ভুয়া ছাড়পত্র ও মামলার তথ্য গোপন করে সুপার পদে যোগদান, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অশালীন আচরণ, অর্থ আত্মসাৎ এবং ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতাসহ ভূরি ভূরি অভিযোগ শ্রীবরদী উপজেলার রাণীশিমুল কেএইচডি দাখিল মাদ্রাসার সুপার আবদুল মান্নানের বিরুদ্ধে। দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে এসবের সত্যতাও মিলেছে। সম্প্রতি তার এমপিও বাতিল, অপসারণ ও শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন স্থানীয়রা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মান্নান ১৯৯২ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত শ্রীবরদী উপজেলার ভটপুর ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসায় ইবতেদায়ি শাখার মৌলভী পদে চাকরি করেন। তিনি ওই সময় মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ আবদুল জলিলের মাধ্যমে ভুয়া ছাড়পত্রে সহকারী শিক্ষক পদ দেখিয়ে ঝিনাইগাতী উপজেলার গজারীকুড়া ভারুয়া ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসায় সুপারের শূন্য পদে আবেদন
করেন। জলিলের ইনডেক্স ও কোড ব্যবহার করে সুপার পদে যোগদানও করেন। পরে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ওই মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটি তাকে বরখাস্ত করে। এর প্রতিবাদে মান্নান অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চেয়ে শেরপুর জজ আদালতে একটি মামলা করেন। কিন্তু মামলার নিষ্পত্তি না হলেও সেই তথ্য গোপন করে ২০১৭ সালের ১ জুলাই রাণীশিমুল কেএইচডি দাখিল মাদ্রাসার সুপার পদে আবেদন ও যোগদান করেন মান্নান। মাদ্রাসায় যোগদানের পরই অনুদান ও উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ পাওয়া ৬০ হাজার এবং ১ লাখ ৩৩ হাজার টাকা তুলে নেন। পরে ম্যানেজিং কমিটি ও স্থানীয়দের অভিযোগের তিনি তা ফিরিয়ে দেন।
আরও জানা যায়, মনগড়া মাদ্রাসা পরিচালনা, নির্বাচন না করেই ম্যানেজিং কমিটি গঠন, স্থানীয় সাংসদের সুপারিশ করা এডহক কমিটি বর্জন, কমিটিকে স্থানীয় ও জমিদাতাদের না রাখা, এলাকার বাইরে থেকে লোক এনে কমিটিতে রাখা, শিক্ষকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, সরকারি ছুটির দিনে পরীক্ষা গ্রহণ, নিয়মিত মাদ্রাসায় না আসাসহ বিভিন্ন অভিযোগে স্থানীয়রা সুপার মান্নানসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। সুপারের এসব অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে সন্তানকে ভর্তি করাচ্ছেন না স্থানীয়রা। সম্প্রতি সুপারের অপসারণ ও শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন ও বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপি দিয়েছেন তারা।
জানা যায়, শ্রীবরদী উপজেলার রাণীশিমুল গ্রামে ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘রাণীশিমুল কেএইচডি দাখিল মাদ্রাসা’। ১৯৯৪ সালে এটি এমপিওভুক্ত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘদিন জ্ঞানের আলো ছড়ালেও গত দেড় বছর থেকে মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা শূন্য। অন্য মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের নাম হাজিরা খাতায় তুলে টিকিয়ে রাখা হয়েছে এমপিও। শুধু তাই নয়; সমাপনী, জেডিসি ও দাখিল পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশনেও অন্য মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের দেখানো হচ্ছে।
মাদ্রাসায় গিয়ে দেখা যায়, সুপার নেই। অন্য শিক্ষকরা রোদ পোহাচ্ছেন ও খোশগল্পে মত্ত। কোনো শ্রেণিকক্ষেই শিক্ষার্থী নেই। শ্রেণিকক্ষের অবস্থাও নাজুক। ভাঙা টিনের বেড়া এবং মেঝেতে জন্মেছে ঘাস। বেঞ্চের ওপরে মুরগি ও ছাগলের বিষ্ঠা। ঘুণে ধরেছে ব্ল্যাক বোর্ড। স্থানীয় বায়োজীদ বোস্তামী বলেন, ‘এ মাদ্রাসায় পড়াশোনা হয় না। সুপার খুব রগচটা। মাঝেমধ্যে এলেও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন না। তাই ছেলেকে এখান থেকে টান দিয়ে অন্য মাদ্রাসায় দিছি।’ আরেক অভিভাবক আবুল হোসেন বলেন, ‘যেদিন পরীক্ষা নেওয়ার কথা ওইদিন পরীক্ষা হয় না। একদিন নবীর জন্মদিনে (১২ রবিউল আউয়াল) সুপার আইসা পুলাপানের পরীক্ষা নিছে।’
মাদ্রাসার জমিদাতা পরিবারের সন্তান আশরাফুল আলম বলেন, ‘সুপারের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। উনি জাল কাগজ আর মামলার বিষয় গোপন করে এখানে যোগদান করছেন। উনি এলাকার কাউকেই সম্মান করেন না। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গেও খারাপ ব্যবহার করেছেন। ম্যানেজিং কমিটিতে জমিদাতা ও স্থানীয়দের কাউকেই উনি রাখেননি। নির্বাচন না করেই তিনি শ্রীবরদী উপজেলা অ্যাকাডেমিক সুপারভাইজরকে ম্যানেজ করে কমিটি করেছেন। শিক্ষা কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই এসব অনিয়মকে তিনি নিয়ম করে ফেলেছেন।’
মাদ্রাসার সহকারী সুপার শামসুল হুদা বলেন, ‘মাদ্রাসার ব্যাপারে সুপারকে কিছু বলতে গেলেই তিনি ধমক দেন। এই মাদ্রাসা রাণীশিমুলের; কিন্তু তিনি কমিটিতে এখানকার কাউকেই রাখেননি। শিক্ষার্থী অনেক ছিল। সমাপনী, জেডিসি ও দাখিলের কয়েক পরীক্ষার্থী থাকলেও উপস্থিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা শূন্য। বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই অন্য মাদ্রাসার। শিক্ষক হাজিরার খাতাটাও তিনি তালা মেরে রাখেন। তিনি যেদিন আসেন, সেদিনই সেটাতে আমাদের স্বাক্ষর করতে হয়।’
মাদ্রাসার জুনিয়র মৌলভী আবদুল হাদী বলেন, ‘সুপার প্রতিনিয়ত দেরিতে আসেন। আবার চলে যান ছুটির আগে। মাদ্রাসায় আসেন মাসে তিন-চার দিন। এসব নিয়ে কিছু বলতে গেলে আমাদের শোকজ করেন এবং চাকরিচ্যুতির ভয় দেখান।’
সুপারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মুঠোফোনে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তা সত্য কি মিথ্যা সব আমার ব্যাপার। আপনি নিউজ কইরে কী করতে পারবেন, করেন গা! এসব আমার কাছে কোনো বিষয়ই না। আপনারেও দেইখা নিতে কোনো টাইম লাগবে না।’ জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘ইবতেদায়ি শিক্ষক হিসেবে তার সুপার হওয়ার কোনো কথা নয়। তথ্য গোপন করে থাকলে ব্যবস্থা নেব। তার অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়ে লিখিত কোনো অভিযোগ পাইনি। পেলে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’