জাপার কর্র্তৃত্বে কাদের, নামমাত্র প্রধান রওশন

সমঝোতার ভিত্তিতে আগামী তিন বছরের জন্য দলের নেতৃত্ব বেছে নিল জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা)। গতকাল শনিবার নামমাত্র কাউন্সিলে আগে থেকেই নির্ধারণ করা তিন শীর্ষ পদ চূড়ান্ত হয়। এতে জাপার প্রয়াত চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্ত্রী এবং সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদকে দলের ‘প্রধান পৃষ্ঠপোষক’ বা ‘চিফ পেট্রন’ করা হয়েছে। চেয়ারম্যান পদে বহাল রইলেন এরশাদের ছোট ভাই জি এম কাদের। পুনরায় মহাসচিব হয়েছেন মশিউর রহমান রাঙ্গা।

সংশোধিত গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হবেন পার্টির সর্বোচ্চ সম্মানিত ব্যক্তি। একই অনুষ্ঠানে প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও চেয়ারম্যান উপস্থিত থাকলে, শেষে

বক্তব্য রাখবেন প্রধান পৃষ্ঠপোষক। আর চেয়ারম্যান হবেন পার্টির নির্বাহী প্রধান। প্রধান পৃষ্ঠপোষকের সঙ্গে পরামর্শ করে পার্টি পরিচালনা করবেন চেয়ারম্যান। ফলে রওশনের পদটি মূলত আলঙ্কারিক। রওশনের মৃত্যুর পর এ পদ আপনাআপনি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। দলের মূল কর্র্তৃত্ব থাকছে জি এম কাদেরের হাতেই।

রওশন এরশাদ ও তার ছেলে রংপুর-৩ আসনের সদ্য নির্বাচিত সংসদ সদস্য রাহগির আল মাহী সাদ এরশাদ গতকালের কাউন্সিলে অংশ নেননি। রওশনপন্থি নেতারা আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, পদ নিয়ে দলের সিদ্ধান্ত পছন্দ না হলে রওশন কাউন্সিলে অংশ নেবেন না। নেতাদের এমন ইঙ্গিতই সত্য হলো। ফলে সমঝোতার ভিত্তিতে নেতৃত্বে আসা জাপার নতুন কমিটি শীর্ষ পদ নিয়ে দেবর-ভাবির মধ্যকার বিরোধ নিরসনে ঠিক কতটুকু কাজে লাগল, তা নিয়ে সংশয় রয়েই গেল।

রওশন না এলেও গতকালের কাউন্সিলে রওশনপন্থি অনেক নেতাকেই বেশ উৎসাহ নিয়ে কাউন্সিলে অংশ নিতে দেখা গেছে। এতদিন যে সব নেতা রওশনের পক্ষ নিয়ে দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের ও কাদেরপন্থি নেতাদের ঘোর বিরোধিতা করে আসছিলেন, গতকাল মূল মঞ্চে তাদের অনেককেই দেখা গেছে।  এদের মধ্যে সভাপতিমণ্ডলীর  সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদ মঞ্চে বসেন জি এম কাদেরের ডানের আসনটিতে। বহিষ্কৃত মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার বসেন বর্তমান মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গার বাম পাশের আসনে। রওশনপন্থি নেতাদের মধ্যে সভাপতিম-লীর সদস্য মুজিবুল হক চুন্নু ও ফখরুল ইমামও মূল মঞ্চে ছিলেন। কাউন্সিলের মূল মঞ্চ বা সম্মেলনের ব্যানারগুলোতেও রওশনের ছবি ঠাঁই পায়নি। ব্যানার ফেস্টুনে এরশাদের ছবির পাশাপাশি শোভা পায় ভাই জি এম কাদেরের ছবি।

এছাড়াও মঞ্চে বসেন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ, সালমা ইসলাম, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, নাজমা আখতার, নাসরিন জাহান রতœা, সাহিদুর রহমান টেপা, সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন, লিয়াকত হোসেন খোকা, খালেদ আখতার, ফয়সল চিশতী, মীর আব্দুস সবুর আসুদ।

দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শারীরিক অসুস্থতার কারণে রওশন কাউন্সিলে আসতে পারেননি। তবে দলের শীর্ষ নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, রওশন এরশাদ নিজে চেয়ারম্যান হতে চেয়েছিলেন এবং সৌদি রাষ্ট্রদূত ও দলের সভাপতিম-লীর সদস্য গোলাম মসিহকে মহাসচিব করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু দল তা মেনে নেয়নি। মূলত এ দুই কারণেই তিনি ও তার ছেলে কাউন্সিলে আসেননি। এমনকি তিনি একটি বাণী পর্যন্ত পাঠাননি। তার মানে বর্তমান কমিটি তিনি মেনে নিতে পারেননি। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সভাপতিম-লীর সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, কাউন্সিলের আগে রওশন এরশাদ দলের কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে ফোন করেছিলেন তার সঙ্গে বসতে। কিন্তু তারা তার ডাকে সাড়া দেননি। এই নেতা আরও বলেন, আমরা রওশন এরশাদকে সর্বোচ্চ সম্মান করি। মায়ের মতো দেখি। দলের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি এখন শারীরিকভাবে সক্ষম না। এ জন্য তাকে বিরোধীদলীয় নেতা করা হয়েছে। যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও তার ছেলেকে রংপুরে সংসদ সদস্য করা হয়েছে। তারপরও তিনি যদি না বোঝেন আমাদের কিছু করার নেই। এসবের কারণে রওশন এরশাদ দিনে দিনে একা হয়ে যাচ্ছেন। তাকে সমর্থন জানিয়ে আসা নেতারাও এখন দলের মূল নেতৃত্বের সঙ্গে। ফলে রওশন এরশাদ মূলত একা হয়ে গেলেন। 

আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেন, আমরা দলের জন্য একজন কর্মঠ ও ভালো নেতা চেয়েছিলাম। এরশাদের মৃত্যুর পর জি এম কাদের সে অভাব পূরণ করেছেন। এরশাদের মৃত্যুর পর তিনি দলের জন্য যে পরিশ্রম করেছেন, যেভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাতে দল এখন বেশ চাঙ্গা। সুতরাং দলে এই মুহূর্তে জি এম কাদেরের বিকল্প নেই।

রওশন এরশাদের কাউন্সিলে না আসার ব্যাপারে দলের সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, তার (রওশন এরশাদ) না আসায় প্রশ্ন থেকেই যায়। আমরা সবাই চাই উনি আসুক। ওনার দোয়া দরকার। সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবেই দল চালাতে হবে।

এ ব্যাপারে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য আলমগীর সিকদার লোটন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা তাকে (রওশন এরশাদ) সম্মান করি। উনি আমাদের কাছে মায়ের মতো। তিনি এলেন না। তার ছেলেও এলেন না। এমনকি একটা বাণী পর্যন্ত দিলেন না। ম্যাডামকে বাস্তবতা বুঝতে হবে। তিনি শারীরিকভাব এখন আর দল চালানোর মতো সক্ষম না। সম্মান দিয়েই তাকে প্রধান পৃষ্ঠপোষক করা হয়েছে। তিনি বিরোধীদলীয় নেতাও। এগুলো তাকে বুঝতে হবে। দল এখন এক ও অভিন্ন। সবাই চলে এসেছে।

গতকাল রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিউশন প্রাঙ্গণে সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীতের সঙ্গে জাতীয় ও দলীয় পতাকা তোলার পর শান্তির প্রতীক কবুতর ও বেলুন উড়িয়ে সম্মেলন উদ্বোধন করেন জি এম কাদের। এটি ছিল দলের নবম জাতীয় সম্মেলন। দলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এরশাদের মৃত্যুর পর এটাই ছিল দলের প্রথম সম্মেলন।

জাপার প্রতি আওয়ামী লীগের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ: আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে জাতীয় পার্টির সম্মেলনে যোগ দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। এ সময় তিনি বলেন, পল্লীবন্ধু বলে খ্যাত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে স্মরণ করছি। একই বৃন্তে দুটি ফুল জাতীয় পার্টি ও এরশাদ। জাতীয় পার্টির অনেক কর্মী ভক্ত সারা  দেশে ছড়িয়ে রয়েছেন, যারা এরশাদের নামে অন্ধ।

ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, জাপার সঙ্গে আমাদের ন্যাচারাল অ্যালায়েন্স ৯৬ থেকে, সেদিন জাপার সমর্থনে সরকার গঠিত হয়েছিল। এরশাদ জেলে বসেও আমাদের সমর্থন দিয়েছিলেন আমি জাতীয় পার্টির কাছে কৃতজ্ঞ। জাপা এখন পর্যন্ত যথাযথভাবে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছে, অগ্নিসংযোগ করেনি। তারা ভালো কাজের প্রশংসা করতে কুণ্ঠাবোধ করে না। আমার নেত্রীর পক্ষ থেকে জাপাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।

দলের ভাঙন ঠেকাতে সক্রিয় থাকার অনুরোধ কাদেরের :  দলে আর যেন ভাঙন না আসে সেজন্য নেতাকর্মীদের সক্রিয় থাকার অনুরোধ জানিয়ে জি এম কাদের কাউন্সিলে বলেন, এ দলের মালিকানা আপনাদের। একে রক্ষণাবেক্ষণে-প্রতিপালন করার দায়িত্ব আপনাদের। দলের ভালো হলে আপনাদের ভালো, দলের ক্ষতি হলে আপনাদের ক্ষতি, এ কথাটি অন্তরে ধারণ করবেন। যখন যে অবস্থায় থাকবেন দলের কথা বলবেন। সবসময় দলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবেন।

সম্মেলনে ফের ক্ষমতায় আসার পথ সুগম করতে জাতীয় পার্টির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান জি এম কাদের। তিনি বলেন, আজ আপনারা নতুন এক দীক্ষায় দীক্ষিত হলেন। সেই দীক্ষা হলো, দেশ ও জাতিকে মুক্তি দেওয়ার দীক্ষা। ক্ষুধা-দারিদ্র্য থেকে মুক্তি, অন্যায়, অবিচার, বৈষম্য থেকে মুক্তি, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ থেকে মুক্তি।

গঠনতন্ত্রে যে সব সংশোধনী এলো : সম্মেলনের কাউন্সিল অধিবেশনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শেখ সিরাজুল ইসলাম প্রধান পৃষ্ঠপোষক পদে রওশন এরশাদ এবং চেয়ারম্যান পদে জি এম কাদেরের নাম ঘোষণা করেন। কাউন্সিলর ও প্রতিনিধিরা সমস্বরে তাতে সমর্থন দেন। দুই পদে তাদের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না বলে কণ্ঠ ভোটেই প্রস্তাবটি পাস হয়ে যায়। পরে পার্টির গঠনতন্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী দলের ‘সর্বময় ক্ষমতার মালিক’ চেয়ারম্যান জি এম কাদের মহাসচিব পদে মসিউর রহমান রাঙ্গার নাম ঘোষণা দেন।

শেখ সিরাজুল ইসলাম জানান, গঠনতন্ত্রে সংশোধনী এনে জাতীয় পার্টিতে প্রধান পৃষ্ঠপোষকের পদ ছাড়াও অতিরিক্ত মহাসচিবের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। দেশের আটটি বিভাগে আটজন অতিরিক্ত মহাসচিব নির্বাচিত হবেন। এছাড়াও কো-চেয়ারম্যান পদে আসছেন আরও ৫ নেতা। অতিরিক্ত মহাসচিব ও কো-চেয়ারম্যান পদে কারা থাকছেন, তা পরে চেয়ারম্যান ঘোষণা দেবেন।

কাউন্সিলে পার্টির গঠনতন্ত্র সংশোধন কমিটির আহ্বায়ক সুনীল শুভ রায় জানান, এখন থেকে অন্য কোনো রাজনৈতিক দল থেকে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিতে হলে আগে সেই সদস্য বা নেতাকে সেই দল থেকে পদত্যাগ করতে হবে। পদত্যাগপত্রের নমুনাও দেখাতে হবে দপ্তর বিভাগে।

বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশে যদি জাতীয় পার্টি যাত্রা করে, তবে তারা পাবে উপজেলা কমিটির মর্যাদা। সেই দেশে অন্তত পাঁচটি কমিটি সক্রিয় রয়েছে, এমন প্রমাণ দেখালে মিলবে জেলা কমিটির মর্যাদা। এছাড়াও জাতীয় তরুণ পার্টি, মোটরযান শ্রমিক পার্টি, জাতীয় শ্রমিক পার্টিকে জাতীয় পার্টির অঙ্গ সংগঠনের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।