ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখার (প্রাইভেট প্র্যাকটিস) ব্যাপারে কোনোই ছাড় দিতে চান না সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা। এ নিয়ে কোনো বাধ্যবাধকতার মধ্যেও আসতে চান না তারা। গত দুই বছর ধরেই স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারি চিকিৎসকদের হাসপাতালেই প্রাইভেট প্র্যাকটিস করার কথা বলে এলেও এখনো সে নির্দেশ কার্যকর হয়নি। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম তার সময়ে একবার উদ্যোগ নিলেও চিকিৎসকদের অসহযোগিতার কারণে শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে আসেন। সর্বশেষ গত ১২ নভেম্বর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় রাজধানীর পাঁচ বিশেষায়িত হাসপাতালে ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাকটিসের মাধ্যমে বহির্বিভাগে রোগীদের সান্ধ্যকালীন সেবা চালুর লিখিত নির্দেশ দেয়।
হাসপাতালগুলো হলো ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতাল এবং জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতাল)।
ওই নির্দেশনা অনুযায়ী, এ উদ্যোগ চালু করতে কী কী প্রয়োজন তা জানিয়ে ১৫ দিনের মধ্যে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব জমা দিতে বলে মন্ত্রণালয়। পরে গত ১৮ নভেম্বর এ উদ্যোগ চালু করতে প্রয়োজনীয় পদ্ধতি প্রণয়নের জন্য ৯ সদস্যের একটি কমিটিও করা হয়। ওই কমিটির ১৫ দিনের মধ্যে, অর্থাৎ ৩ ডিসেম্বরের মধ্যে পরিচালনা পদ্ধতির একটি খসড়া জমা দেওয়ার কথা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, হাসপাতালগুলো প্রস্তাবনা জমা দিয়েছে। সেখানে তারা একটি নীতিমালা প্রণয়ন করতে বলেছেন এবং উপযুক্ত নীতিমালা ছাড়া এ উদ্যোগ চালু করলেও বেশিদিন টেকসই করবে না বলেও মত দিয়েছেন। পরে কমিটি বৈঠক করে। সেখানে এত দ্রুত নীতিমালা তৈরি সম্ভব না বলে সিদ্ধান্ত হয়। এমনকি কত দিনের মধ্যে নীতিমালা হবে, সে ব্যাপারেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকার দৃঢ় বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটা হবে। দেশের মানুষ সেবা পাবে। একটা নতুন কিছু করতে গেলে কিছুদিন সময় লাগে। এলোমেলোভাবে করা যায় না। এটা হলে হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা হাসপাতালের ভেতরই তাদের রোগী দেখতে পারবে। আবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীরাও সেবা পাবে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে নির্দেশনা পেয়েছি। পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে পাঁচটি হাসপাতালকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, ডাক্তাররা কতক্ষণ বসবে, কত ফি নেবে, কোন কোন ডাক্তার বসবে, সেগুলো নির্ধারণ করতে হবে। একটা ফর্ম করেছি। নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে। সবকিছু নিয়মের মধ্যে আনতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, রোগীদের একটা অভিযোগ আছে, দুপুরের পর হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সেবা পান না। তারা অবশ্য অনকলে থাকেন। তবে আমাদের অনকলটা অ্যাকটিভ না। তাই এ উদ্যোগ। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে। নীতিগতভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। কাজ চলছে। হাসপাতালগুলো প্রস্তাবনা দিয়েছে। সেগুলো দেখা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া প্রস্তাবনায় হাসপাতাল পরিচালকরা সরকারের এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তবে তারা তাদের প্রস্তাবনায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরিবর্তে জুনিয়র চিকিৎসকদের দিয়ে ‘ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাকটিস’ বা প্রাইভেট প্র্যাকটিস করাতে চান।
জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল থেকে পাঠানো প্রস্তাবনায় হাসপাতালের নানা সংকটের কথা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এখনো হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্টসহ মোট ১৪৩টি পদের মধ্যে বর্তমানে কর্মরত ৯১ জন। এখনো ৫২টি পদ ফাঁকা। এর মধ্যে চিকিৎসকের ৩৬ শতাংশ ও নার্সের ১৮ শতাংশ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও চিকিৎসক সংকটের কারণে আউটডোরে চিকিৎসা দিচ্ছেন জুনিয়র চিকিৎসকরা। এছাড়া স্বল্পসংখ্যক নার্স কর্মরত এখানে। এমন অবস্থায় সান্ধ্যকালীন সেবা চালু করতে এসব সংকট সমাধানের সুপারিশ করা হয়।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, এই বিশেষায়িত হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসকের ৪৪টি পদ, নার্সদের ১২টি পদ, নন-মেডিকেল ৮টি, তৃতীয় শ্রেণি ৬২ ও চতর্থ শ্রেণি ৫২টি পদ শূন্য রয়েছে। বিশেষ করে চিকিৎসক ও নার্সদের সংকটের কারণে বহির্বিভাগে চিকিৎসা সেবায় বিঘœ ঘটছে। এছাড়া অন্য তিনটি হাসপাতালও বর্তমানে লোকবল ও যন্ত্রপাতি সংকটের কারণে চিকিৎসা সেবায় বিঘœ ঘটছে বলে জানিয়েছে।
সরকারি হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা মুখে সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও নিজেরা হাসপাতালে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে নারাজ। প্রয়োজনে সরকারি চাকরি ছেড়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন তারা। এ ব্যাপারে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. গোলাম মোস্তফা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারের এ উদ্যোগ স্টেপ বাই স্টেপ করতে হবে। এতে নিচ লেভেলের চিকিৎসকরা উপকৃত হবেন। কারণ তাদের ভালো চেম্বার নেই। চশমার দোকানে বসে। তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের জন্য কঠিন হবে। সে ক্ষেত্রে তাদের রোস্টার করে দেওয়া যেতে পারে। ওইদিন তারা এখানেই ফি নিয়ে রোগী দেখবেন।
এ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আরও বলেন, সরকার এ উদ্যোগ চালু করতে চাইলে সন্ধ্যায় ডায়াগনস্টিক সরঞ্জামাদিসহ পুরো ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে। নার্স, ওয়ার্ড বয়Ñ সব লাগবে। সরকারকে বিশেষ ভর্তুকি দিতে হবে। চিকিৎসকদের ফি থেকে অর্থ সবার মধ্যে ভাগ করে দিতে হবে। তবে সিনিয়র ডাক্তারদের রাখতে হলে বিশেষ সুবিধা দিতে হবে। তা না হলে তারা রাজি হবেন না।
জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আফজালুর রহমান গত ২ ডিসেম্বর থেকে অবসরে গেছেন। অবসরে যাওয়ার আগেই তিনি মন্ত্রণালয় থেকে সান্ধ্যকালীন সেবা শুরুর নির্দেশনা পান এবং প্রস্তাবনাও তৈরি করে যান। এ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেশ রূপান্তরকে বলেন, সান্ধ্যকালীন সেবার মাধ্যমে সরকার মূলত সরকারি চিকিৎসকরা অফিস সময়ের বাইরে যে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন, সেটাই হাসপাতালে করাতে চাইছে। তবে এ উদ্যোগ চালু করতে হলে লোকবল বাড়াতে হবে। পদ্ধতি ঠিক করতে হবে। অবশ্য সিনিয়রদের রাখা কঠিন হবে। যারা বেশি ব্যস্ত তারা রাজি হবেন না। বিশেষ করে ফি নির্ধারণ করতে হবে। সিনিয়ররা বাইরে যে ফি নেন, সেটা না পেলে করতে চাইবেন না। একটা গাইডলাইন তৈরি করতে হবে। বেসরকারি হাসপাতালে বা ব্যক্তিগত চেম্বারে কে কত ফি নেন, সেটা যাচাই করে ফি নির্ধারণ করতে হবে। নতুবা সিনিয়রদের পাওয়া যাবে না।
মোটা অঙ্কের বিনিময়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করার জন্য বিভিন্ন সময় সরকারি হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সরকারি চাকরি ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই পাঁচ হাসপাতালের চিকিৎসকরা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, এখন সরকারি হাসপাতালে সুযোগ-সুবিধা কম। রোগীর চাপ বেশি। বেতনও কম। তাই অনেক চিকিৎসক সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। এর মধ্যে ১০-১৫ বছরে শুধু প্রাইভেট প্র্যাকটিস করবেন বলেই জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতাল ছেড়েছেন পাঁচ সহকারী অধ্যাপক। বর্তমানে তারা সবাই নামকরা চিকিৎসক ও বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালের প্রধান কার্ডিওলজিস্ট ও প্রধান সার্জন। একই কারণে অন্য চারটি হাসপাতাল থেকে অন্তত ১০ চিকিৎসকের সরকারি চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কথা জানা গেছে।
এসব চিকিৎসকের মধ্যে দুজন দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, সরকারের এ উদ্যোগ সফল হবে না। কারণ সরকারি চাকরির সময়সীমার বাইরে চিকিৎসকরা স্বাধীন। কে কোথায় প্রাইভেট প্র্যাকটিস করবেন, সেটা তাদের ইচ্ছা। তারা ফি নেন নিজেদের যোগ্যতার ওপর। সুতরাং সরকার যদি হাসপাতালেই প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে বাধ্য করে, সে ক্ষেত্রে সিনিয়রদের রাখা কঠিন হবে। তাছাড়া লজিস্টিক সাপোর্টও কম।
অথচ সরকারি হাসপাতালের বেশিরভাগ সিনিয়র ডাক্তার সরকারের বেঁধে দেওয়া নিয়ম অনুযায়ী সেবা দেন না বলে অভিযোগ করেছেন এসব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরই অনেকে। তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নিয়ম অনুযায়ী সিনিয়র ডাক্তারদের নির্ধারিত ডিউটির পর অনকলে থাকার কথা। যেদিন যে চিকিৎসকের অধীনে রোগী ভর্তি হন, সেদিন ওই চিকিৎসকের দায়িত্ব তার সব রোগীর ঠিকমতো দেখা ও সেবা দেওয়া। কিন্তু তা করেন না। ফলে দুপুরের পর কোনো হাসপাতালেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পাওয়া যায় না। সেবা দেন মেডিকেল অফিসার ও ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। অথচ এসব চিকিৎসকই তাদের ব্যক্তিগত চেম্বারের রোগীদের সারা রাত হাসপাতাল ঘুরে ঘুরে দেখেন।
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক (পঙ্গু হাসপাতাল) অধ্যাপক ডা. গনি মোল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা আমাদের প্রস্তাবনা জমা দিয়েছি। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত রোগী দেখবেন চিকিৎসকরা। ওই সময় ওটি চালু রাখতে হবে। অন্যান্য ডাক্তার, নার্সসহ সব বিভাগ খোলা রাখতে হবে। সেটা কীভাবে সম্ভব, পদ্ধতি বের করতে হবে। লজিস্টিক সাপোর্ট লাগবে। তবে সিনিয়রদের রাখা যাবে বলে মনে হয় না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পঙ্গু হাসপাতালের দুই অধ্যাপক দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পাওয়া কঠিন হবে। কারণ তাদের ব্যক্তিগত চেম্বারে ও বেসরকারি নামিদামি হাসপাতালে যেসব রোগী আসেন, তারা সরকারি হাসপাতালে আসবেন না। সে ক্ষেত্রে ডাক্তারদের আয় কমে যাবে। এমনও হতে পারে সরকার জোর করলে অনেক ডাক্তার চাকরি ছেড়ে দেবেন।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালের (কিডনি হাসপাতাল) এক অধ্যাপক দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ না করে সপ্তাহে এক দিন কোনো সিনিয়র হাসপাতালের আউটডোরে কাজ করতে পারেন।
সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সময় সরকারি হাসপাতালে প্রাইভেট প্র্যাকটিসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে সময় সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে পরীক্ষামূলকভাবে চালুও করা হয়েছিল। কিন্তু বেশিদিন চালানো যায়নি। এ ব্যাপারে এই হাসপাতালের বর্তমান পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, তখন সরকারি হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। একটি কমিটিও করা হয়েছিল। পরে আর এগোয়নি।