপর হামলা ও ডাকসু ভবনে ভাঙচুরে জড়িতদের শাস্তির দাবি করেছেন শিক্ষার্থীরা। গতকাল সোমবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে সন্ত্রাসবিরোধী ছাত্র ঐক্যের ব্যানারে পূর্বঘোষিত বিক্ষোভ কর্মসূচিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) ও প্রক্টরেরও পদত্যাগ দাবি
করেন তারা। ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ ছাড়াও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা এ কর্মসূচিতে অংশ নেন। বিক্ষোভ কর্মসূচি থেকে আজ মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় রাজু ভাস্কর্যে সর্বদলীয় সমাবেশেরও ডাক দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আজ দুপুর ১২টায় ঢাবির অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল।
এদিকে হামলায় আহত ভিপি নুরসহ পাঁচজন এখনো ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) লাইফ সাপোর্টে থাকা তুহিন ফারাবীর ভেন্টিলেটর গতকাল সকালে খুলে দেওয়া হয়েছে। তাকে নিউরোলজি বিভাগের কেবিন বা ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হবে। বাকি চারজনের মধ্যে নুর ৩৫নং কেবিনে এবং অন্যরা ৩৬নং কেবিনে চিকিৎসাধীন। ভিপি নুর এখন ভালো আছেন জানিয়ে কর্র্তৃপক্ষ বলেছে, তাদের চিকিৎসার জন্য ৯ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে।
গত রবিবার কর্মসূচির পর ‘মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের’ একাংশের নেতাকর্মীরা ডাকসু ভবনে গিয়ে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতা নুর ও তার সঙ্গীদের ওপর হামলা চালায়। ওই সময় ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মীকেও সক্রিয় দেখা যায়। হামলার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যরা নুরসহ অন্যদের উদ্ধার করে ঢামেক হাসপাতালে পাঠান। তখন প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম গোলাম রব্বানী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘নুরসহ আহতদের ঢাকা মেডিকেলের ইমার্জেন্সিতে পাঠিয়েছি। আগে চিকিৎসা হোক, পরে সবার বক্তব্য শুনে তারপর ব্যবস্থা নেব।’ গতকাল এ হামলার তদন্তে ছয় সদস্যের কমিটি গঠন করেছে ঢাবি প্রশাসন। তবে হামলার সময় ডাকসু ভবনে থাকা নয়টি সিসিটিভি মনিটর ও সিপিইউ উধাও হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন ডাকসুর জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ।
গতকাল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের জানান, ভিপি নুরসহ ছাত্রনেতাদের পিটিয়ে আহত করার ঘটনায় হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর ‘মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের’ দুই নেতাকে আটক করার খবর জানায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। তারা হলেন মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আল মামুন ও ঢাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক ইয়াসির আরাফাত তূর্য। ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার আবদুল বাতেন জানান, গতকাল দুপুরে রাজধানীর শাহবাগ এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়। তবে বিকেল পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি বলে জানিয়েছেন শাহবাগ থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মাহবুবুর রহমান।
বিক্ষোভে উত্তাল ঢাবি : ভিপি নুর ও তার সহযোগীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে গতকাল দুপুরে ঢাবির রাজু ভাস্কর্যের সামনে জড়ো হন ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশনসহ বেশ কয়েকটি সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এ সময় নুরদের মারধরের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সহযোগীর ভূমিকা পালন করেছে অভিযোগ তুলে ভিসি ড. আক্তারুজ্জামান ও প্রক্টর এ কে এম গোলাম রব্বানীর পদত্যাগ দাবি করেন তারা। একই সঙ্গে সন্ত্রাস ছড়ানোর অভিযোগে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধেরও দাবি জানান তারা।
এরপর মিছিল নিয়ে শিক্ষার্থীরা ভিসি ও প্রক্টরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সেøাগান দিতে থাকেন। রাজু ভাস্কর্য থেকে মিছিলটি প্রক্টর কার্যালয়ের সামনে গিয়ে কিছুক্ষণ অবস্থান করে। এ সময় শিক্ষার্থীরা ‘নির্লজ্জ প্রক্টর, ধিক্কার ধিক্কার’, ‘ছাত্রলীগের কালো হাত ভেঙে দাও’, ‘সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ডাইরেক্ট অ্যাকশন’, ‘শিক্ষা ছাত্রলীগ একসাথে চলে না’Ñ সেøাগান দিতে থাকেন। এরপর মধুর ক্যান্টিন হয়ে মিছিলটি বেরিয়ে যাওয়ার সময় সেখানে অবস্থানরত ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা সরে দাঁড়ান।
এর কিছুক্ষণ পর মধুর ক্যান্টিনের সামনে আসেন ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়। তবে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেননি। এর আগে ডাকসু ভবনের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য ও ডাকসুর এজিএস সাদ্দাম হোসাইন। নুরদের ওপর হামলার ঘটনায় ছাত্রলীগের জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে তারা বলেন, ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে লিখলে ফোকাস পাওয়া যায়, এজন্য মিডিয়া এবং তারা (সাধারণ শিক্ষার্থী) ছাত্রলীগকে দোষারোপ করছে।
ক্যাম্পাস ঘুরে মিছিলটি আবারও রাজু ভাস্কর্যের সামনে এসে দাঁড়ায়। সেখানে ছাত্রদের সঙ্গে সংহতি জানাতে আসেন গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি। তিনি বলেন, ‘দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জরুরি অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। নিরীহ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানোর জন্য মুক্তিযুদ্ধের মঞ্চ নামে একটি স্থায়ী সন্ত্রাসী বাহিনী তৈরি করা হয়েছে। বরকন্দাজ প্রশাসন ছাত্রদের টুঁটি চেপে ধরেছে। বারবার ছাত্রদের ওপর হামলা চালিয়ে ভিসি প্রমাণ করেছেন তার প্রচ্ছন্ন মদদে ছাত্রলীগ এসব করছে।’ ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক আকতার হোসেন বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আর ছাত্রলীগের সন্ত্রাস চলতে দেওয়া হবে না। ছাত্রলীগের যেসব সন্ত্রাসী হামলা করেছে তা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে আছে। ফুটেজ প্রকাশ করে দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।’ প্রক্টরকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘যে প্রক্টর ছাত্রদের নিরাপত্তা দিতে অপারগতা জানায় তার পদে থাকার কোনো অধিকার নেই।’ ছাত্র ফেডারেশনের ঢাবি শাখার সভাপতি আবু রায়হান খান বলেন, ‘একের পর এক ঘটনা ঘটছে। কিন্তু ভিসি আর প্রশাসন চুপ। উনি কি ছাত্রলীগের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন? আমরা হামলার শিকার হলে ফোন ধরেন না। কিন্তু রাতের আঁধারে ছাত্রলীগের সঙ্গে জোট তৈরি করেন। ভিসি এবং প্রক্টরের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন চালাব।’
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি সালমান সিদ্দিক বলেন, ‘অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে বলা হয় স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবির। গণতান্ত্রিক দাবিতে কথা বললে হত্যা করা হচ্ছে। এজন্যই ৩০ লাখ শহীদরা জীবন দিয়েছেন? শান্তির নামে অশান্তি সৃষ্টি করছে ছাত্রলীগ। সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগকে বয়কট করুন।’
ডাকসুর সিসিটিভি মনিটর ও সিপিইউ উধাও : ভিপি নুর ও অন্যান্য ছাত্র নেতার ওপর হামলায় সময় ডাকসু ভবনে থাকা সিসিটিভির মনিটর ও সিপিইউ কে বা কারা নিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন ডাকসুর জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ। গতকাল তিনি বলেন, ডাকসু ভবনে মোট নয়টি সিসি ক্যামেরা রয়েছে। ক্যামেরাগুলোর নিয়ন্ত্রণের মনিটর এবং সিপিইউ ডাকসুর তার কক্ষে থাকত। যখন হামলা করা হয় তখন ভবনের প্রধান ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর কিছুক্ষণ পর ডাকসুর এজিএস সাদ্দাম ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাসকে নিয়ে ঘটনাস্থলে আসেন। সেখানে গিয়ে তারা ডাকসু ভবনের গেট খুলতে বলেন। কিছুক্ষণ পর গেট খুলে দিলে কিছু অনুসারী নিয়ে তারা ভবনের ভেতরে প্রবেশ করেন। তিনি আরও জানান, ঘটনার বিষয়ে অবহিত করতে তিনি ডাকসুর কোষাধ্যক্ষ ও ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলামের কার্যালয়ে যান। তবে তাকে কার্যালয়ে না পেয়ে আবার ডাকসু ভবনে ফিরে আসেন। তখন দেখেন তার কক্ষের তালা ভাঙা এবং ভেতরে মনিটর ও সিপিইউ নেই।
তদন্ত কমিটি গঠন : গতকাল ঢাবির জনসংযোগ বিভাগ থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নুরদের ওপর হামলার ঘটনায় কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আবু মো. দেলোয়ার হোসেনকে আহ্বায়ক করে ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ছয় কর্মদিবসের মধ্যে কমিটিকে সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেনÑ শামসুন নাহার হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. সুপ্রিয়া সাহা, সিনেট সদস্য অধ্যাপক ড. অসীম সরকার, স্যার পি জে হার্টজ ইন্টারন্যাশনাল হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মো. মহিউদ্দিন, সিন্ডিকেট সদস্য ড. মো. মিজানুর রহমান এবং সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাঈনুল করিম।
কেবিনে ফারাবী : গতকাল সকালে ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসিরউদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘রবিবার সব মিলিয়ে ২৮ জনের মতো হাসপাতালে এসেছিলেন চিকিৎসা নিতে। এখনো পাঁচজন চিকিৎসাধীন। ফারাবী আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। সকালে তার ভেন্টিলেটর খুলে দেওয়া হয়েছে। তাকে নিউরোলজি বিভাগের কেবিন বা ওয়ার্ডে শিফট করা হবে। বাকি চারজনের মাইনর ইনজুরি। আজ আমাদের এক্সপার্টরা তাদের দেখে পরে সিদ্ধান্ত নেবেন। নুরুল হক নুরের সিরিয়াস ইনজুরি ছিল না। তার কিছু ট্রমা ছিল। তবে এখন তিনি স্ট্যাবল ও ভালো আছেন।’
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের মধ্যে নুর ৩৫নং কেবিনে এবং এটিএম সুহেল, ফারুক হোসেন ও আমিনুল ইসলাম ৩৬নং কেবিনে চিকিৎসাধীন।
এদিকে সন্ধ্যায় নুরসহ ৫ জনের চিকিৎসার জন্য ৯ সদস্যের একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসিরউদ্দিন। তিনি জানান, নিউরো সার্জারির অধ্যাপক ডা. রাজিউল হককে প্রধান করে এই বোর্ড গঠন করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে তারা বোর্ড মিটিং করে ভর্তিকৃত ৫ জনের বিষয়ে চিকিৎসা বিষয়ক সিদ্ধান্ত নেবেন।
দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ : ডাকসু ভিপি নুরসহ তার সহযোগীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে গতকাল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) ‘সন্ত্রাস ও নিপীড়নবিরোধী মঞ্চের’ ব্যানারে মানববন্ধন করেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এছাড়া বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাছাড়া সুনামগঞ্জ, নোয়াখালী ও বরিশালে মানববন্ধন করেছে ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ।
(প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন ঢামেক, রাবি, শাবি, সুনামগঞ্জ, নোয়াখালী এবং বরিশাল প্রতিনিধি)