দেশে প্রচুর পোশাক কারখানা রয়েছে। যেগুলোতে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ টন ফেব্রিক্স নষ্ট হয়, যেগুলোকে আমরা ওয়েস্টেজ উপকরণ বলি। এগুলো সাধারণত আমরা ফেলে দিই। এতে পরিবেশ নষ্ট হয়, আমাদের এতে মাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এগুলো যদি আমরা কাজে লাগাতে পারি, তবে অনেক মানুষের পোশাকের সমস্যা মেটাতে পারব। পরিবেশকেও ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে পারব...
শীত ভীষণ ফ্যাশনবান্ধব ঋতু। এ ঋতুতেই চোখে পরড় তরুণ-তরুণীদের নিত্যনতুন ফ্যাশন এবং স্টাইল। সবার ভাবনায় থাকে শীত কতটা পড়বে, কেমন ধরনের শীত পোশাক পরবেন। প্রস্তুতি চলতে থাকে কেমন হবে এবারের শীতের পোশাক। এসব পোশাকে থাকে প্যাটার্ন ও শেপের নানা নতুনত্ব। উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে এখন তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের ফ্যাশন ট্রেন্ড। এ বছরের শীতের পোশাকের ধরন অনেক বদলে গেছে। তরুণ ডিজাইনারদের অনেকেই শীতের পোশাক নিয়ে নানা ধরনের নিরীক্ষা করছেন। এ বছর শীতের পোশাকের ধরন ও রঙেও পাওয়া যাবে কুয়াশাচ্ছন্ন ভাব। অর্থাৎ প্রকৃতির রং যেমন বিবর্ণ ও রুক্ষ ঠিক তেমন পোশাকের রঙে এই ব্যাপারটা নিয়ে এসেছেন কোনো কোনো ডিজাইনার। ডিজাইনার এমন কিছু কাজ করছেন যেটা গতানুগতিক ডিজাইনের থেকে একটু ব্যতিক্রম। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাসটেইনেবল ফ্যাশন। পৃথিবীব্যাপী কমবেশি অনেকেই এখন সাসটেইনেবল ফ্যাশন নিয়ে সচেতন। সেই ধারাবাহিকতায় পিছিয়ে নেই আমাদের দেশের ডিজাইনাররাও ৷ এরকমই একজন তরুণ ডিজাইনার রিয়াজুল আফরোজ কমল। যিনি ওয়েস্টেজ ( বাতিল) ডেনিম কাপড় দিয়ে তৈরি করেছেন শীতের পোশাক। যা ফ্যাশনপ্রিয় তরুণদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে। আর পরিবেশ-বান্ধব হওয়ায় সবার আগ্রহও তৈরি হয়েছে। নতুন ভাবনার শীতের পোশাক নিয়ে রিয়াজুল কমল বললেন, আমি তখন ইন্টার্নশিপ করছিলাম একটা কোম্পানিতে। কাজ করতে গিয়ে দেখলাম প্রচুর ডেনিম কাপড় ওয়েস্টেজ হচ্ছে এবং এই কাপড় একরকম ফেলেই দেওয়া হয়। আমি ভাবলাম এই ওয়েস্টেজ কাপড় দিয়ে যদি পোশাক তৈরি করা যায়_ সেই ভাবনা নিয়ে আমার কাজ শুরু। এর সঙ্গে যুক্ত করেছি ব্যতিক্রমী প্যাটার্ন, শেপ ও ম্যাটারিয়াল। শুরুতে আমি ওয়েস্টেজ ডেনিম কালেক্ট করেছি। তারপর এগুলো ঠিকমতো শেইপ দিয়ে স্টিচ করেছি। ওয়াশ করে এগুলোকে একটা আলাদা লুকে এনেছি। এর সঙ্গে আমার ডিজাইনে যুক্ত হয়েছে দেশের গৌরবোজ্জ্বল সিনেমার পোস্টার। এই থিম নিয়ে কাজ করার গল্পটা একটু অন্যরকম। একদিন আল-জাজিরায় একটা ডকুমেন্টারি দেখছিলাম আমাদের দেশের সিনেমার পোস্টার নিয়ে। সত্তর, আশি ও নব্বই দশকে আমাদের দেশের সিনেমার পোস্টারগুলো সুন্দর ছিল। যারা আঁকতেন তাদের কোনো অ্যাকাডেমিক যোগ্যতা ছিল না। কী সুন্দর সিনেমার পোস্টার আঁকতেন। এখন প্রায় হারিয়ে গেছে। এই জিনিসটা আমাকে খুব ভাবায়। অথচ ইউরোপের অনেক দেশে ডেনিমে অনেক সেলিব্রেটিদের কাজ, পোর্ট্রেট, সিনেমা এসব নিয়ে কাজ হয়েছে। আমাদের দেশে হয়নি।
আমি পুরনো দিনের সিনেমার পোস্টার খুঁজতে থাকি। অনলাইন এবং পরিচিতদের মাধ্যমে পোস্টার জোগাড় করি। এই পোস্টারের থিম নিয়ে আমি ডেনিমে ডিজাইন করেছি । সিনেমার পোস্টার লেজার প্রিন্টে ডিজাইন করা। কারণ লেজারপ্রিন্ট দীর্ঘস্থায়ী। সহজে ওয়াশ করা যায়। যদিও আমাদের দেশে লেজারপ্রিন্ট এত সহজপ্রাপ্য না। হাতেগোনা চার-পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে লেজারপ্রিন্ট আছে। মেশিনগুলো অনেক দামি । আমি আমার পরিচিত একটা প্রতিষ্ঠান থেকে ডেনিমে লেজারপ্রিন্ট করেছি। এরপরে পোশাকগুলোতে বাটন, হুক, চেইন, ফ্রিল দিয়ে নতুনত্ব দিয়েছি। কাটিং প্যাটার্নের ক্ষেত্রে স্লিভকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এতকিছু থাকতে ডেনিম বেছে নেওয়ার কারণ হলো আমাদের দেশে প্রচুর পোশাক কারখানা রয়েছে। যেগুলোতে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ টন ফেব্রিক্স নষ্ট হয়, যেগুলোকে আমরা ওয়েস্টেজ উপকরণ বলি। এগুলো সাধারণত আমরা ফেলে দিই। পরিবেশ নষ্ট হয়, আমাদের মাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এগুলো যদি আমরা কাজে লাগাতে পারি তবে অনেক মানুষের পোশাকের সমস্যা মেটাতে পারব। পরিবেশকেও ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে পারব।
আর এই পোশাকগুলো তৈরি হয়েছে আমাদের দেশের একটি পোশাক কারখানার অব্যবহৃত ফেলে দেওয়া টুকরো থেকে। ঠিক এভাবেই যদি এই ফেব্রিক্সগুলো দিয়ে আরও কাজ করা যায় তাহলে খুব অল্প খরচে নতুন নতুন পোশাক আমরা পরতে পারব। ধরুন আমার তৈরি করা জ্যাকেটগুলো ২৫০ টাকার মতো খরচ পড়বে। অথচ কোনো ফ্যাশন হাউজ থেকে একটা শীতের জ্যাকেট কিনতে ন্যূনতম ৮০০ টাকার মতো খরচ হবে।
সাসটেইনেবিলিটির পাশাপাশি চিন্তা করেছি যে এই পোশাকগুলো যেহেতু তরুণ-তরুণীদের জন্য_ তারা অনেক বেশি ফ্যাশন সচেতন এবং যে কোনো ট্রেন্ড অনেক আগেই বুঝতে পারে। যেটা সাধারণ মানুষের বুঝতে একটু সময় লাগে। তাই ডিজাইনার ও তার টার্গেট কাস্টমারদের আকৃষ্ট করার জন্য নতুন বিষয় বেছে নিয়েছি । আমার এই ডিজাইন করা পোশাক শুধু তরুণদের জন্য। যারা ব্যতিক্রমী ফ্যাশন ক্যারি করতে পারে এবং আগ্রহ আছে। ওয়েস্টার্ন পোশাকের সঙ্গে বাংলাদেশের সিনেমার ঐতিহ্যকে ডিজাইন দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছি ৷ এ পোশাক যে কোনো ছেলে-মেয়ের লুকে আনবে পরিবর্তন। আর যেহেতু শীত তাই শীতের কথা চিন্তা করেই মোটা ডেনিমকে বেছে নিয়েছি। এটা যাতে আরামদায়ক হয়_ সেজন্য ওয়াশ করা হয়েছে যাতে এটা পরার পর সমস্যা মনে না হয়।
ডেনিম নিয়ে আমার আরও অনেক পরিকল্পনা আছে। আমি ডেনিম দিয়ে জুতা, নানা রকমের অর্নামেন্ট, হাউসহোল্ড সামগ্রী তৈরি করব। এগুলো খুব কম মূল্যে এদেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দেব। এছাড়া সামনের পহেলা বৈশাখে আমি তরুণদের জন্য ডেনিমের টি-শার্ট ডিজাইন করব। যা গরমে পরার উপযোগী হবে। ডেনিমের লেজারপ্রিন্ট করার কারণে পরিবেশের কোনো ক্ষতি হবে না। অথচ স্ক্রিনপ্রিন্ট কিংবা অন্য কোনো প্রিন্ট করার কারণে যে পরিমাণ কেমিক্যাল বা এসিড ব্যবহার করা তা এই বর্জ্য পরিবেশের অনেক ক্ষতি করে। এ থেকে লেজারপ্রিন্ট অনেক নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব।
বাংলাদেশে পোশাক তৈরির খরচ পৃথিবীর অন্য যে কোনো দেশ থেকে কম। এছাড়া পানির এত সহজলভ্যতা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে নেই। তাই ওয়াশ করা যায় খুব কম খরচে। এছাড়া ডেনিম কাপড় অনেক দিন ধরে পরা যায়। রং বা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে না।
আমার ডিজাইন করা পোশাক কিনতে পারবেন আমার অনলাইন শপ ~কফিট থেকে।