প্রেসিডেন্ট পার্কছাড়া এরশাদের পুরনো কর্মচারীরা

জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রয়াত চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কের বাড়িতে থাকা পুরনো কর্মচারীদের বিদায় করে দেওয়া হয়েছে। এরিককে খাবার দেওয়ার কথা বলে গত ১৪ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট পার্কে ওঠার পর থেকেই এরশাদের সাবেক স্ত্রী ও এরিকের মা বিদিশা একে একে এসব কর্মচারীকে বিদায় করে দিতে থাকেন। সর্বশেষ গত ৩ ডিসেম্বর এই বাড়ির ১৫-২০ বছরের পুরনো কর্মচারীদের একযোগে বিদায় করে দেন তিনি। এসব কর্মচারীর কেউই এখন আর ওই বাসায় ঢুকতে পারছেন না। এসব কর্মচারী দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট পার্ক প্রায় ২৫ বছরের পুরনো। ২০০১ সালে সেখানে ওঠেন এরশাদ। এ সময় তার পুরনো কর্মচারীদের পাশাপাশি নতুন কর্মচারীরাও নিয়োগ পান সেখানে। এরশাদের মৃত্যুর সময় ওই বাড়িতে ১৪-১৫ কর্মচারী ছিলেন। এদের সবাই প্রায় ১৫-২০ বছরের পুরনো।

প্রেসিডেন্ট পার্ক থেকে বিদায় করে দেওয়া কর্মচারীদের একজন আবদুস সাত্তার। তিনি এরশাদের ক্যামেরাম্যান ছিলেন। সব সময় এরশাদের সঙ্গেই থাকতেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান, এসব পুরনো কর্মচারীর মধ্যে রয়েছেন এরশাদের গাড়িচালক আবদুল আউয়াল, আজিজুর রহমান ও আবদুল মান্নান, ব্যক্তিগত সহকারী আবদুল ওয়াহাব, মতিউর রহমান ও বাদশা মিয়া, পাচক ডিউক রোজারিও ও বিপ্লব হোসেন, কাজের বুয়া নিপা, মিতা ও রুবি এবং মালি আতাউর রহমান। এ ছাড়া বাসা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আরও তিন-চারজন কাজের লোক ছিলেন।

এদের মধ্যে আবদুস সাত্তার এরশাদের সঙ্গে ছিলেন ১৯৯৮ সাল থেকে। ওয়াহাব ও মতিও সেই সময় থেকেই এরশাদের সঙ্গে ছিলেন। গাড়িচালক তিনজন ছিলেন ২০০৮ সাল থেকে। বাকিরা সবাই ১৫-১৬ বছরের পুরনো।  

এসব কর্মচারী দেশ রূপান্তরকে জানান, মৃত্যুর আগে এরশাদ ট্রাস্ট গঠন করে তার সব সম্পত্তি ট্রাস্টের নামে দিয়ে গেছেন। ওই ট্রাস্ট থেকেই এরিকের ভরণপোষণসহ যাবতীয় ব্যয় করার কথা। পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট পার্কের কর্মচারীদের বেতনভাতা ও ভরণপোষণ করার কথাও ট্রাস্টের। এরশাদের মৃত্যুর পর এতদিন তাই হয়ে আসছিল। অথচ বিদিশা প্রেসিডেন্ট পার্কে ওঠার পর থেকেই এসব কর্মচারীকে একে একে বিদায় করে দিতে থাকেন। এদের মধ্যে দুই গৃহপরিচারিকা মিতা ও রুবিসহ কয়েকজন প্রেসিডেন্ট পার্কেই থাকতেন। বাকিরা বাইরে থেকে এসে কাজ করে আবার চলে যেতেন। এসব কর্মচারীর মধ্যে ওয়াহাব মতির বেতন ছিল ২৫-৩০ হাজার, রুবি ও মিতা পেতেন ৩০-৩৫ হাজার, গাড়িচালক ও বাবুর্চিরা ২৫ হাজার টাকা করে পেতেন। 

আবদুস সাত্তার জানান, তারা সবাই স্যারের (এরশাদ) সঙ্গে থাকতেন ও এরিককে দেখাশোনা করতেন। এরশাদ অসুস্থ থাকার সময়, বিশেষ করে মৃত্যুর আগের তিন-চার বছর অসুস্থ অবস্থায় তারাই এরশাদকে গোসল করাতেন, পায়খানা-প্রস্রাব করাতেন, মলমুত্র পরিষ্কার করতেন, সেভ করিয়ে দিতেন। সার্বক্ষণিক তারা এরশাদের দিকে নজর রাখতেন, দেখাশোনা করতেন। কখনই তার পরিবারের কোনো সদস্য এরশাদের দেখাশোনা করতে বা সেবাশুশ্রষা করতে আসেননি। মাঝেমধ্যে গভীর রাতে চালকদের ডেকে বেরিয়ে পড়তেন এরশাদ। চিৎকার করে বলতেন, দ্রুত গাড়ি বের কর, বাসায় থাকলে আমি মারা যাব। সে দিনগুলোতে সারা রাত জেগে থাকতে হতো বাসার এসব কর্মচারীকে। এরাই ছিলেন এরশাদের দুর্দিনের সঙ্গী।

এসব কর্মচারীকে বিদায় করে দেওয়ার কারণ হিসেবে বিদিশা তাদের বলেছেন, এরশাদের গঠন করা ট্রাস্ট থেকে কোনো টাকা দেওয়া হচ্ছে না। এরিকের ভরণপোষণও তাকে নিজ অর্থে করতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে এসব কর্মচারীকে তারপক্ষে রাখা সম্ভব নয়।

তবে বিদিশার এই তথ্য সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন কর্মচারীরা। তারা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, বিদিশা চান না এরশাদের পুরনো কর্মচারীরা প্রেসিডেন্ট পার্কে থাকুক। তিনি তাদের বিশ্বাস করেন না। এ জন্য তিনি অর্থাভাবের কথা বলছেন। অথচ গত দেড় মাসে তিনি তার ও এরিককে দেখাশোনা, রান্না ও বাজার করার জন্য নিজের বিশ্বস্ত সাত-আট কর্মচারীকে ওই বাসায় নিয়োগ দিয়েছেন। এর মধ্যে ছয়জনই নারীকর্মী।

প্রেসিডেন্ট পার্ক থেকে এরশাদের পুরনো কর্মচারীদের বের করে দেওয়ার তথ্য সঠিক বলে জানিয়েছেন এরশাদের ট্রাস্টের সদস্য ও এরশাদের পুরনো সহকারী জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, এরশাদের পুরনো ও বিশ্বস্ত কর্মচারীদের বিদায় করে দেওয়ার পেছনে ট্রাস্ট টাকা দিচ্ছে না বলে বিদিশা যে কারণ দেখিয়েছেন, তা সঠিক নয়। ট্রাস্ট চালু করতে হলে সব সদস্যের স্বাক্ষর লাগবে। বিদিশা এরিককে জিম্মি করে রেখে ট্রাস্টে স্বাক্ষর করতে দিচ্ছেন না। ফলে ট্রাস্ট চালু করা যাচ্ছে না। এটা আসলে স্যারের (এরশাদ) কর্মচারীদের ওই বাসা থেকে বের করে দেওয়ার পাঁয়তারা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গতকাল বুধবার বিদিশা বিষয়টি পরিষ্কার করেননি। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, বের করে দেওয়ার কথা তো শুনিনি। তাদের কেউ কেউ ছুটিতে গেছেন। কেউ অসুস্থ। ওরা এমনিতেই আসেন না। বিদায় করে দিলে তো যে ড্রাইভার এরিকের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে, আমি নিজেই তাকে বিদায় করে দিতে পারতাম। সেটা তো করিনি। এসব ব্যাপারে কোনো কথা বলতে চাই না বলে তিনি ফোন রেখে দেন।

দীর্ঘদিনের নিবাস প্রেসিডেন্ট পার্ক থেকে বিদায় হওয়া কর্মচারীরা এখন অসহায় বোধ করছেন বলে তারা জানিয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী বলেন, কখনো ভাবিনি এভাবে স্যারের বাসা থেকে বের করে দেওয়া হবে। আমরা স্যারকে ও এরিককে নিজের স্বজনের মতোই দেখতাম। দুঃসময়ে স্যারের পাশে ছিলাম। তখন কেউ আসেনি। রাত জেগে, দিনের পর দিন না ঘুমিয়ে, আমরা অসুস্থ স্যারের শয্যা পাশে ছিলাম। এখন কোথায় যাব, কী করব বুঝতে পারছি না।

এসব কর্মচারীর ব্যাপারে জাপা কী ভাবছে জানতে চাইলে এরশাদ ট্রাস্টের সদস্য জাহাঙ্গীর হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিদিশার জন্য ট্রাস্ট চালু করতে পারছি না। তিনি এরিককে স্বাক্ষর করতে দিচ্ছেন না। স্যারের মৃত্যুর ফলে জাপার বর্তমান চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে ট্রাস্টের নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দিতে হবে। সেটাও হচ্ছে না। এসব কর্মচারী ট্রাস্টের স্টাফ থাকবে। তবে সবাইকে রাখা সম্ভব হবে না। দরকারও নেই। এমনিতেই কিছু কর্মচারী বাদ দিতে হবে। আমরা তাদের বলেও দিয়েছি। তবে এভাবে বাসা থেকে বের করে দেওয়া উচিত হয়নি। বিদিশা এটা পারেন না। কারণ তিনি নিজেই অবৈধভাবে প্রেসিডেন্ট পার্কে রয়েছেন। আমরা বিদিশার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেব।