ডিসেম্বরের শুরুতে প্রথম দফার গণ-অনশনে মারা গেছেন দুই শ্রমিক। সে সময় গুরুতর অসুস্থ হন আরও বেশ কয়েকজন। কিন্তু পাটকল শ্রমিকদের পাশে কেউ নেই। কেউ আসেননি তাদের আশ্বাস দিতে। দাবি আদায়ে অনড় পাটকল শ্রমিকরা তবু দ্বিতীয় দফা আমরণ গণ-অনশন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। ‘রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল সিবিএ-নন সিবিএ সংগ্রাম পরিষদ’-এর ডাকে এই দ্বিতীয় দফা গণ-অনশন কর্মসূচি টানা পঞ্চম দিন পেরুলো বৃহস্পতিবার। এক দিনে তীব্র শীত আর টানা অনশনে খুলনা, নরসিংদী ও রাজশাহীতে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন অনেক শ্রমিক। সভা-সমাবেশ, মিলগেটে বিক্ষোভ, ভুখা মিছিল, সড়ক অবরোধ, মানববন্ধন প্রভৃতি কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়েও দাবি পূরণ না হওয়ার কারণেই গত ১০ ডিসেম্বর আমরণ গণ-অনশনের মতো কর্মসূচি শুরু করেন পাটকল শ্রমিকরা। দুজনের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রপক্ষের আশ্বাসে ১৪ ডিসেম্বর গণ-অনশন স্থগিত করা হয়। ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় নিয়েছিল রাষ্ট্রপক্ষ। কিন্তু রাষ্ট্রীয় আশ্বাস পূরণ করা হয়নি। তাই দ্বিতীয় দফায় গত ২৯ ডিসেম্বর থেকে আবার আমরণ গণ-অনশন করছেন শ্রমিকরা। এ অবস্থায় প্রশ্ন ওঠা জরুরি যে, শ্রমিকদের কেন এমন মরণপণ আন্দোলন করতে হচ্ছে?
পাটকল শ্রমিকদের ১১ দফা দবির মধ্যে বকেয়া মজুরি পরিশোধ ও মজুরি কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নই এখন মূল দাবি। এছাড়া অন্যান্য দাবির মধ্যে রয়েছেÑবকেয়া মজুরি পরিশোধ, পাটের মৌসুমে মিলগুলোকে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপি ব্যবস্থা বাতিল করা, বদলি শ্রমিকদের স্থায়ী করা, শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ করা ও বরখাস্ত শ্রমিক-কর্মচারীদের পুনর্বহাল করা এবং শ্রমিকদের মজুরি প্রতি সপ্তাহে দেওয়া। পাশাপাশি পাটকলগুলোর আধুনিকায়ন করে সেগুলোকে লাভজনক করার দাবিও রয়েছে ১১ দফায়। এসব দাবিতে ডিসেম্বরের প্রথম দফা অনশন স্থগিত হয়েছিল শ্রম প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ানের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে। পরে ঢাকায় একাধিক বৈঠক হলেও কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। পাটকলের শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন শ্রম প্রতিমন্ত্রী, পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ জুট মিল করপোরেশন-বিজেএমসির চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বৈঠকে মজুরি কমিশন বাস্তবায়নের ব্যাপারে আরও এক মাসের সময় চান শ্রম প্রতিমন্ত্রী। কিন্তু শ্রমিক নেতারা বলছেন, দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় তাদের আর অপেক্ষার উপায় নেই। একদিকে, কয়েক লাখ শ্রমিক-কর্মচারীর জীবন-জীবিকার প্রশ্নে তাদের মরণপণ আন্দোলন; আরেকদিকে লাগাতার আন্দোলনে এমনিতেই লোকসানে থাকা পাটকলগুলোতে প্রতিদিন কোটি টাকার ক্ষতির কথা বিবেচনা করলে দ্রুত এই সংকট নিরসনে উদ্যোগী হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
পাটকল শ্রমিকদের এই আন্দোলন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। সারা দেশে বিজেএমসির অধীন মোট ২৭টি পাটকল রয়েছে। এসব পাটকলের নিয়মিত শ্রমিক প্রায় ৮০ হাজার। বাকিরা মাস্টার রোলে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করেন। সব মিলিয়ে দেশব্যাপী পাটশিল্পের ওপর নির্ভরশীল কয়েক লাখ পরিবার। দেশে একের পর এক পাটকল বন্ধ হওয়া আর নানা সমস্যায় জর্জরিত পাটকলগুলোর লোকসানি শিল্পে পরিণত হওয়ার প্রেক্ষাপটে দীর্ঘদিন ধরেই নানা দাবিদাওয়ায় আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যে রয়েছেন পাটকল শ্রমিকরা। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় মনে হচ্ছে, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো পরিচালনায় সরকারের যথাযথ মনোযোগ না থাকা এবং পাটশিল্পের সামগ্রিক উন্নয়নে বিনিয়োগ ও আধুনিকায়নের সমন্বিত নীতিমালা না থাকার কারণেই শ্রমিকদের পরিস্থিতি এতটা নাজুক অবস্থায় পৌঁছেছে। পাটশিল্পকে এই পরিস্থিতি থেকে বের করে আনতে সরকারকেই উদ্যোগী হতে হবে।
পরিতাপের বিষয় হলো, একসময় ‘সোনালি আঁশ’ খ্যাত পাট নিয়ে গর্ব করা হলেও বিগত কয়েক দশকে ক্রমাগত ধস নেমেছে দেশের পাটশিল্পে। সত্তরের দশকে কৃত্রিম তন্তু এবং পলিথিনের আবিষ্কার সোনালি আঁশ পাটের দুর্দিন ডেকে আনে। কিন্তু এখন আবার বিশ্বজুড়ে পরিবেশ সচেতনতার কারণে বায়োডিগ্রেডেবল আঁশের গুরুত্ব বাড়ছে। এ কারণে বিশ্বব্যাপী পাটের চাহিদা এখন ঊর্ধ্বমুখী। এদিকে, সম্প্রতি বাংলাদেশি বিজ্ঞানীরা পাটের ‘জেনম সিকোয়েন্স’ আবিষ্কারের পর অনেক হইচই হলেও পাটশিল্পের উন্নয়নে তার কোনো প্রভাব দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশে পাটের একর প্রতি উৎপাদন কম এবং ভারতীয় বীজের ওপর নির্ভরশীলতা কৃষককে পাট চাষে নিরুৎসাহিত করছে। এরপরও পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান এখন বিশ্বে তৃতীয়। প্রথম অবস্থানে ভারত, তার পরে রয়েছে চীন। তবে শুধু কাঁচা পাট রপ্তানিতে বাংলাদেশ এখনো বিশ্বে প্রথম অবস্থানে। বাংলাদেশের কাঁচাপাট বেশ উন্নতমানের হলেও কাঁচাপাটের দাম কম। প্রতিবেশী ভারত ও চীন পাটজাত বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে বিশ্ববাজারে ভালো ব্যবসা করলেও বাংলাদেশ এখনো কেন সে বিষয়ে মনোযোগী নয়, তা বোধগম্য নয়। পাটশিল্পের আধুনিকায়নে বিনিয়োগ বাড়িয়ে পাটজাত পণ্য তৈরি ও রপ্তানির জন্য জোরালো কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। আর পাটশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে না পারলে পাটকল শ্রমিক-কর্মচারীদের জীবনমানের উন্নয়নও সম্ভব নয়। দুটো বিষয় একই সূত্রে গাঁথা। এ অবস্থায় সরকারের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো পরিচালনায় বিজেএমসির দক্ষতা বৃদ্ধি এবং পাটকল শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিদাওয়া পূরণে ত্বরিৎ পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।