এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) নুরুল হক নুরের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন ছাত্রলীগের এক নেতা। এতে হত্যাচেষ্টা, মানিব্যাগ ও মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগ আনা হয়েছে নুরসহ ২৯ জনের বিরুদ্ধে। তারা সবাই বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতাকর্মী। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর শাহবাগ থানায় মামলাটি করেন ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সার্জেন্ট জহুরুল হক হল শাখার সাবেক সহসভাপতি ডি এম সাব্বির হোসাইন। শাহবাগ থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, ওই মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ১৫-২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এদিকে গতকাল দুপুর ১২টার দিকে ঢাবির মধুর ক্যান্টিনের সামনে থেকে অবিস্ফোরিত একটি ককটেল উদ্ধার করেছে পুলিশ। এতে ক্যাম্পাসে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া ভিপি নুরসহ ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৮ জন সুস্থ আছেন জানিয়ে তাদের ছাড়পত্র দেওয়া হবে বলে গতকাল দুপুরে জানিয়েছিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরে বিকেলে ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক এ কে এম নাসির উদ্দিন জানান, সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতাদের আপত্তির কারণে এ সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে।
গত রবিবার ডাকসু ভবনে নিজের কক্ষে হামলার শিকার হন ভিপি নুর ও তার সংগঠন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের একদল নেতাকর্মী। মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের একাংশ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ওই হামলা চালান বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য। এ ঘটনার পর দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রতিবাদ কর্মসূচিতে উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাবি ক্যাম্পাস।
এ ঘটনায় পরদিন রাতে শাহবাগ থানায় হত্যাচেষ্টার মামলা করেন নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ রইচ উদ্দিন। এতে ৮ জনের নাম উল্লেখের পাশাপাশি অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৩৫ জনকে আসামি করা হয়। এ মামলায় গ্রেপ্তার ‘মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের’ তিন নেতাকে ছয় দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। পরে ভিপি নুরের পক্ষে ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস ও সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসাইনসহ ৩৭ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন করেন ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক আকতার হোসেন। অভিযোগটি পুলিশের করা মামলার সঙ্গে যুক্ত করে আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে শাহবাগ থানার পুলিশ।
নুরের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ নেতার মামলা : বাদী সাব্বির মামলার অভিযোগে বলেছেন, ভিপি নুরসহ আসামিরা ২২ ডিসেম্বর দুপুর ১২টায় লাঠি ও দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করায় মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সভাপতি আমিনুল ইসলামসহ ৮ জন গুরুতর জখম হন। এ সময় তাদের মানিব্যাগ, মোবাইল ও হাতঘড়ি ছিনিয়ে নেন আসামিরা। হামলার সময় ১৫-২০ জন লাঠি ও দেশীয় ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করেন।
জানা গেছে, সাব্বির বর্তমানে ছাত্রলীগের কোনো পদে না থাকলেও সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়ের অনুসারী বলে পরিচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুক থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাব্বির ঢাবির লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র। তার ফেইসবুক প্রোফাইলে জয়ের সঙ্গে একাধিক ছবি রয়েছে। এ মামলার বিষয়ে জানতে একাধিকবার ফোন দিয়েও সাব্বিরের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে ফেইসবুক মেসেঞ্জারে টেক্সট পাঠানো হলেও কোনো জবাব দেননি তিনি।
এই মামলাকে ছাত্রলীগের ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক মুহাম্মদ রাশেদ খান। গতকাল ঢামেক হাসপাতালে সাংবাাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের ওপর হামলার ঘটনায় আমরা মামলা করতে গিয়েছিলাম, কিন্তু সেটি না নিয়ে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। এ বিষয়ে গতকালও (বুধবার) এক পুলিশ কর্মকর্তাকে আমাদের অভিযোগকে মামলা হিসেবে নেওয়ার অনুরোধ করেছি। তিনি বলেন, আমরা জানি কী ঘটেছিল। আমাদের ওপর পেছন থেকে প্রথমে অতর্কিত হামলা করে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ। এরপর সনজিত ও সাদ্দামের নেতৃত্বে হামলা করে ছাত্রলীগ। সিসিটিভির ফুটেজ উদ্ধার করলে সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।
এদিকে নুরদের ওপর হামলার ঘটনায় পুলিশের হত্যাচেষ্টার মামলা ও নুরের পক্ষে করা অভিযোগটির তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গত বুধবার রাতে শাহবাগ থানা থেকে এর তদন্তভার ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়।
মধুর ক্যান্টিনের সামনে থেকে ককটেল উদ্ধার : গতকাল দুপুর ১২টার দিকে ঢাবির মধুর ক্যান্টিনের সামনে থেকে অবিস্ফোরিত একটি ককটেল উদ্ধার করেছে পুলিশ। নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির এসআই রইস উদ্দিন বলেন, ককটেলটি পুরোপুরি বিস্ফোরিত হয়নি। বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট এসে ককটেলটি নিষ্ক্রিয় করে। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বেলা ১১টার দিকে মধুর ক্যান্টিনের পাশে কালো টেপ মোড়ানো একটি ককটেল থেকে ধোঁয়া উড়ছিল। পরে এর ওপর পানি ঢেলে দিয়ে প্রক্টর টিমকে খবর দেন শিক্ষার্থীরা। দুপুর ১২টার দিকে প্রক্টর টিম ও পুলিশ এসে অবিস্ফোরিত অবস্থায় ককটেলটি উদ্ধার করে।
এ ঘটনাকে ‘ষড়যন্ত্র’ অ্যাখা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এ কে এম গোলাম রব্বানী বলেছেন, ‘অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এসব করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন যা ঘটছে তার জন্য আমরা মর্মাহত। একই সঙ্গে যা ঘটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে এটি খুবই উদ্বেগজনক। শিক্ষার্থীদের ছুটির সময়। এখন তারা বাসা থেকে আসবে, এর মধ্যে এ ধরনের ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল করার অপ্রয়াস।’
হাসপাতাল ছাড়ছেন না নুর : ভিপি নুরসহ ডাকসুতে হামলায় আহতদের মধ্যে ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৮ জনের শারীরিক অবস্থা নিয়ে গতকাল দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করেন হাসপাতালের পরিচালক এ কে এম নাসির উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘সবাই স্টেবল আছেন। নুরুল হক তার কনুইয়ে সামান্য ব্যথা অনুভব করায় আমরা এক্স-রে করেছি। আজই তাকে ডিসচার্জ করা হবে। এ ছাড়া সোহেলকে এইচডিইউতে আনা হয়েছে, তার অবস্থা ভালো। ফারাবীকেও এইচডিইউতে রাখা হয়েছে। অনেক দর্শনার্থী আসছে, তাই একটু নীরব পরিবেশ প্রয়োজন। এ কারণে ফারাবীকে এইচডিইউতে রাখা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, এ ছাড়া কিডনিতে সামান্য সমস্যা থাকায় আমিনুলকে নেফ্রোলজি বিভাগে স্থানান্তর করা হয়েছে মেহেদী হাসানের ব্লাড প্রেশার সামান্য বেশি আছে, তবে তিনি ভালো আছেন। ফারুকের কানে সামান্য সমস্যা রয়েছে, তবে তিনিও সম্পূর্ণ ভালো আছেন, বৃহস্পতিবার তাকেও ছাড়পত্র দেওয়া হবে। আর নাজমুল ও আরিফ শঙ্কামুক্ত।
সংবাদ সম্মেলনের পর হাসপাতালের পরিচালকের সঙ্গে দেখা করে নুরদের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ জানান ছাত্র অধিকার পরিষদের নেতারা। পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তাদের হাসপাতাল থেকে না ছাড়ারও অনুরোধ জানান তারা। এর পরিপ্রেক্ষিতে নুরদের হাসপাতাল থেকে ছাড়া হচ্ছে না বলে বিকেলে সাংবাদিকদের জানান নাসির উদ্দিন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ চেয়েছে তদন্ত কমিটি : ভিপি নুর ও তার সঙ্গীদের ওপর হামলার ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে ঘটনার বিবরণ জানতে চেয়েছে। আগ্রহী ব্যক্তিদের নাম, ঠিকানা ও টেলিফোন নম্বর লিখিতভাবে আগামীকাল শনিবার দুপুর ২টার মধ্যে কলাভবনের ডিনের দপ্তরে সংরক্ষিত বাক্সে জমা দিতে বলা হয়েছে। গতকাল ঢাবির জনসংযোগ বিভাগ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়। তদন্তের স্বার্থে তথ্য প্রদানকারীর নাম-ঠিকানা গোপন রাখা হবেও বলে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়।
নুরের নিরাপত্তা চেয়ে আইনি নোটিস : ভিপি নুরের নিরাপত্তার যথাযথ ব্যবস্থা নিতে আইনি নোটিস পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী। গতকাল স্বরাষ্ট্র সচিব, ঢাবির ভিসি ও প্রক্টরের কাছে নোটিসটি পাঠানো হয়। সাত দিনের মধ্যে এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে নোটিসে উল্লেখ করেছেন আইনজীবী মনিরুজ্জামান লিংকন।
হামলাকারীদের শাস্তি দাবি : সন্ত্রাস-নৈরাজ্যমুক্ত নিরাপদ ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠা ও ভিপি নুরের ওপর হামলায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে ‘ছাত্র মিশন’। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত এক মানববন্ধনে সংগঠনের নেতারা বলেন, ডাকসুর ভিপি নুর ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের হামলা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে।