রাজধানীর অন্যতম নান্দনিক স্থান হাতিরঝিলের সৌন্দর্য রক্ষা করতে ২০১৬ সালের শেষদিকে একটি বিশেষ ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) প্রণয়ন করেছিল গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। সেই ড্যাপ অনুযায়ী হাতিরঝিল ঘিরে ৩০০ মিটার পর্যন্ত নকশা অনুমোদনে পৃথক বিধান রাখা হয়। এ বিধানের ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় ইমারত নির্মাণে ভোগান্তিতে পড়ে সাধারণ মানুষ। এ নিয়ে গত কয়েক বছরে শত শত আবেদন জমা পড়লেও আইনি জটিলতায় কোনো সুরাহা করতে পারছে না রাজউক। তাই ওই বিশেষ ড্যাপে পরিবর্তন করার উদ্যোগ নিয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। ইতিমধ্যে দুর্ভোগ লাঘবে বেশকিছু সুপারিশ তৈরি করা হয়েছে। নিউ ইয়র্ক, সিঙ্গাপুর, দুবাই, লন্ডন ও ব্যাংককসহ উন্নত শহরের মতো এখানেও দৃষ্টিনন্দন বহুতল ভবন নির্মাণে ইমারত নির্মাণ আইন অনুযায়ী কাজ করতে চায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রাজউক। বিষয়টি সুরাহা করতে আগামী সপ্তাহে সভা আহ্বান করছে পূর্ত মন্ত্রণালয়।
জানতে চাইলে রাজউকের পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) তানজিলা খানম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাতিরঝিল এলাকার জন্য একটি বিশেষ ড্যাপ তৈরি করা হয়েছে। সেই ড্যাপ অনুযায়ী হাতিরঝিল এলাকার চারপাশে ৩০০ মিটার পর্যন্ত নকশা অনুমোদনে ভিন্ন একটি কমিটির সুপারিশ আমলে নিতে হয় সংশ্লিষ্টদের। এতে নকশা অনুমোদন করতে গিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। বেশকিছু আবেদন ঝুলে আছে। তাই এ বিষয়ে রাজউক থেকে কিছু নতুন পরিকল্পনা তুলে ধরে সুপারিশ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী সপ্তাহে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে সভা হওয়ার কথা রয়েছে।’
রাজউক সূত্রে জানা যায়, হাতিরঝিল এলাকায় নৈসর্গিক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য একটি বিশেষ ড্যাপ প্রণয়ন করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। এ ড্যাপ প্রণয়নের ফলে হাতিরঝিলের ৩০০ মিটার দূরত্ব পর্যন্ত এলাকায় কাঠামো তৈরি করতে হলে ইমারত আইন ছাড়াও কিছু বিধি-বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এ বিষয়ে ২০১৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর একটি গেজেটও প্রকাশ করে মন্ত্রণালয়। এরপর থেকেই হাতিরঝিল এলাকার আশপাশের প্লটের মালিকরা ইমারত নির্মাণের ক্ষেত্রে পড়েন বিপাকে। বিদ্যমান বিশেষ ড্যাপের সঙ্গে ইমারত নির্মাণ আইন-২০০৮-এর সাংঘর্ষিক অবস্থা সৃষ্টি হয়। ফলে ইমারত নির্মাণের শত শত আবেদন ঝুলে থাকলেও কোনো সমাধান করতে পারছে না সংশ্লিষ্টরা।
রাজউক সূত্র আরও জানায়, প্রকাশিত গেজেটের ‘ক’ অনুযায়ী হাতিরঝিল এলাকার জন্য প্রণীত বিশেষ ড্যাপের সুপারিশ নিতে হবে। তবে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-২০০৮ প্রযোজ্য হবে। কিন্তু সুপারিশ কোনগুলো হবে তা স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়নি। এখানে বিভিন্ন কমিটি, উপকমিটি করা হয়েছে যারা বিভিন্ন সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে ২০১৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর কমিটির সুপারিশে বলা হয়, সম্মুখভাগে ছয়তলা পর্যন্ত নির্ধারিত থাকবে। আর এর ভেতরে পর্যায়ক্রমে একটি করে তলা বাড়ানো যাবে। এখানে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-২০০৮ অনুযায়ী ফার, সেটব্যাক ও উচ্চতার বিষয়ে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া হাতিরঝিল প্রকল্পের পাশে ক্ষুদ্র ব্যক্তিমালিকানাধীন প্লট একত্রীকরণ না করে উন্নয়ন করা হলে সে ক্ষেত্রে প্লট মালিকদের অবশ্যই অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগ তৈরি করতে হবে। কোনোভাবেই হাতিরঝিল প্রকল্পের সড়কে অনুমতি দেওয়া যাবে না। এছাড়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লেকসংলগ্ন প্লটকে বাণিজ্যিক হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ প্লটই আবাসিক, এখানে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্লট নেই।
রাজউক সূত্রে জানা যায়, ৪১/১, দিলু রোডে একটি বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠান ভবন নির্মাণে আবেদন করেছে। ইমারত নির্মাণ আইন মেনে এ প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নয়তলার অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। কিন্তু উচ্চতার বিষয়ে বিশেষ ড্যাপ ও বিদ্যমান আইনের কোনটি অনুসরণ করা হবে তা স্পষ্ট না থাকায় দীর্ঘ সময়েও তারা অনুমোদন পাচ্ছে না।
রাজউক কর্মকর্তারা জানান, হাতিরঝিলের সার্বিক বিষয়ে তিনটি কমিটি রয়েছে। কমিটিতে পূর্ত মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা ছাড়াও হাতিরঝিল প্রকল্পের সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. মজিবুর রহমান, অধ্যাপক ইশরাত আরা, স্থপতি ইকবাল হাবিব, প্রকল্প পরিচালক (রাজউক অংশের) ও প্রকল্প কর্মকর্তা (সেনাবাহিনী অংশের) সদস্য হিসেবে রয়েছেন।
স্থপতি ইকবাল হাবিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজধানীর সব স্থানেই বিশেষ এলাকার জন্য বিশেষ বিধান প্রযোজ্য করা হয়েছে। হাতিরঝিলের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম নয়। হাতিরঝিলের ৩০০ মিটারের মধ্যে স্থাপনা নির্মাণে প্রাকৃতিক বিষয় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাজউকের সংশ্লিষ্ট লোকজন কেন নকশা অনুমোদন করতে পারছে না তা আমার জানা নেই।’