নতুন বছর শুরু হতে যাচ্ছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের মধ্য দিয়ে। সেটি ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন। ২০২০ সালের ৩০ জানুয়ারি ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট গ্রহণের তারিখ ঠিক করেছে নির্বাচন কমিশন। এই নির্বাচনে সব কেন্দ্রেই ভোটগ্রহণ করা হবে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম-এ। সর্বশেষ ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নির্বাচন হয়েছিল। সেবার মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন ঢাকা দক্ষিণে সাঈদ খোকন ও ঢাকা উত্তরে আনিসুল হক। তবে উত্তরের মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুর পর চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তরে উপনির্বাচনে মেয়র হন আতিকুল ইসলাম। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয় রাজধানীর এ দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে। তাই আগামী বছর রাজনৈতিক মাঠের গতিপ্রকৃতি কেমন হবে তার প্রাথমিক পাঠ হয়তো এই নির্বাচন থেকেই পাওয়া যাবে।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সরাসরি ভোটের মাঠেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের মোকাবিলা করতে চাইছে আওয়ামী লীগ সরকার। হয়তো এ কারণেই, চলতি মাসের ২০-২১ তারিখে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় কাউন্সিলের পরদিনই ঢাকা সিটি করপোরেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, ক্ষমতাসীন দলের ছুড়ে দেওয়া নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে বিরোধী দলগুলোও নির্বাচনমুখী হচ্ছে। তাই সবকিছু ঠিক থাকলে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক বছর পর ফের মুখোমুখি হচ্ছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও এর জোটসঙ্গীসহ বামপন্থি দলগুলোও বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটারের উপস্থিতিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও, সম্ভবত রাজনীতির মাঠে টিকে থাকার জন্য মর্যাদার লড়াই হিসেবেই সিটি নির্বাচনে থাকছে তারাও। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে বলা যেতে পারে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ভোটের লড়াই জমে উঠলে তা হয়তো দেশের রাজনীতিতে চলমান অচলাবস্থার নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
রাজনীতির মাঠে তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতির সব পর্যায়েই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা সব সময়ই কাম্য। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার বাইরে থেকে ভেঙে পড়া সংগঠন গুছিয়ে বিএনপি ও তাদের জোট সঙ্গীরা ঢাকা সিটি নির্বাচনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে কতটা রাজনীতিতে ফিরে আসতে পারবে তা অবশ্যই দেখার বিষয়। একইসঙ্গে প্রচার-প্রচারণা থেকে শুরু করে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলগুলোর প্রার্থীরা কতটা সমান সুযোগ পাবেন বিশ্লেষকরা অবশ্যই সেসব বিষয়েও নজর রাখবেন। ফলে নির্বাচনের মাঠে বহুল আলোচিত ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’-এর প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী বাছাই ও মনোনয়নের বিষয়টিও রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বলা যেতে পারে, উত্তরের মেয়রকেই নির্বাচনে প্রার্থী করে এবং দক্ষিণে নতুন প্রার্থী দিয়ে আওয়ামী লীগ বেশ কৌশলগত অবস্থান নিল। তবে, উত্তর-দক্ষিণ দুই সিটিতেই কাউন্সিলর পদে মনোনয়ন নিয়ে সংগত কারণেই নানা প্রশ্ন সামনে চলে আসছে। বিশেষত, আওয়ামী লীগে বহুল আলোচিত ‘শুদ্ধি অভিযান’ থেকে রাজনীতিতে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নতুন নেতৃত্বের সামনে আসার যে আশা সঞ্চার হয়েছিল এবারের মনোনয়নে তা কতটা অনুসৃত হয়েছে সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সোমবার দেশ রূপান্তরে ‘আ.লীগের আশ্রয়ে ১২ বিতর্কিত’ শিরোনামের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আসন্ন ঢাকা সিটি নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে বিতর্কিত নেতাদের মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়টি। ক্যাসিনোকা-, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, মাদক কারবার, খাসজমি ও ব্যক্তিমালিকানার জমি দখল, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলেও পুনরায় দল থেকে সমর্থন বাগিয়ে নিয়েছেন এমন অন্তত ১২ জন কাউন্সিলর। যাদের বিরুদ্ধে সরকারের দায়িত্বশীল সংস্থা থেকে অনুসন্ধান চলছে এবং যাদের ব্যাংক হিসাব তলব বা জব্দ করা হয়েছে। এই কাউন্সিলরদের অনেকেরই বিদেশ যাত্রায়ও রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। এমন বিতর্কিতদের দলীয় সমর্থন দেওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন অনেকেই। প্রশ্ন উঠছে যে, বিতর্কিতদের মনোনয়ন দিয়ে আওয়ামী লীগ আসলে কী বার্তা দিচ্ছে? তৃণমূল থেকে নেতৃত্ব বিকাশের ক্ষেত্রে দলীয় নেতাকর্মীদের আস্থা অর্জনের প্রক্রিয়াটি যথাযথভাবে চালু থাকা জরুরি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার রীতি চালুর পর অনেকেই আশা করেছিলেন, এখন থেকে স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় এবং দলের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের আস্থাভাজনরাই মনোনয়ন পাবেন এবং এভাবে ধীরে ধীরে সামনে উঠে আসবেন তৃণমূলের নেতারা। কিন্তু বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছে না। সব দলের মধ্যেই তৃণমূল থেকে ওপর পর্যন্ত নেতা তৈরির গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালু থাকাটা প্রয়োজন। তথাপি, দেশবাসীর আশা থাকবে, প্রচার থেকে শুরু করে ভোটের প্রক্রিয়ায় সুষ্ঠুভাবে ঢাকা সিটি নির্বাচন সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে নতুন বছরে দেশের রাজনীতিতেও সুবাতাস বইবে।