বায়ুদূষণ রোধে পরিকল্পিত নগরায়ণ

শুধু যানজট ও জলাবদ্ধতা নয়, রাজধানী ঢাকা এখন ভয়াবহ বায়ুদূষণের সম্মুখীন এবং পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইপিএর মতে, কোনো একটি শহরের বায়ুর মানের সূচক ২০০-এর বেশি হলে তাকে খুবই অস্বাস্থ্যকর বলা হয়। গত ২৪ নভেম্বর, রাত ৯টায় ঢাকার বায়ুর মানের গড় সূচক ছিল ২২০। এর মধ্যে কারওয়ান বাজার এলাকার বায়ুর মান ছিল ২৯৮, যা খুবই অস্বাস্থ্যকর। পৃথিবীর অনেক দেশে কোনো শহরে বায়ুর মানের সূচক ২০০ অতিক্রম করলে ওই শহরের মানুষকে মাস্ক পরার পারমর্শ দেওয়া হয়। ঘরের জানালা বন্ধ রাখতে বলা হয়। সাইকেলে চড়া নিষেধ করা হয়। শিশু ও বৃদ্ধদের খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হতে নিরুৎসাহিত করা হয়। ভারতের দিল্লি, মুম্বাই, থাইল্যান্ডের ব্যাংকক, চীনের পেইচিং প্রভৃতি শহরে বায়ুর মান খুবই অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে পৌঁছলে, সেসব শহরের সরকার বিশেষ স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা জারি করে। নাগরিকদের বায়ুদূষণ থেকে রক্ষা করতে নানান সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেয় স্বাস্থ্য বিভাগ। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না।

বাংলাদেশে বায়ুদূষণের উৎস নিয়ে চলতি বছর মার্চ মাসে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে বায়ুদূষণের তিনটি প্রধান উৎস হচ্ছে ইটভাটা, যানবাহনের কালো ধোঁয়া ও নির্মাণকাজ। বায়ুদূষণ মোকাবিলায় প্রধান কাজ হচ্ছে দূষণের উৎসগুলো বন্ধ করা। কিন্তু বাংলাদেশে তার বিপরীত কর্মকা-ই দৃশ্যমান হচ্ছে। গত আট বছরে বায়ুদূষণের এই তিন উৎস ক্রমেই বাড়ছে। বাড়ছে দূষণের ভয়াবহতা। ২০১৩ সালের পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুসারে দেশে ইটভাটার সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৯৫৯। ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ হাজার ৯০২টিতে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে রয়েছে ২ হাজার ৪৮৭টি ইটভাটা। এক গবেষণার তথ্যানুযায়ী, ২০১০ সালে দেশে মোট যানবাহনের সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৬৭৭টি। ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ১৯ হাজার ৬৫৪টিতে। বৈশি^ক বায়ুদূষণের ঝুঁকিবিষয়ক প্রতিবেদন ‘দ্য স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার-২০১৯’র তথ্য অনুযায়ী, বায়ুদূষণজনিত রোগে ২০১৭ সালে বাংলাদেশে ১ লাখ ২৩ হাজার মানুষ মারা যায়। গত ৩ মার্চ বিশ্বের বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এয়ার ভিজ্যুয়ালের ‘বিশ্ব বায়ুমান প্রতিবেদন-২০১৮’ অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বায়ুদূষণের কবলে থাকা রাজধানী শহরগুলোর তালিকায় ঢাকার অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। ঢাকা শহরের বাতাসে ক্ষুদ্র বস্তুকণার পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বেঁধে দেওয়া মাত্রার প্রায় ১০ গুণ বেশি।

বায়ুদূষণের ফলে রাজধানী ঢাকা শহরে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের স্বাভাবিক শ^াস-প্রশ^াস বিঘিœত হওয়ার পাশাপাশি নানা জটিল রোগ দেখা দিচ্ছে। চিকিৎসকদের কথা, বাতাসে ভারী ধাতু ও সূক্ষ্ম বস্তুকণা বেড়ে গেলে ক্যানসার, শ্বাসকষ্ট, স্নায়ুজনিত সমস্যা বেড়ে যায়। বুদ্ধিমত্তাও কমে যায়। বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে একজন মানুষ ২২ মাস আগে মারা যায়। দেশে বায়ুদূষণের অবস্থা একদিকে দিন দিন খারাপ হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে বায়ুদূষণের উৎসগুলো। বায়ুদূষণ রোধে মূল দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরের। দূষণ ঠেকাতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচারিত হলেও তার সুফল এখনো দৃশ্যমান হচ্ছে না। যানবাহনের দূষণ নিয়ন্ত্রণে এবং নির্মাণকাজের ধুলা নিয়ন্ত্রণেও কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না।

বায়ুদূষণ রোধে সবুজ গাছপালা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু শহররটিতে দূষণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমে আসছে দূষণ রোধের রক্ষাকবচ সবুজ গাছপালা। যানবাহনের ক্ষতিকর গ্যাস ও অতিক্ষুদ্র বস্তুকণার দূষণের মাত্রা এতটাই বেশি যে, ঢাকা শহরের গাছপালা টিকে থাকার ক্ষমতাও হারাচ্ছে। যতটুকু সবুজ আছে তা কতদিন টিকে থাকবে তা নিয়েও আছে আশঙ্কা। বায়ুদূষণের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছে ঢাকা শহরের রাস্তার পাশের গাছপালা। এসব গাছের টিকে থাকার ক্ষমতা স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে ৩০ শতাংশ কমে গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন এবং উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের যৌথ গবেষণায় এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। গবেষকরা বলছেন, গাছের পাতার পৃষ্ঠগুলো বাতাসের অতি ক্ষুদ্রকণা, সালফার ডাইঅক্সাইড, নাইট্রোজেনের অক্সাইড ও কার্বন-ডাইঅক্সাইডসহ দূষণকারী উপাদান শোষণ করে। এসব ক্ষতিকর উপাদান শোষণে গাছের পত্ররন্ধ্র বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। বায়ুদূষণের কারণে গাছের পাতার ক্লোরোফিলের সংখ্যা হ্রাস পায়। পত্ররন্ধ্রের খোলা ও বন্ধ হওয়ার প্রক্রিয়াটি ব্যাহত হয়। অন্যদিকে সালফার ডাইঅক্সাইড পানির সঙ্গে মিশে সালফিউরিক এসিড তৈরি করে, যা ক্লোরোফিলের প্রধান উপাদান ম্যাগনেশিয়ামের পরিমাণ হ্রাস করে। এর ফলে পাতা বিবর্ণ হতে থাকে। আকার আকৃতিরও পরিবর্তন ঘটে। গাছের ফুল-ফল ধারণক্ষমতা আস্তে আস্তে কমে যায় এবং গাছ মারা যায়।

অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে গত তিন দশকে ভূ-উপরিস্থিত পানি, জলাশয় ও সবুজ গাছপালা কমে দূষণ বেড়েছে। ইট-পাথরের নির্মাণ, রাস্তা মেরামত ও খোঁড়াখুঁড়ির মতো কাজগুলো সঠিক ব্যবস্থাপনায় না হওয়ায় এ দূষণ আরও বাড়ছে। এই কাজগুলো একেক সংস্থা একেকভাবে করছে। নগর ব্যবস্থাপনার এ সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় দরকার। এজন্য প্রয়োজন নগরের সেবাদানকারী সব প্রতিষ্ঠানকে একক নগর কর্তৃপক্ষের অধীনে নিয়ে আসা। ঢাকা শহরের সবুজ অঞ্চলের পরিমাণ নিয়ে জাপানের কিয়াটো ও হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণারত বাংলাদেশের তিন গবেষকের মতে, ১৯৯৫ সালে ঢাকার সবুজ অঞ্চল ছিল মোট আয়তনের ১২ শতাংশ। ২০১৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৮ শতাংশে। বর্তমান ঢাকা শহরে সবুজ অঞ্চল ৬ থেকে ৭ শতাংশের বেশি হবে না। তাহলে কীভাবে ভালো থাকবে ঢাকার বাতাস?

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় পাঁচ কোটি লোক নগরে বসবাস করে। ২০৩০ সালে নগরবাসীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে আট কোটির ওপর। আগামী দিনের বাংলাদেশ হবে নগরীয় বাংলাদেশ ও নগরীয় কৃষির বাংলাদেশ। আমরা ইচ্ছে করলেও নগরায়ণকে ঠেকিয়ে রাখতে পারব না। তাই পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব নগরায়ণ ছাড়া বায়ুদূষণের মতো ভয়াবহ অবস্থা থেকে আমরা পরিত্রাণ পাব না। এজন্য ১০০ বছর সময়কে সামনে রেখে দেশের প্রতিটি নগরের জন্য বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা তৈরি ও তা বাস্তবায়ন করতে হবে। নগরের নির্দিষ্ট পরিমাণ জমিতে বৃক্ষরোপণ ও জলাশয় নির্মাণ করতে হবে। বিদ্যমান প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো সুরক্ষা করতে হবে। নগর ও তার আশপাশে নগরীয় কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ইটভাটাগুলো বন্ধ করে মাটিপোড়া ইটের পরিবর্তে অবকাঠামো নির্মাণে কংক্রিটের ব্লক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। বহুতল ভবন নির্মাণে জাতীয় বিল্ডিং কোড যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। প্রতিটি বহুতল ভবনের ছাদে বাগান, সৌরবিদ্যুৎ ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। নগরবাসীদের চিত্তবিনোদনের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। নগর সবুজায়নের প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে হবে। বর্জ্য থেকে জৈব সার ও বিদ্যুৎ তৈরির আধুনিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে। এজন্য প্রতিটি নগরে বিদেশের মতো করে নয়, আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, মাটি, আবহাওয়া এবং শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বশাসিত, স্বনির্ভর ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যার কাজ হবে পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব নগরায়ণ। এছাড়া মাটি, পানি ও বায়ুদূষণের মতো অভিশাপ থেকে পরিত্রাণের কোনো পথ আমাদের সামনে খোলা নেই।

লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস লি., গোপালপুর, নাটোর