শিল্পে সিঙ্গেল ডিজিটে সুদের হার

আশায় বুক বাঁধছেন শিল্পোদ্যোক্তারা

সিঙ্গেল ডিজিটে শিল্পায়নের ঘোষণায় আশায় বুক বাঁধছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। তারা বলছেন, মূলধনের অভাবে অনেক শিল্পোদ্যোক্তা বেকায়দায় আছেন। আবার অনেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে হিমশিম খাচ্ছেন। একই সঙ্গে রপ্তানিমুখী শিল্পেও কোনোভাবে নিজেদের টিকিয়ে রেখেছেন। এই অবস্থায় শিল্পে সিঙ্গেল ডিজিট ঋণ দিতে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের ঘোষণা শিল্পায়নে নতুন গতি আনবে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ড সভায় এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিগগিরই সার্কুলার জারি হবে। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুধু ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেই চলবে না। সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে শক্ত মনিটরিং করতে হবে। যদিও অর্থনীতিবিদরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, বাস্তবসম্মত নয় বলে এটা ঘোষণাতেই সীমিত থাকবে।

এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ব্যবসায়ীরা উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে বেকায়দায় আছেন। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগে ব্যাংকগুলো সিঙ্গেল ডিজিটে ঋণ দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু এতদিনেও সেটা বাস্তবায়ন হয়নি। এজন্য আমাদের পক্ষ থেকে জোর দাবি ছিল সুদহার কমিয়ে আনা। তিনি বলেন, এর আগেও সরকার বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েছিল, কিন্তু ব্যাংকগুলো মানেনি। এবার একটি কাঠামোর মধ্যে এনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৯ শতাংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে। এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের কড়া নজরদারি থাকলে আশা করছি ব্যাংকগুলো এটা বাস্তবায়ন করবে। শিল্প মালিকরাও আশায় বুক বাঁধছেন।

তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা বিষয়টিকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখছি, সরকারকে সাধুবাদ জানাচ্ছি। এটা আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। তিনি বলেন, রপ্তানিমুখী শিল্প অত্যন্ত নাজুক দিন পার করছে, আর এ খাতের উদ্যোক্তাদের অবস্থা আরও বেগতিক। শিল্পোদ্যোক্তারা পুঁজির অভাবে বড্ড বেকায়দায় আছেন। উচ্চসুদে ব্যাংকঋণ নিয়ে কোনোভাবেই টিকে থাকা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, তবে ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, ব্যাংকগুলো যেন এটি বাস্তবায়ন করে, তার জন্য জোর মনিটরিং করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে এ বিষয়ে কঠোর হতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নিট ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সহ-সভাপতি ও বর্তমান পরিচালক ফজলে শামীম এহসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সিঙ্গেল জিডিটে ঋণের ঘোষণা পূর্বের অভিজ্ঞতা আমাদের ভালো নয়। ব্যাংকগুলো অহেতুক কিছু শর্ত দেয়। নানা রকম জটিলতা তৈরি করে, ফলে ঋণ পাওয়া যায় না। তবে এবার আমরা বেশ আশাবাদী। সরকার অবশ্যই পদক্ষেপ নেবে, যেন প্রকৃত শিল্পোদ্যোক্তারা ঋণ পান। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্প অগ্রাধিকার পায়।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সম্প্রতি জানানো হয়েছে নতুন বছর থেকে নতুন-পুরনো সব ক্ষেত্রেই উৎপাদনশীল শিল্পঋণের সুদহার এক অঙ্কে অর্থাৎ ৯ শতাংশ কার্যকর করা হবে। পুরনো কেউ এ খাতে ১২ শতাংশে ঋণ নিলে আগামী ১ জানুয়ারি থেকে সেই ঋণও ৯ শতাংশে চলে আসবে। তবে ৯ শতাংশ কার্যকর হওয়ার পর কেউ যদি আবার ঋণখেলাপি হন, তাহলে ওই ক্ষেত্রে সুদহার আরো ২ শতাংশ  বেড়ে যাবে। অর্থাৎ ঋণখেলাপির জন্য তখন ঋণের সুদহার হবে ১১ শতাংশ। গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে এক অঙ্কের সুদহার কার্যকর করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর ফলে আগামী ১ জানুয়ারি  থেকেই সব উৎপাদনশীল শিল্প খাতের মেয়াদি ও চলতি মূলধন নতুন ও পুরনো ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ কার্যকর করতে হবে।

এর আগেই এ বিষয়টি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এজন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান-এমডিদের সঙ্গে তিনি একাধিক বৈঠক করেন। এরপর আপাতত শিল্পে সিঙ্গেল ডিজিটে ঋণ দেওয়া হবে বলে তিনি জানান। তার এই ঘোষণার কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংক এই সিদ্ধান্ত নেয়।

তবে অর্থমন্ত্রীর এই উদ্যোগ বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, চাপিয়ে দিয়ে সুদের হার কমবে বলে আমার মনে হয় না। সরকারি ব্যাংকগুলো কমালেও বেসরকারি ব্যাংকগুলো কমাতে পারবে বলে মনে হয় না। কেননা  বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয় অনেক বেশি। এখন ব্যাংকগুলোকে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির জন্যই অনেক অর্থ ব্যয় করতে হয়। এরপর কম সুদে ঋণ নিলে তার আয় অনেক কমে যাবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে গেলে ৪ শতাংশ সুদে আমানত সংরক্ষণ করতে হবে। কিন্তু মূল্যস্ফীতি রয়েছে ৫ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ ৪ শতাংশে আমানত রেখে গ্রাহক কোনো মুনাফা পাবেন না, বরং মূল্যস্ফীতির বিবেচনায় তার মূলধন হারাবে। এ কারণে ব্যাংকে কেউ আমানত রাখবে না। তিনি বলেন, এমনিতেই ব্যাংকে আমানত সংকট, এর ওপর সুদহার কমে গেলে ব্যাংকগুলো আরও আমানত হারাবে। ফলে তারা ঋণ দিতে চাইবে না।