নিরাপদ খাদ্য নিয়ে কিছুদিন আগেই দেশে তোলপাড় হয়ে গেল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় পাস্তুরিত ও অপাস্তুরিত দুধে ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক ও ক্ষতিকর অণুজীব পাওয়া যায়। দুধ নিয়ে বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে শিশুখাদ্যসহ অন্যান্য খাদ্যপণ্যে বিষাক্ত কীটনাশক ও নানা রাসায়নিকের উপস্থিতি নিয়েও ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়। এখন দেশের বাইরে থেকেও পাওয়া যাচ্ছে দেশের নানা সবজি ও কৃষিপণ্যে কীটনাশকসহ বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতির খবর। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক সিটি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ থেকে কেনা পেঁয়াজে ক্ষতিকর মাত্রায় বিষাক্ত সিসার উপস্থিতি পাওয়ার কথা জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়কে। বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করা শিম পরীক্ষা করে তাতে ফেনপ্রোপেথিন, অমিথোয়েট, ডাইমোথোয়েটের মতো বিষাক্ত পদার্থের উপস্থিতির কথা বাংলাদেশ হাইকমিশনকে জানিয়েছে যুক্তরাজ্য। ইউরোপীয় কমিশন চিঠি লিখে জানিয়েছে, বাংলাদেশের রপ্তানি করা গুঁড়ামরিচে মাত্রাতিরিক্ত ইথিয়ন ও ট্রিয়াজোপস কীটনাশক পাওয়া গেছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় বাংলাদেশের গুঁড়ো হলুদে মাত্রাতিরিক্ত বিষাক্ত সিসা পাওয়ার তথ্য জানায়।
বাংলাদেশ পেঁয়াজ রপ্তানি না করলেও অল্প মাত্রায় শাক-সবজি, হলুদ-মরিচ ও নানা
কৃষিপণ্য রপ্তানি করে থাকে। কিন্তু দেশে উৎপাদিত কৃষিপণ্য দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা মিটিয়ে থাকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শাক-সবজিসহ অন্যান্য ফসলে ক্ষতিকর মাত্রায় কীটনাশক ও অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতির কারণে মারাত্মক হুমকির মুখে রয়েছে জনস্বাস্থ্য। শাক-সবজিতে কীটনাশকের উপস্থিতির খবর বিদেশ থেকেই প্রথম এলো বা দেশেও প্রথম পাওয়া গেল বিষয়টি এমন নয়। ২০১৫ সালে নভেম্বর-ডিসেম্বরে ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরি-এনএফএসএল বেগুন, লালশাক ও শিমের নমুনা পরীক্ষা করে ক্ষতিকর মাত্রায় কীটনাশকের উপস্থিতি পায়। শীতকালীন সবজি ফুলকপিতে কীটনাশকের উপস্থিতি পাওয়া যায় মানবদেহে সহনীয় মাত্রার চেয়ে ৩৬ গুণ বেশি। তবে কোনো কোনো নমুনা সম্পূর্ণ নিরাপদও ছিল। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, তাদের এই গবেষণা প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরও এই সংকট নিরসনে কৃষি মন্ত্রণালয় ও জাতীয় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের উল্লেখযোগ্য তৎপরতা দৃশ্যমান হয়নি। সে সময়ে উদ্যোগ নিলে হয়তো এতদিনে পরিস্থিতির উন্নতি হতো।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউ-বারির কীটতত্ত্ব বিভাগের গবেষকদের মতে, কৃষকরা কীটনাশক ব্যবহারের যথাযথ নিয়ম না জানায় এবং অনুসরণ না করায় এই সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। যেসব কীটপতঙ্গ পাতার ওপর বসে শাকসবজি চুষে খায়, সেগুলো নির্মূল করতে ক্লোরোপাইরিফস ও কুইনালফস ব্যবহৃত হয়। একবার ছিটানোর ১০-১৫ দিন পর্যন্ত এটা সক্রিয় থাকে। কিন্তু অনেক কৃষকই কীটনাশক প্রয়োগের তিন-চার দিনের মধ্যেই সবজি বিক্রি করছেন। আবার ফল ছিদ্রকারী পোকা দমনে সাইপারমেথ্রিন বহুল প্রচলিত কীটনাশক। এর প্রভাব চার দিন পরই চলে যায়। কিন্তু মাঠপর্যায়ে অনেক কৃষকই চারদিন অপেক্ষা না করেই সবজি বিক্রি করছেন। এভাবে কীটনাশকের অবশেষ সবজিতে রয়ে যাচ্ছে এবং সেসব খেয়ে মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে। কীটনাশককে মানবস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি বলে মনে করছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান-আইইডিসিআর। প্রতিষ্ঠানটির গবেষকদের মতে, কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাবে প্রথম শিকার শিশুরা। আর এ কারণে দীর্ঘ মেয়াদে জটিল রোগে ভুগছেন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। শ্বাসকষ্ট, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়া, চুলকানি, বমি, পেটে ব্যথা, ডায়রিয়া, হাঁপানি থেকে শুরু করে হৃদযন্ত্র, ফুসফুস, লিভার ও কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে।
পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, মূলত আমদানি করা কীটনাশক কোনো ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই বাজারে ছড়িয়ে পড়ায় এবং সীমান্ত এলাকা দিয়ে অনুনোমোদিত কীটনাশক ও সার সরাসরি কৃষকের হাতে চলে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি হয়েছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি বাজার থেকে ৪৭টি ব্র্যান্ডের কীটনাশকের নমুনা পরীক্ষা করে কীটনাশকে সিসা, ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়ামের মতো ভারী ধাতু পেয়েছে। এ বিষয়ে করণীয় ঠিক করতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় কর্মকর্তারা বলেছেন, পরিস্থিতি মোটেই সন্তোষজনক নয়। যেভাবে চাল, শাক-সবজি, ডিম, মুরগিসহ বিভিন্ন পণ্যে কীটনাশক, ক্রোমিয়াম ও ক্যাডমিয়াম পাওয়া যাচ্ছে, তাতে এখনই ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় আগামী ১ ফেব্রম্নয়ারি থেকে বন্দরে পরীক্ষা ছাড়া কোনো কীটনাশকের চালান খালাস না করতে এনবিআরকে চিঠি দিয়েছে মন্ত্রণালয়। একইসঙ্গে নিরাপদ সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি সীমান্ত দিয়ে নিমœমানের কীটনাশক ও সারের চোরাচালান রোধে বিজিবির পাহারা বাড়াতে সীমান্তবর্তী জেলা প্রশাসকদের চিঠি দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া দেশের ভেতরে যাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা কীটনাশক ও সারে ভারী ধাতু বা ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশাতে না পারে সে জন্যও উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। এসব নির্দেশনা যাতে মাঠপর্যায়ে যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা একটা সামগ্রিক প্রয়াস। এজন্য কৃষি ব্যবস্থাপনা ও বাজার ব্যবস্থাপনায় জোর দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।