লিওনেল মেসির ক্ষেত্রে সবসময়ই নতুন কিছু না কিছু থাকে। যখন ৪ কোটি ৬০ লাখ আর্জেন্টাইন তার আসন্ন বিদায়ের কথা ভেবে প্রার্থনা করছেন, ঠিক তখনই তার জীবনের গল্পে যুক্ত হলো এক অভূতপূর্ব অধ্যায় : ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ক্লাসিকো ম্যাচ এবং তা আর কোথাও নয় একেবারে ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে।
আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের অধিনায়ককে তার পুরো ক্যারিয়ারজুড়ে ডিয়েগো ম্যারাডোনার সঙ্গে তুলনার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। চিরন্তন দ্বিমুখী বিতর্কে অভ্যস্ত একটি দেশ দীর্ঘদিন ধরে এই আনন্দ উপভোগ করা থেকে নিজেদের বঞ্চিত করেছে যে, সর্বকালের অন্যতম সেরা দুই ফুটবলারের জন্ম একই মাটিতে।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পর সেই বিতর্কের অবসান ঘটেছে বলেই মনে হয়েছিল। লিও তার পিঠ থেকে দীর্ঘদিন ধরে বয়ে বেড়ানো সেই ভারী বোঝাটি নামিয়ে ফেলেন এবং ফুটবলবিশ্বের প্রায় সবার কাছ থেকে সর্বসম্মত স্বীকৃতি পান।
তবে ভাগ্য হয়তো এমনটাই চেয়েছিল আগামী ১৯ জুলাই (রবিবার) নিউজার্সিতে অনুষ্ঠেয় কাক্সিক্ষত ফাইনালের পথে মেসিদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ইংল্যান্ড। আর এর সঙ্গেই ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে ২২ জুনের সেই ঐতিহাসিক কীর্তিসহ ‘এল দিয়েগো’র স্মৃতি মনে পড়ে যাওয়াটা এখন অনিবার্য।
‘অবশ্যই আমি যা কিছু দেখেছি এবং মনে রেখেছি, তা ভিডিও ও ছবির মাধ্যমেÑ যা আমরা আর্জেন্টাইনরা প্রতিনিয়ত দেখি এবং বারবার সেই স্মৃতি রোমন্থন করি। তবে আমি বিশ্বাস করি, এই দলটির যেকোনো প্রতিপক্ষের বিপক্ষেই খেলার অভ্যাস আছে। অবশ্যই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলাটা বিশেষ কিছু, কারণ তারা একটি পরাশক্তি। ব্যক্তিগতভাবে, এবারই প্রথম আমি তাদের বিরুদ্ধে খেলতে যাচ্ছি। ইংল্যান্ড ছাড়া বাকি সব বড় দলের বিপক্ষেই আমার খেলা হয়েছে, তাই এই দিক থেকেও ম্যাচটি দারুণ হতে যাচ্ছে। আমরা এটিকে একটি বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল হিসেবেই দেখছি, যা একটি পরাশক্তি ও দুর্দান্ত দলের বিরুদ্ধে লড়াই। আমরা আমাদের সেরা প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামব যাতে আবারও ফাইনালে যাওয়ার লড়াই করতে পারি’Ñ কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ ব্যবধানে হারানোর পর বলছিলেন মেসি।
আলবিসেলেস্তে ও থ্রি লায়ন্সের মধ্যে সর্বশেষ ম্যাচটি হয়েছিল ২০০৫ সালের ১২ নভেম্বর। জার্মানি বিশ্বকাপ ২০০৬-এর প্রস্তুতি হিসেবে জেনেভায় একটি প্রীতি ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল দল দুটি। সেদিন আর্জেন্টিনার একাদশে ছিলেনÑ রবার্তো আবনদানসিয়েরি, হাভিয়ের জানেত্তি, মার্টিন ডেমিচেলিস, রবার্তো আয়ালা, ওয়াল্টার সামুয়েল, মাক্সি রদ্রিগেজ, এস্তেবান ক্যাম্বিয়াসো, পাবলো সোরিন, রোমান রিকেলমে, হার্নান ক্রেসপো এবং কার্লোস তেভেজ। ম্যাচে ক্রেসপো আর্জেন্টিনাকে লিড এনে দেন, পরে ওয়েন রুনি সমতা ফেরান। এরপর ওয়াল্টার সামুয়েল আর্জেন্টিনাকে আবারও এগিয়ে নিলেও শেষ মুহূর্তে মাইকেল ওয়েনের জোড়া গোলে ইংল্যান্ড জিতে যায় ম্যাচটি।
সেদিন ডাগআউটে কোচ হোসে পেকারম্যানের পাশে বসা ছিলেন তরুণ লিওনেল মেসি। প্রশ্ন জাগতে পারে স্কোয়াডে থেকে কেন খেলেননি মেসি সেদিন। কারণটা হলো, বুদাপেস্টে হাঙ্গেরির বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে আর্জেন্টিনার জার্সিতে নিজের অভিষেক ম্যাচে মাঠে নামার মাত্র ৪৩ সেকেন্ডের মাথায় লাল কার্ড দেখার কারণে এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা ছিল। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্টের সেই ম্যাচে মেসি লিসান্দ্রো লোপেজের বদলি হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন। লুকাস বার্নার্ডির কাছ থেকে বল পেয়ে নিজের স্বভাবসুলভ গতিতে বল পায়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই ভিলমোস ভানজাক তার জার্সি টেনে ধরেন। সেই টান থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার সহজাত চেষ্টায় মেসির ডান হাতটি পেছনে চলে যায়।
সেই স্মৃতি রোমন্থন করে মেসি বলেন, ‘খুব বেশি হলে ওটা একটা হলুদ কার্ড হতে পারত। আমি তাকে আঘাত করিনি। তখন আমার বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর। লাল কার্ড দেখার পর আমার প্রথম চিন্তা ছিলÑ আমি মাঠে নামলাম আর আমাকে বের করে দেওয়া হলো, আমি হয়তো আর কখনোই জাতীয় দলে ডাক পাব না। মাথায় একসঙ্গে অনেক কিছু ঘুরপাক খাচ্ছিল, দিনটা সত্যিই ভয়ানক ছিল।’
প্রীতি ম্যাচে লালকার্ড পাওয়ার নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছিল আরেকটি প্রীতি ম্যাচে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। মাঝে মেসি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচ খেলেছিলেন। তার প্রথম গোলটি সেই তিন ম্যাচের একটিতে। নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে মেসি উরুগুয়ে ও ব্রাজিলের বিপক্ষে বহু স্মরণীয় ম্যাচ খেলেছেন (যার মধ্যে মারাকানায় ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জয় অন্যতম)। এছাড়া জার্মানি ও স্পেনের বিরুদ্ধে লড়াই, ওয়েম্বলিতে ইতালির বিপক্ষে ফিনালিসিমা জয় এবং কাতার ২০২২-এর সেই অবিস্মরণীয় ফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়ে তৃতীয় বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি তো রয়েছেই।
সব তুলনা, ব্যক্তিগত পছন্দ আর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে দূরে সরিয়ে রাখলে জাদুকরী বাঁ-পায়ের এই নম্বর ১০-এর ক্যারিয়ারে কেবল ইংল্যান্ডই বাকি ছিল। তার জীবনের গল্পে এবার যুক্ত হতে যাচ্ছে এক আকর্ষণীয় অধ্যায়। এমন একটি ম্যাচ, যা নিঃসন্দেহে ফুটবল ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।