সুরা মায়েদার ১০৫ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমাদের দায়িত্ব তোমাদেরই ওপর। তোমরা যদি সৎপথে পরিচালিত হও তবে যে পথভ্রষ্ট হয়েছে, সে তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।’
এই আয়াত প্রসঙ্গে ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) বলেন, তোমরা আয়াতটি পাঠ করে একে ভিন্নস্থানে প্রয়োগ করছ। জেনে রাখো, আমি নিজে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখে শুনেছি, তিনি বলেছেন, যারা কোনো পাপকাজ হতে দেখেও তা দমন করতে চেষ্টা করে না, আল্লাহতায়ালা সত্বর তাদেরও অপরাধীদের অন্তুর্ভুক্ত করে আজাবে নিক্ষেপ করবেন। -সুনানে আবু দাউদ: ৪৩৪১
কোরআনে কারিমের ব্যাখ্যাকাররা এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, আয়াতে ‘তোমাদের দায়িত্ব তোমাদেরই ওপর’ বলে আপন আপন কর্তব্য পালন করতে বলা হয়েছে। আর নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে তখনই সচেতন থাকা সম্ভব, যখন সে আত্মসচেতন থাকবে।
মানবজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক আত্মসচেতনতা। আত্মসচেতনতার অর্থ হলো- নিজেকে চেনা, নিজের সম্পর্কে জানা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মনোবিজ্ঞানীরা সামাজিক অবক্ষয় ও নৈতিক আচরণগত স্খলন সম্পর্কে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, বেশিরভাগ নৈতিক অবক্ষয় ও স্খলনের কারণ হলো- নিজের সম্পর্কে না জানা। সাফল্যের প্রভূত দিক, যা নিজের ভেতরে রয়েছে সেগুলো উপলব্ধি করতে না পারা। এরকম অসচেতন মানুষ নিজের ব্যাপারে দোদুল্যমান থাকে। সে কোনোভাবেই নিজের ওপর আস্থা রাখতে পারে না। কীসে কল্যাণ আর কীসে ধ্বংস, সেটা নির্ধারণ করার শক্তি সে হারিয়ে ফেলে। ফলে সে ভুল করে, নানা ধরনের অপরাধে জড়ায়।
বিষয়টি অন্যভাবে বলা যায়, যে নিজেকে চেনে না; সে অনেকটা নাবালকের মতো। বাইরের চাকচিক্য ও ক্ষতিকর বিষয়গুলো তাকে সহজেই একবার এদিকে আবার ওদিকে আকর্ষণ করে। যে আকর্ষণের পরিপ্রেক্ষিতে সে অস্থিরতায় ভোগে। বর্ণিত অবস্থায় বলা যায়, যদি যে নিজেকে চিনত, নিজের মন-মানসিকতার ওপর দৃঢ় থাকত তাহলে সে অন্যায় কাজে জড়াত না। অবক্ষয়কে ঘৃণা করত, নৈতিক স্খলনের পথ এড়িয়ে চলত। সুতরাং পাপে না জড়ানোর জন্য, মনোদৈহিক প্রশান্তি ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে দৃঢ় মনোবল থাকার নেপথ্য উপায় হলো নিজেকে চেনা।
দুনিয়ার প্রায় মানুষই তার নিজের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে উদাসীন। কিন্তু আত্মসচেতনতার মধ্য দিয়েই সেসব বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে অবহিত হওয়ার সুযোগ মেলে। ইসলামি স্কলাররা বলেছেন, নিজেকে চেনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নিজের সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি ও জীবনাচারের ক্ষেত্রে পরিবর্তনগুলো উপলব্ধি করা। এই উপলব্ধির প্রাথমিক পদক্ষেপ হলোÑ নিজের ভুলভ্রান্তিগুলোকে চেনা, দুর্বল দিকগুলো সম্পর্কে সচেতন হওয়া, নিজের অসন্তুষ্টি কিংবা ব্যর্থতাগুলোর ব্যাপারে জানা। কারণ, মানুষের আচার-ব্যবহার, অনুভূতি, দৃষ্টিভঙ্গি সবই নির্ভর করে মানুষের ব্যক্তিগত বোধবিশ্বাসের ওপর। আর আমাদের সব ব্যর্থতা ও সাফল্যের নেপথ্য চালিকাশক্তি এগুলোই। সামগ্রিকভাবে বলা যায়, নিজেকে চেনার পন্থাগুলো অর্জন করার মধ্যেই নিহিত- গঠনমূলক ও সুন্দর ব্যবহার, দায়িত্বশীল আচরণ ও আত্মসম্মানের বীজ।
যুগে যুগে আল্লাহতায়ালার প্রেরিত নবী-রাসুল ও মনীষীরা নিজেকে চেনার দিকেই আহ্বান জানিয়েছেন সমাজের মানুষকে। এমনকি আসমানি কিতাবসমূহের বিষয়বস্তুও অধিকাংশই এ বিষয়ে। ইসলাম মনে করে, যে নিজেকে জানল, সে তার সৃষ্টিকর্তা আল্লাহকে জানল।
ইসলামি স্কলাররা নিজেকে চেনার শিক্ষাকে সবচেয়ে উত্তম ও উপকারী শিক্ষা বলে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, নফস মানে আমিত্ব, আমার ব্যক্তিত্ব, আমার আত্মা। সুতরাং নফসকে যদি চেনা না যায়, তাহলে জ্ঞান-বিজ্ঞানের পরিচয় ও শিক্ষা মানুষ উপলব্ধি করতে পারবে না, এসবের ভালোমন্দ কিংবা উপকার-অপকারের দিক মূল্যায়নে ব্যর্থ হবে।
কোরআনে কারিমে আত্মসচেতনতার বিষয়টি পরিচর্যার মাধ্যমে নিজেকে ফিরে পাওয়ার অর্থে বুঝিয়েছে। পৃথিবী ও পরকালীন জীবনের বাস্তবতা সম্পর্কে জাগৃতি ও সচেতনতার ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে বহু আয়াত রয়েছে। কোরআনে কারিম মানুষকে আহ্বান জানিয়েছে নিজেকে নিয়ে এবং এই বিশ্ব চরাচর নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার মধ্য দিয়ে সৌভাগ্য ও সাফল্যের পথ খুঁজে নেওয়ার।
কোরআনে কারিম একইভাবে গভীর চিন্তাভাবনাকে ইবাদত বলে উল্লেখ করেছে। চিন্তা করার জন্য চিন্তাশীলদের আহ্বান জানিয়েছে বারবার, নানাভাবে, বিভিন্ন উপলক্ষে। বুদ্ধিমত্তা ও যুক্তির সাহায্যে চিন্তাভাবনা ছাড়া কোনো নীতি-বিশ্বাসকে সঠিক বলে মনে করে না। এ থেকে অনুমিত হয় যে, মানুষের চিন্তা-চেতনাগত ভ্রান্তি ও অবক্ষয়ের পেছনে রয়েছে নিজেকে না চেনা এবং এই বিশ্ব প্রকৃতি সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান না থাকা। এই দুইয়ের জ্ঞানহীনতাই মূলত সব ধরনের ভুলভ্রান্তি ও নৈতিক স্খলনের মূল উৎস। ভুল স্বীকার করে সেগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার ফলে সমালোচনা গ্রহণের মন-মানসিকতা তৈরি হয়। সেইসঙ্গে নিজের ব্যক্তিসত্তা, ব্যক্তিত্ব আরও বেশি মূল্যবান ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। প্রকৃত মুমিন-মুসলিমরা এই গুণে গুণান্বিত হোক, এটাই ইসলামের চাওয়া।
ইসলাম মনে করে, সমালোচনা গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে ব্যক্তিত্ব ও আত্মমর্যাদা বাড়ে। সুতরাং মানুষ যদি চায় সুস্থ জীবনযাপনের পথে পা বাড়িয়ে সৌভাগ্য, কল্যাণ ও সাফল্যের পথে অগ্রসর হতে; তাহলে তাদের উচিত আত্মসচেতন হওয়া অর্থাৎ নিজেকে চেনা। কোরআনে কারিমের দৃষ্টিতে মানুষের আত্মসচেতনতা সরাসরি মানুষের বোধবিশ্বাস, জ্ঞান-প্র্রজ্ঞা, বুদ্ধি-বিবেক এবং মেধার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই নিজের সম্পর্কে মানুষ যত বেশি জানবে, মানুষের চিন্তার গভীরতা তত বাড়বে। আর এটাই জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা ও সাফল্য।
লেখক : মুফতি ও ইসলামবিষয়ক লেখক