এক অঙ্কের সুদহার কার্যকর করতে গিয়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে আমানত বাড়াতে সুযোগ দিচ্ছে সরকার। আমানতের সর্বোচ্চ সুদহার ৬ শতাংশ বেঁধে দেওয়া হলেও কোনো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ওই হারে আমানত সংগ্রহ করতে পারবে না। সরকারি ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৫ শতাংশ সুদে আমানত নিতে পারবে। তবে বেসরকারি ব্যাংকগুলো ৬ শতাংশ সুদে আমানত নিতে পারবে। সরকারি ব্যাংক রেখে সঞ্চয়কারীরা যাতে বেসরকারি ব্যাংকে টাকা রাখেন, সেজন্য এ ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।
গতকাল বুধবার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয় ও অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, ক্রেডিট কার্ড বাদে সব ধরনের ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশ ও আমানতে ৬ শতাংশ সুদ বাস্তবায়নে এবার সরকার কঠোর হয়েছে। এতদিন ব্যাংকগুলোর ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। আগামী এপ্রিল মাস থেকেই এটি কার্যকর হবে। এ সময় পুঁজিবাজারে চলমান অস্থিরতা নিয়েও কথা বলেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘যদি সরকারি ও বেসরকারি উভয় ব্যাংকে আমানতের ক্ষেত্রে সুদহার ৬ শতাংশ করে দেওয়া হয়, তাহলে সবাই সরকারি ব্যাংকে টাকা রাখবে। তাই সরকারি ব্যাংকে ডিপোজিটের সুদহার হবে সাড়ে ৫ শতাংশ এবং বেসরকারি ব্যাংকে ডিপোজিটের ক্ষেত্রে সুদহার হবে ৬ শতাংশ। যদি দুই জায়গায় ৬ শতাংশ করি, তাহলে বিভিন্ন কারণে সবাই চলে যাবে সরকারি ব্যাংকে। এজন্য আমরা এ ক্ষেত্রে আধা পার্সেন্ট গ্যাপ রাখছি।’
আমানতের সুদহার সম্পর্কে তিনি বলেন, আমানতের জন্য কোনো ব্যাংকই কাউকে ৬ শতাংশ সুদের বেশি অফার করতে পারবে না। সিঙ্গাপুর কিংবা মালয়েশিয়ায় ব্যাংকে টাকা রাখলে যিনি টাকা রাখেন তাকেই ব্যাংকে টাকা দিতে হয়। আমাদের মতো দুয়েকটি দেশে ব্যাংকে টাকা রাখলে ২-৩ শতাংশ সুদ পাওয়া যায়। যেকোনো কারণেই হোক, আমাদের আমানতে বেশি সুদ দেওয়া হয়। এটা আর সইতে পারছি না। সে কারণে কঠিন সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।
ঘোষণা দিয়ে ১ জানুয়ারি থেকে শিল্প খাতে এক অঙ্কের সুদ কার্যকর না করা প্রসঙ্গে মুস্তফা কামাল বলেন, শুরুতে আমরা ভেবেছিলাম যে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন খাতে এক অঙ্কের সুদহার কার্যকর করব। কিন্তু পরে দেখলাম যে, শুধু ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে বাস্তবায়ন করলে অনেক শিল্প ও খাত বাদ পড়ে যাবে। তখন ব্যাংক বলবে, তোমরা শিল্প খাত না। এ সমস্যা দূর করতে প্রধানমন্ত্রী বললেন, যদি সফলতা পেতে চাও, তাহলে সব ঋণগ্রহীতাকে এ সুবিধা দাও। ঋণগ্রহীতা যা করবেন, তাতেই দেশের লাভ হবে। ট্রেড করলেও লাভ, শিল্প করলেও লাভ, সেলুন করলেও লাভ। তাই প্রধানমন্ত্রী বলে দিয়েছেন যে, সব খাতেই এক অঙ্কের সুদে ঋণ দিতে হবে। সেজন্য কয়েক দিন সময় লাগবে।
মন্ত্রী বলেন, ‘এরপর যখন আমরা ব্যাংকারদের সঙ্গে বসলাম, তখন তারা বললেন যে, যেহেতু এতদিন একরকম ধারণা ছিল, এখন সব খাতে কার্যকর করতে হবে, পাশাপাশি আমাদের কিছু স্বল্পমেয়াদি আমানত আছে যেগুলো দুই-তিন মাসের মধ্যে মেয়াদ পূর্তি হবে। তাই এক অঙ্কের সুদহার কার্যকর করতে আমরা তিন মাস সময় চাচ্ছি। তবে এটি তারা বাস্তবায়নে একমত, এটা বাস্তবায়ন করা উচিত বলেও জানিয়েছেন তারা। এজন্যই আমরা তাদের তিন মাস সময় দিয়েছি। আগামী এপ্রিল থেকেই আমরা আশা করি এটি বাস্তবায়িত হবে।’ এবারও বাস্তবায়ন না হওয়ার কোনো আশঙ্কা আছে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা অবশ্যই বাস্তবায়ন হবে। ব্যাংক বড়, নাকি সরকার বড়?
অর্থমন্ত্রী বলেন, এক অঙ্কের সুদহার কার্যকর করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সার্কুলার ইস্যু করবে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। আর সার্কুলার না হলেও ব্যাংকাররা এটি বাস্তবায়ন করবে। কারণ তারাও তো সরকারের অংশ। এভাবে এক অঙ্কের সুদ কার্যকর করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। না হলে দেশে শিল্পায়ন হবে না, খেলাপি ঋণের পরিমাণও কমানো যাবে না।
সরকারের আমানতের অর্ধেক বেসরকারি ব্যাংকে থাকবে জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারি ব্যাংকগুলো সবই প্রায় বড়। কিন্তু বেসরকারি খাতে অনেক বড় ব্যাংকও আছে, ছোট ব্যাংকও আছে। তাই যার পরিশোধিত মূলধন বেশি, সে বেশি টাকা পাবে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে যে ৫০ ভাগ আমানতের টাকা দেওয়া হবে, তা ভাগ করে দেওয়া হবে।
পুঁজিবাজারে চলমান অস্থিরতা সম্পর্কে মুস্তফা কামাল বলেন, পুঁজিবাজারের মূল ভিত্তি হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। দেশের অর্থনীতি যত শক্তিশালী হবে পুঁজিবাজারও তত শক্তিশালী হতে বাধ্য। কিন্তু আমাদের এখানে সেটা ঘটে না। আমি জানি না কেন? সব দিকেই ভালো, শুধু এক জায়গায় বহির্বিশ্বের সঙ্গে মিল নেই।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বিদেশে এক হাজার ইনডেক্স থেকে শূন্যতে এলে এসইসি চেয়ারম্যানকে গালিও দেবে না, মারতেও যাবে না। রাস্তায় গাড়িও ভাঙবে না।’ তিনি বলেন, ‘আমাকে দেখতে হবে ব্যাংকগুলো কারসাজি করে কি না। যে শেয়ারগুলো বাজারে আসে, সেগুলো কারসাজি করে কি না। মুনাফা হওয়ার পরও লভ্যাংশ ঘোষণা না দিয়ে তা পকেটে নেয় কি না। আমাদের অর্থনীতি শক্তিশালী হলে এর প্রতিফলন পুঁজিবাজারে আসতে বাধ্য। আজ না হলে আগামীকাল আসতে হবেই।’
মন্ত্রী আরও যোগ করেন, ‘আগে যেভাবে শেয়ারকে প্রাইসিং করা হতো, সেভাবে এখন হয় না। এখন রেগুলেটর ও অপারেটররা সবসময় আলাপ-আলোচনা করে। যেখানে নীতি-নির্দেশনার অভাব থাকে বা নির্দেশনা আরও শক্তিশালী করা দরকার, সেখানে আমরা ব্যবস্থা নেব। টেক কেয়ার (যতœ) থাকলে মনে হয় ভালো থাকবে।’