ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র পদে তাবিথ আউয়াল এবং দক্ষিণের (ডিএসসিসি) মেয়র পদে প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ
সম্মেলনে এই দুই প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাবিথ আউয়াল বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টুর ছোট ছেলে, যিনি গত নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। আর অবিভক্ত ঢাকার মেয়র প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকার বড় ছেলে ইশরাক হোসেন এবারই প্রথম এই নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন।
ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচন সমন্বয় করার জন্য বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহানকে সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আর দক্ষিণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টাম-লীর সদস্য আবদুস সালামকে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর পদের প্রার্থীদের গুলশান কার্যালয়ে সাক্ষাৎকার নেওয়া শুরু হবে আজ রবিবার সকাল ৯টা থেকে। একই সময় দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর পদের প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া শুরু হবে নয়াপল্টনে ঢাকা মহানগর বিএনপি কার্যালয় ভাসানী ভবনে।
গতকাল সন্ধ্যায় গুলশান কার্যালয়ে দুই সিটির আগ্রহী তিন মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল, ড. আসাদুজ্জামান রিপন ও ইশরাক হোসেনের সাক্ষাৎকার নেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। এ সময় স্কাইপের মাধ্যমে লন্ডন থেকে সাক্ষাৎকারে অংশ নেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
‘সমস্যাগুলো চিহ্নিত, নির্বাচিত হলে সমাধান’ : দলের চূড়ান্ত মনোনয়ন পাওয়ার পর তাবিথ আউয়াল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঢাকার প্রধান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। মেয়র নির্বাচিত হলে সমস্যাগুলোর সমাধানে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হবে। ঢাকাবাসীকে যানজটের করুণ দশা থেকে মুক্ত করা, মশক নিধন, মাদকমুক্ত ঢাকা উপহার দেওয়া, হকারদের পুনর্বাসন করা, স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠের ব্যবস্থা করা হবে। যেগুলো সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত সেগুলো সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
‘দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোব’ : দলের চূড়ান্ত মনোনয়ন পাওয়ার পর ইশরাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার বাবা অবিভক্ত ঢাকার মেয়র ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই দেখেছি মেয়র হিসেবে বাবা কীভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সে অভিজ্ঞতার আলোকে আমি কাজ করতে চাই। আমি ইঞ্জিনিয়ার। প্রফেশনাল ব্যক্তি হিসেবে দক্ষভাবে মেয়র হিসেবে কাজ করতে পারব। তাছাড়া পুরান ঢাকার একজন সন্তান হিসেবে আমি জানি পুরান ঢাকার কোথায় কী আছে। কোথায় কী লাগবে। মানুষের প্রত্যাশা কী। জনগণের প্রত্যাশাকে সম্মান জানিয়ে কাজ করব। দুর্নীতিবাজদের কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না।’
গত ২৬ ডিসেম্বর ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপির আগ্রহী প্রার্থীদের মধ্যে মনোনয়নপত্র বিতরণ করা হয়। এদিন ঢাকা উত্তরের জন্য দলের বিশেষ সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন এবং নির্বাহী সদস্য তাবিথ আউয়াল দলীয় মনোনয়ন ফরম কেনেন। দক্ষিণের জন্য একাই দলীয় ফরম কেনেন বিএনপির পররাষ্ট্রবিষয়ক শাখার সদস্য ইশরাক হোসেন। ফলে দক্ষিণের জন্য ইশরাক হোসেন আগে থেকেই চূড়ান্ত হয়েছিলেন। বাকি ছিল আনুষ্ঠানিকভাবে নাম ঘোষণা করা। আর উত্তরের আগ্রহী দুই প্রার্থীর মধ্যে তাবিথ আউয়ালই এগিয়ে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাকেই দলীয় মনোনয়ন দেয় বিএনপি।
যে কারণে তাবিথ ও ইশরাক : বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য দেশ রূপান্তরকে তাবিথ ও ইশরাককে মনোনয়ন দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেন। বলেন, বিভক্ত ঢাকার প্রথম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ২০১৫ সালে প্রার্থী হয়েছিলেন তাবিথ আউয়াল। কিন্তু ভোটগ্রহণের দিন বেলা ১১টায় দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে তাকে ভোট বর্জন করতে হয়। তারপরও ৩ লাখ ২৫ হাজার ৮০ ভোট পান তাবিথ আউয়াল। নির্বাচনের পর বিভিন্ন ধরনের সামাজিক, রাজনৈতিক, মানবিক কর্মকা-ে তাবিথ আউয়ালকে বিএনপির একজন হিসেবে সামনের সারিতে দেখা গেছে। তাই উত্তরে তাবিথকেই মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তারা আরও বলেন, গত নির্বাচনে অবিভক্ত ঢাকার সাবেক মেয়র ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও তিনি এবার নির্বাচনে আগ্রহ দেখাননি। দলও চাইছিল উত্তরের মতো দক্ষিণেও তরুণ কোনো নেতাকে দলীয় মনোনয়ন দিতে। সে হিসেবে ঢাকার সাবেক মেয়র প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকার ছেলে প্রকৌশলী ইশরাক হোসেনকেই বেছে নিয়েছে বিএনপি। খোকার জনপ্রিয়তা, তার শবযাত্রায় মানুষের ঢল, তার স্মৃতির প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার দিক বিবেচনা করে তার উত্তরসূরি ইশরাক হোসেনকেই প্রার্থী করার ব্যাপারে একমত হয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্যরা।
‘গণতন্ত্রচর্চার ন্যূনতম সুযোগ কাজে লাগাতে নির্বাচনে বিএনপি’ : দলীয় প্রার্থীদের নাম ঘোষণার সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আপনারা জানেন এই সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন কিছুতেই সম্ভব নয়। তারপরও গণতন্ত্রচর্চার ন্যূনতম সুযোগটা আমরা গ্রহণ করতে চাই। সে কারণে ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমরা অংশ নিচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘দুই সিটিতে আমাদের তিনজন আগ্রহী প্রার্থী ছিলেন। এই তিনজনের সঙ্গে কথা বলে আমরা দুইজনকে চূড়ান্তভাবে দলীয় মনোনয়ন দিয়েছি। এদের মধ্যে তাবিথ আউয়াল আগের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। এবারও তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। আর দক্ষিণে আমাদের প্রার্থী হবেন ইশরাক হোসেন। বিএনপির প্রয়াত ভাইস চেয়ারম্যান অখ- ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকার সন্তান ইশরাক হোসেন তার মেধা, যোগ্যতা, কমিটমেন্ট দিয়ে দলীয় মনোনয়নের জন্য বিবেচিত হয়েছেন।’
কাউন্সিলর প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার : আজ রবিবার বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সকাল ৯টা থেকে ঢাকা মহানগর উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ১ থেকে ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে মনোনয়নপ্রত্যাশী প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া শুরু হবে। একই দিন সকালে নয়াপল্টনে ঢাকা মহানগর বিএনপি কার্যালয় ভাসানী ভবনে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের কাউন্সিলর প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া শুরু হবে। সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলরদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে পরে।