নীলে কী মাহাত্ম্য

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৭:৫৪ এএম

সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মহারণে নীল রঙের জার্সি পরে খেলতে চায় আর্জেন্টিনা। এ জন্য ফিফার কাছে আবেদন জানিয়েছে তারা। ফিফা দুই দলের টেকনিক্যাল মিটিংয়ে এ সিদ্ধান্ত নেবে আজ। মিটিংয়েই নির্ধারণ করা হবে কোন দল হোম টিম এবং কোন দল অ্যাওয়ে টিম হিসেবে খেলবে। যদি দুই দলই একই জার্সির আবেদন করে, তবে হোম টিম হিসেবে নির্বাচিত দলই জার্সি বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে।

আর্জেন্টিনা কেন এই আবেদন করেছে, তা নিয়ে অফিশিয়াল কোনো মন্তব্য না করা হলেও, এর পেছনে রয়েছে লাতিন পরাশক্তিদের ফুটবল সংস্কৃতির চিরন্তন অন্ধবিশ্বাস। বিশ্বকাপের ইতিহাসে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড মোট ৫ বার মুখোমুখি হয়েছে, যার মধ্যে ৩ বারই নক-আউট পর্বে। ইংল্যান্ডের ৩ জয়ের বিপরীতে আর্জেন্টিনার জয় ২টি। প্রথম জয়টি ছিল ১৯৮৬-র সেই ইতিহাস খ্যাত কোয়ার্টার ফাইনাল, যেখানে দিয়েগো ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত গোল অব দ্য সেঞ্চুরিতে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে জয়ী হয়। দ্বিতীয়টি ছিল ১৯৯৮ বিশ্বকাপ শেষ ১৬। নির্ধারিত সময়ের খেলা ২-২ সমতার পর পেনাল্টি শুটআউটে জয় পায় আর্জেন্টিনা। মজার ব্যাপার হলো, এই দুটি ঐতিহাসিক জয়েই আর্জেন্টিনা আকাশি-সাদার বদলে তাদের বিকল্প গাঢ় নীল জার্সি পরে মাঠে নেমেছিল। অন্যদিকে, ২০০২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা তাদের নিয়মিত আকাশি-সাদা জার্সি পরে খেললে ইংল্যান্ড (লাল জার্সি পরা) সেই ম্যাচে জয়ী হয়।

ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে বিকল্প জার্সির অতীত ইতিহাস যেন এক মহাকাব্য। ২২ জুন, ১৯৮৬Ñ আর্জেন্টাইন ফুটবলের জন্য এটি সাধারণ কোনো দিন ছিল না। মালভিনাস (ফকল্যান্ড) যুদ্ধের ক্ষত দগদগে থাকা অবস্থায় মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে এস্তাদিও আজতেকায় মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড।

জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের তখন ৪৮ ঘণ্টাও বাকি নেই, অথচ মাঠে নামার জন্য দলের কাছে কোনো উপযুক্ত জার্সি ছিল না! কোচ কার্লোস বিলার্দো তখন এএফএর কিংবদন্তি কর্মকর্তা রুবেন মোশেল্লা এবং ঐতিহাসিক কিটম্যান টিটো বেনরোসকে ডেকে পাঠান। তিনি বুঝিয়ে বলেন যে, সাধারণ নীল জার্সিগুলো গরমে খেলোয়াড়দের শরীরে সেঁটে যাচ্ছে, যার ফলে শরীর থেকে বেশি পানি ঝরে ওজন কমে যাচ্ছে। তাই তিনি এমন জার্সি চেয়েছিলেন যা হবে হালকা এবং জালিযুক্ত (ছিদ্রযুক্ত)। মোশেল্লা সেই স্মৃতি মনে করে বলেন, “তিনি (বিলার্দো) একটি কাঁচি চাইলেন, জার্সিটি ভাঁজ করলেন এবং ‘টাক, টাক, টাক’ করে তাতে ছিদ্র করতে লাগলেন। যখন তিনি ওটা খুললেন, জার্সিতে বড় বড় ফুটো হয়ে গিয়েছিল।”

বুয়েনস আইরেসে অফিশিয়াল স্পন্সরের কাছে কোনো স্টক না থাকায় এবং কর্মকর্তাদের আপত্তির মুখে, মোশেল্লা ফিফার দেওয়া একটি গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। কোচিং স্টাফের একটাই নির্দেশ ছিলÑ ‘যেভাবেই হোক জালিযুক্ত নীল জার্সি জোগাড় করো।’ দলের ব্যাক-আপ গোলরক্ষক হেক্টর জেলাদা তাকে মেক্সিকো সিটির অন্যতম বিপজ্জনক এলাকা ‘তেপিতো’তে যাওয়ার পরামর্শ দেন। সেখানেই ২০টি নীল জার্সির দুটি স্তূপ পাওয়া যায়। একদল জার্সি ছিল আগের মতোই ভারী; অন্যটি ছিল চকচকে কাপড়ের, যা বিলার্দো একদমই পছন্দ করতেন না। কিন্তু তখনই অধিনায়ক দিয়েগো ম্যারাডোনা সেখানে আসেন এবং জার্সিটি দেখে সবুজ সংকেত দিয়ে বলেন, ‘এটা সুন্দর, কার্লোস। এটা পরেই আমরা জিতব।’

সেই নতুন কেনা জার্সিতে কোনো নম্বর বা এএফএ-র লোগো ছিল না। তাই মেক্সিকোর ‘ক্লাব আমেরিকা’র গৃহকর্মীদের ডেকে এনে সাধারণ ইস্ত্রি দিয়ে একে একে নম্বরগুলো জার্সিতে বসানো হয়। আর লোগোর জন্য পুরনো ট্রেনিং জার্সি থেকে এএফএ-র প্রতীক কেটে নেওয়া হয়েছিল, যার ফলে লোগোর নিচের সোনালি পাতার অংশটুকু বাদ পড়ে যায়। এই জোড়াতালি দেওয়া জার্সি পরেই ‘এল দিয়েগো’ করেছিলেন সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে সেরা গোলটি।

তাই আবার ইংল্যান্ডের সঙ্গে আবার যখন ম্যাচ বিশ্বকাপে, আর্জেন্টিনা মনে করছে আকাশি-নীল না, গাড় নীলেই তাদের ভাগ্য লুকিয়ে আছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত