জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের পদোন্নতিতে নানা অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাবের কথা বহুল আলোচিত-সমালোচিত। সাধারণভাবে পদোন্নতির ড়্গেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে কর্মকর্তাদের ‘এসিআর’ বা বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন। এসিআরের ভিত্তিতে মেধা, সততা ও দায়িত্বপালনে নিষ্ঠার বিবেচনায় এগিয়ে থাকা কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুপারিশ করা হয়। কিন্তু এসিআরই যদি জালিয়াতির মাধ্যমে পাল্টে ফেলা হয়, তাহলে যোগ্যতা বিচারের মূল ভিত্তি বা মাপকাঠিটাই আর ঠিক থাকে না। সম্প্রতি এমন ভয়াবহ এসিআর জালিয়াতির নজির দেখা গেল শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি এসিআর জালিয়াতিতে জড়িতদের খুঁজে পায়নি। আরও দুঃখজনক এসিআর জালিয়াতির ঘটনা তদন্তে মন্ত্রণালয়ের গড়িমসি এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার খবর। একইসঙ্গে উদ্বেগের বিষয় জালিয়াতির ঘটনায় সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা।
বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরে ‘এসিআর বিকৃতকারীদের খুঁজে পায়নি তদন্তকারীরা’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বিশদভাবে উঠে আসে, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের এসিআর জালিয়াতির কথা। অধিদপ্তরের ৪৮ জন শ্রম পরিদর্শককে (সাধারণ) প্রথম শ্রেণির সহকারী মহাপরিদর্শক পদে পদোন্নতির দিতে গত ২৪ জুন পিএসসিতে একটি প্রস্তাব পাঠায় শ্রম মন্ত্রণালয়। নিয়ম অনুযায়ী প্রথম শ্রেণির পদে পদোন্নতির ড়্গেত্রে পিএসসির সুপারিশ নেওয়া বাধ্যতামূলক। এ প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করে পিএসসি দেখতে পায় ১৯ জনের এসিআরে অনুবেদনকারী কর্মকর্তার নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বাকিদের এসিআরেও ঘষামাজা রয়েছে। কার এসিআরে কী সমস্যা তা উল্লেখ করে পিএসসি গত ২৪ জুলাই সংশোধনের জন্য শ্রম মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠায়। এদিকে, পদোন্নতির তালিকা থেকে বঞ্চিত কর্মকর্তারা ঘটনার বিস্তারিত উল্লেখ করে গত ২৭ আগস্ট একটি বেনামি চিঠি দেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে। এক মাস পর তদন্ত কমিটি গঠন করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। কিন্তু অতিরিক্ত সময় নিয়েও এসিআর জালিয়াতিতে দোষীদের খুঁজে বের করতে পারেনি তদন্ত কমিটি।
ঘটনাক্রম পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, পদোন্নতির প্রস্তাব প্রায় এক মাস শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পড়ে ছিল। আবার মতামতের জন্য এসিআর পাঠানোর প্রায় এক মাস পর পিএসসি শ্রম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ঘষামাজার কথা জানান। তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রশ্ন এসিআরে ঘষামাজা হলে মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গেই পিএসসির কর্মকর্তারা কেন দেখলেন না? বিষয়টি ধরতে তাদের কেন এক মাস সময় লাগবে? এই এক মাসে পিএসসিতেই এসিআর ঘষামাজা হতে পারে বলেও তারা মনে করছেন। তদন্ত কমিটি শ্রম মন্ত্রণালয় ও কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকায় পিএসসির কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। তবে পিএসসির শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা তদন্ত কমিটিকে বলেছেন পিএসসি থেকেও এসিআর ঘষামাজা হয়ে থাকতে পারে।
এ অবস্থায় পিএসসির কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় আরও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করার সুপারিশ করতে পারে বলেও জানা গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এসিআরগুলো যে অধিশাখার তত্ত্বাবধানে ছিল সেই অধিশাখার যুগ্ম সচিবকে প্রধান করেই কেন তদন্ত কমিটি গঠন করা হলো? এতে সুষ্ঠু তদন্ত ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও (ঘুষ খেয়ে এসিআর ঘষামাজা, ২৬ সেপ্টেম্বর, দেশ রূপান্তর) তা আমলে নেওয়া হয়নি। এদিকে, এই অধিদপ্তরের ৩৪তম বিসিএসের নন-ক্যাডার কর্মকর্তারা পদোন্নতি নিয়ে অনিয়মের অভিযোগে আবেদন-নিবেদনে ব্যর্থ হয়ে এ বিষয়ে মামলাও করেছেন। ফলে এই বিবেচনাও জরুরি যে, পদোন্নতিপ্রত্যাশী কর্মকর্তাদের অভিযোগ কেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আমলে নেননি। কেন তাদের বেনামে উড়োচিঠি লিখে এ ঘটনায় তদন্ত দাবি করতে হলো এবং বিষয়টি সুরাহার দাবিতে আদালতে মামলা করতে হলো?
বিষয়টি এমনই স্পর্শকাতর যে, সচিবালয়ে যেসব কক্ষে ক্যাডার কর্মকর্তাদের এসিআর সংরক্ষণ করা হয়, সেখানে সার্বক্ষণিক পুলিশ পাহারা থাকে এবং দায়িত্বশীলরা ছাড়া সেখানে কেউ প্রবেশ করতে পারেন না। অধিদপ্তরের এসিআর কখন কোথায় কীভাবে জালিয়াতি করা হলো তা অবশ্যই খুঁজে বের করতে হবে। জানা গেছে, জালিয়াতি হওয়া এসিআরগুলোর কর্মকর্তারা আদতে পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম নম্বরও পাননি। অর্থাৎ নিশ্চিতভাবেই অযোগ্যদের অনৈতিক সুবিধা দিতে এই জালিয়াতি করা হয়। বিষয়টি এখন একদিকে তদন্তাধীন, অন্যদিকে আদালতে বিচারাধীন। এর সুরাহা না হলে কারও কপালেই পদোন্নতি জুটবে না। এ অবস্থায় অনেক যোগ্য কর্মকর্তা পদোন্নতি না নিয়েই চাকরি থেকে অবসরে যাবেন। এ ড়্গেত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উচিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে দোষীদের চিহ্নিত করা এবং ফৌজদারি আদালতে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা। রাষ্ট্রীয় কাজে মেধাবী ও যোগ্য কর্মকর্তাদের সেবা পেতে পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।