রেমিট্যান্সে সুবাতাস, দুর্দশা রপ্তানি রাজস্বে

তখনো অর্থমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেননি আ হ ম মুস্তফা কামাল। তবে তিনিসহ সবাই ততক্ষণে জেনে গেছেন তিনিই পরবর্তী অর্থমন্ত্রী। ৬ জানুয়ারি শপথ নেওয়ার আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী হিসেবে দেশবাসীকে বড় স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। বলেছিলেনÑ ‘অর্থ মন্ত্রণালয় এখন যেভাবে চলছে, সেভাবে আর চলবে না। নতুন পরিসরে অর্থ মন্ত্রণালয় যাত্রা শুরু করবে। সেখানে আপনারা অনেক নতুনত্ব দেখবেন। আমি ব্যর্থ হব না, মিথ্যা আশ্বাসও দেব না।’

তারপর দেখতে দেখতে এক বছর চলে যাচ্ছে। এই সময় একটি বাজেট দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তাতে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর ২ শতাংশ নগদ প্রণোদনা ঘোষণা করেছিলেন। তার সুফল মিলছে মাসকে মাস ধরে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ছে। এর বাইরে অর্থনীতির মূল সূচকগুলোতে নতুনত্বের কোনো লক্ষণ নেই। যে আশা নিয়ে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি সত্ত্বেও নতুন ভ্যাট আইন কার্যকরের ঝুঁকি নিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী, অর্থবছরের ছয় মাস পার হলেও বাড়তি রাজস্ব আয় করে তাতে কোনো চমক দেখাতে পারেননি তিনি। উল্টো আগের কয়েক বছরের চেয়ে রাজস্ব আয়ে প্রবৃদ্ধি কমতির দিকে। রাজস্ব কমার পাশাপাশি সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে কড়াকড়ির কারণে ব্যাংক থেকে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক বেশি ঋণ করতে হচ্ছে সরকারকে। বাজেটে প্রণোদনা বাড়ানোর পরও গত আগস্ট থেকেই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে রপ্তানি খাতে।

বেসরকারি বিনিয়োগে গতি না ফেরায় মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিও কমছে। ফলে কর্মসংস্থানও কাক্সিক্ষত মাত্রায় হচ্ছে না। বিভিন্ন সূচকে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি না থাকলেও মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) রেকর্ড সৃষ্টি করেছে বিদায়ী বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি। গেল অর্থবছর ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে জানিয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। যদিও সরকারের এ হিসাবের সঙ্গে একমত হতে রাজি নন দেশের অর্থনীতিবিদরা।

প্রতি বাজেটেই অর্থমন্ত্রীরা রাজস্ব আয়ে বড় স্বপ্ন দেখান। বড় অঙ্কের বাজেট করতে গিয়ে বিশাল অঙ্কের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন। বছর শেষে তা বাস্তবায়ন না হলেও সন্তোষজনক মাত্রায় প্রবৃদ্ধি ছিল আগের কয়েক বছরে। তবে গত অর্থবছর থেকে রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধিও কমতির দিকে। বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৯ দশমিক ২ শতাংশ। এটি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন তো বটেই, তাবৎ দুনিয়ায় কর-জিডিপির অনুপাতে তলানিতে থাকা দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। অথচ পাঁচ বছর আগেও এটি ছিল ৯ দশমিক ৯ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি আরও হতাশাজনক। এই সময়ে রাজস্ব আয় বেড়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ, যা আগের বছর একই সময়ে ছিল ৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

রাজস্ব আয় বাড়াতে নতুন অর্থবছর ভ্যাট আইন-২০১২ কার্যকর করা হয়েছে। তা প্রতিফলন নেই রাজস্ব আয়ে। বরং চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে ভ্যাট খাত থেকে আয়ের প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৭৯ শতাংশ।

নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর করার অংশ হিসেবে ২৫ ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্যে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) বসানোর কথা ছিল। তা এখনো সম্ভব হয়নি। গত ২৭ নভেম্বর এ বিষয়ে হতাশা প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ‘দুঃখজনক হলো আমরা এখনো মেশিনগুলো পাইনি।’ তবে এর দিনকয়েক পরেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া জানান, দুই লাখ ইএফডি মেশিনের মধ্যে ১০ হাজার চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। চলতি ডিসেম্বরের মধ্যেই সেগুলো বসানোর বিষয়ে আশা প্রকাশ করেছিলেন অর্থমন্ত্রী, তাও এখনো সম্ভব হয়নি।

রাজস্ব আয়ে কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি না হওয়ায় ব্যয় মেটাতে সরকারকে ব্যাংক খাত থেকে ঋণনির্ভর হতে হয়েছে। চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় পাঁচ মাসে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার ঋণ নিয়েছে ৪৩ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯২ শতাংশ। যেখানে পুরো বছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বেশি পরিমাণ ঋণ নেওয়ায় চাপ বাড়ছে বেসরকারি খাতের ওপর।

জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৪ দশমিক ৫০ শতাংশ। কিন্তু গত অক্টোবর শেষে তা অর্জন হয়েছে ১০ দশমিক ৫৮ শতাংশ, অর্থাৎ বেসরকারি খাতের ঋণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে সংশয় রয়েছে। বেসরকারি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার কারণ সম্পর্কে ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, বেশিরভাগ ব্যাংকেরই এখন টাকার সংকট রয়েছে।

অর্থ সচিব আবদুর রউফ তালুকদার এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন যে, সরকার বাজেটে অভ্যন্তরীণ খাত থেকে ঋণের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, ঋণসীমা তার মধ্যেই রয়েছে। সরকার আগে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে অনেক বেশি ঋণ নিত। ফলে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার দরকার হতো না। এবার সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। ফলে এ খাত থেকে সরকারের ঋণ কমে গেছে। তাই সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বেশি ঋণ নিয়েছে। 

জানা গেছে, টিআইএন বাধ্যতামূলক করায় সঞ্চয়পত্র থেকেও আগের মতো ঋণ পাচ্ছে না সরকার। যেমন গত বছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে সরকার ঋণ নিয়েছিল ১৭ হাজার ৮২৮ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে সরকার সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ঋণ পেয়েছে মাত্র ৫ হাজার ৫২১ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের চার মাসে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ কমেছে ৬৯ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।

সরকার ব্যাংক থেকে বাড়তি ঋণ নেওয়ার প্রভাব পড়ছে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহে। গত অক্টোবরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি গত ৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে পৌঁছেছে। এ সময় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি কমে নেমেছে ৩ দশমিক ১৬ শতাংশ। যদিও ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৪ দশমিক ৫০ শতাংশ। অক্টোবর শেষে অর্জন হয়েছে ১০ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

বিদায়ী বছরের প্রথম সাত মাস পণ্য রপ্তানির ইতিবাচক ধারা হঠাৎ করেই পতনমুখী হয়েছে। আগস্ট মাস থেকে ধারাবাহিকভাবে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে দেশের রপ্তানি আয়ে। তৈরি পোশাক, কৃষি প্রক্রিয়াজাত এবং চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যÑ এই তিন শীর্ষ পণ্যের রপ্তানি কমে যাওয়ায় সামগ্রিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাস, অর্থাৎ জুলাই থেকে নভেম্বরে ১ হাজার ৫৭৭ কোটি ৭০ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এই আয় গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৭ দশমিক ৫৯ শতাংশ কম।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) পণ্য রপ্তানি আয়ের এই হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী কেবল গত নভেম্বরে ৩০৫ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। গত বছরের নভেম্বরে রপ্তানি হয়েছিল ৩৪২ কোটি ডলারের পণ্য। সেই হিসাবে চলতি বছরের নভেম্বরে রপ্তানি কমেছে ১০ দশমিক ৭০ শতাংশ।

পণ্য রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৩ শতাংশ পোশাক খাত থেকে এসেছে। তবে পণ্য রপ্তানি আয়ের শীর্ষ খাতটির রপ্তানি দুই মাস ধরে কমছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে ১ হাজার ৩০৮ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এই আয় গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ কম। গত অর্থবছর প্রথম পাঁচ মাসে ১ হাজার ৪১৮ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছিল।

তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের বড় সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, আগামী দিনগুলোতে রপ্তানি আয় আরও কমতে পারে। রপ্তানি আয় কমার পেছনে চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধ, প্রতিযোগী দেশগুলোর মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও বিদেশি ক্রেতাদের দাম কমিয়ে দেওয়াকে দায়ী করেছেন তিনি।

বাজেটে রেমিট্যান্সে ২ শতাংশ নগদ প্রণোদনা ঘোষণার পর গত ৫ মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে উচ্চ প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। গত নভেম্বর মাসে ১৫৫ কোটি ৫২ লাখ (১.৫৫ বিলিয়ন) ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা, যা আগের বছরের নভেম্বরের চেয়ে ৩১ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেশি। আর চলতি অর্থবছরের পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) রেমিট্যান্স এসেছে ৭৭১ কোটি (৭.৭১ বিলিয়ন) ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ২২ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেশি।

বছরজুড়ে মূল্যস্ফীতি মোটামুটি স্থিতিশীল থাকলেও শেষদিকে পেঁয়াজের অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতি ও বুলবুলের প্রভাবে কয়েক দিন চালের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ে। এর প্রভাবে গত মাসে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ৬-এর ঘর অতিক্রম করে। এর মধ্যে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি পৌঁছে প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশে। অক্টোবর মাসে এটি ছিল সাড়ে ৫ শতাংশেরও কম।