সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেনের জন্ম ১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৫ সালে নরসিংদীতে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর (প্রথম শ্রেণিতে প্রথম) ডিগ্রি লাভের পর প্যারিসের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন থেকে ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করেন। পেশাদার কূটনীতিক মো. তৌহিদ হোসেন বিসিএস-১৯৮১ (পররাষ্ট্র ক্যাডার) ব্যাচের কর্মকর্তা। পেশাগত জীবনে তিনি বাংলাদেশ হাইকমিশন দিল্লি ও কলকাতায় দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ২০০৬ সাল থেকে ২০০৯ সালের জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। ভারতের সাম্প্রতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি, দেশটির পার্লামেন্টে পাস হওয়া নাগরিকত্ব সংশোধন আইন, বিশ্বব্যাপী দক্ষিণপন্থার উত্থান, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎসহ নানা বিষয়ে তিনি দেশ রূপান্তরের মুখোমুখি হয়েছিলেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তরের সম্পাদকীয় বিভাগের অনিন্দ্য আরিফ
দেশ রূপান্তর : ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধন আইনকে কীভাবে দেখছেন?
মো. তৌহিদ হোসেন : অবশ্যই নাগরিকত্ব সংশোধন আইন বা যে কোনো আইনই একটা দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তবে দুটি কারণে বাংলাদেশের অসন্তুষ্টির কারণ রয়েছে। এই আইনে বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানকে এক ব্র্যাকেটে ঢোকানো হয়েছে। এটা আমরা আশা করি না। দ্বিতীয়ত, এই আইনে বলা হচ্ছে যে বাংলাদেশসহ এই দেশগুলো থেকে যারা নির্যাতিত হয়ে ভারতের অভ্যন্তরে আশ্রয় নিচ্ছে, তারা নাগরিকত্ব পাবে। অর্থাৎ তার অর্থ দাঁড়ায় যে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন হচ্ছে। ভারতকে আমরা বন্ধুরাষ্ট্র মনে করি। তাই তাদের আইনে এমন একটা কথা থাকবে তা প্রত্যাশা করা যায় না।
দেশ রূপান্তর : ভারতের এই অস্থিতিশীলতা কী দেশটির রাষ্ট্রীয় সংহতিকে বিনষ্ট করছে? এর ফলে বিচ্ছিন্নতাবাদ মাথাচাড়া দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে কি?
মো. তৌহিদ হাসান : বিচ্ছিন্নতাবাদ বিভিন্ন কারণে সৃষ্টি হয়। ভারতে যে বিচ্ছিন্নতাবাদ নেই, তা তো নয়। উত্তর-পূর্ব ভারতে তো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ছিল। কিছু জায়গায় এখনো নেই, তা নয়। তাদের বিরুদ্ধে ভারতের নিরাপত্তা বাহিনী ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। কিন্তু শুধুমাত্র নাগরিকত্ব সংশোধন আইনকে কেন্দ্র করে বিচ্ছিন্নতাবাদ নতুন করে মাথাচাড়া দেবে, সেটা আমার মনে হয় না।
দেশ রূপান্তর : এনআরসি, কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল, নাগরিকত্ব সংশোধনী, অযোধ্যার বাবরি মসজিদ নিয়ে রায়Ñ এসব ঘটনার মধ্যে কোনো ধরনের পারস্পরিক যোগসূত্র দেখতে পান?
মো. তৌহিদ হাসান : এর মধ্যে পারস্পরিক যোগসূত্র একটাই, তা হলো সাম্প্রদায়িক একটা দল ভারতের ক্ষমতায়। তারা তাদের যে সাম্প্রদায়িক এজেন্ডা রয়েছে, তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। তারা উৎসাহিত হচ্ছে, কেননা তাদের সাম্প্রদায়িক এজেন্ডাকে বিপুল সমর্থন দিয়েছে ভারতের জনগণ। তাই তারা মনে করছে এরকম আইনকানুন সৃষ্টির মাধ্যমে তারা তাদের ভোটব্যাংককে আরও সুসংহত করতে পারবে। এ কারণেই তারা এমন সাম্প্রদায়িক লাইন নিচ্ছে। কারণ দেখা যাচ্ছে যে, সাম্প্রদায়িকতা তাদের ক্ষমতায় থাকার জন্য বা ক্ষমতায় আসার জন্য সুবিধাজনক।
দেশ রূপান্তর : ভারত দীর্ঘদিন ধরে জওয়াহেরলাল নেহরু প্রভাবিত রাজনীতির ছাঁচে পরিচালিত হয়েছে। দেশটির ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের মাধ্যমে এ ছাঁচের একটা বড় ধরনের প্রভাব বজায় ছিল। বিজেপি দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, এই ছাঁচের অবসান ঘটেছে। ধর্মনিরেপক্ষতা বারবার আক্রান্ত হচ্ছে। ভারত রাষ্ট্রের এই পরিবর্তনকে কীভাবে দেখছেন?
মো. তৌহিদ হোসেন : সব সময়ই কিছু সাম্প্রদায়িকতা থাকে। ভারতেও ছিল, অন্যান্য দেশেও আছে। তবে সেই সাম্প্রদায়িকতার চেয়ে বড় বিষয় ছিল যে, ভারত রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মনিরপেক্ষ ছিল। কিন্তু পাশাপাশি, ধর্মনিরেপক্ষতার বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার উপাদানও বজায় ছিল। বিজেপির উত্থানের পর্যায়ক্রম দেখলে বিষয়টি বোঝা যাবে। কিন্তু এই আইন যদি কার্যকর হয়, তাহলে ভারতকে ধর্মনিরেপক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে দেখাটা অনেক কঠিন হয়ে পড়বে। একটা আইন পাস হচ্ছে, যা ধর্মনিরপেক্ষ নয়। বাস্তবে, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারণে ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যত্যয় ঘটে। ভারতেও বিভিন্ন সময়ে ঘটেছে। বাবরি মসজিদের মতো পাঁচশ বছরের একটা পুরনো মন্দির ভেঙে দেওয়া তো ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে খাপ খায় না। কিন্তু তারপরেও তাত্ত্বিকভাবে ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর কারণে তা একটা বড় ধরনের হোঁচট খেয়েছে।
দেশ রূপান্তর : ভারতে নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের ফলে দেশটিতে চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিদিনই বিক্ষোভে উত্তাল হচ্ছে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য। এই পরিস্থিতি কি আঞ্চলিক নিরাপত্তায় কোনো সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে?
মো. তৌহিদ হোসেন : ভারতে এখনো চরম বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টি হয়নি। ভারতে এরকম পরিস্থিতি আগেও যে সৃষ্টি হয়নি, তা নয়। ম-ল কমিশন নিয়ে এর আগে ভারতে একই ধরনের বিক্ষোভ হয়েছিল। এবার নাগরিকত্ব আইন নিয়ে ভারতে একটা জটিল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এটা থেকে ভারত কীভাবে বেরিয়ে আসবে, তা আমি জানি না। এটার পরিসমাপ্তি কীভাবে ঘটবে, তাও বলতে পারছি না। সেটা ভারতীয় রাজনীতিবিদদের ওপর নির্ভর করছে। আর আঞ্চলিক নিরাপত্তার ব্যাপারে এটা কোনো বড় ভূমিকা রাখবে বলে আমার মনে হয় না। অবশ্য এটা ভারতের জন্য একটা বড় ধরনের নিরাপত্তা ইস্যু তো বটেই। ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকজন প্রাণ হারিয়েছেন। কোনো রাজনৈতিক দল বা সরকারের কাছে এটা কাম্য নয়। তাই ভারতও চেষ্টা করবে এখান থেকে বের হওয়ার রাস্তা খুঁজে বের করতে। কীভাবে বের হতে পারে, তা নিয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই।
দেশ রূপান্তর : ভারতে মোদি, যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প, যুক্তরাজ্যে বরিস জনসন, ব্রাজিলে বোলসানিরিওসহ সারা বিশ্বের অনেক দেশেই উগ্র দক্ষিণপন্থার উত্থান ঘটছে। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
মো. তৌহিদ হোসেন : এটা আমরা অনেকদিন আগে থেকেই বলে আসছি যে, গোটা বিশ্বের রাজনীতি ডানদিকে মোড় নিয়েছে। অনেক দেশেই ডানপন্থিরা ক্ষমতায় আসছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যে এর ব্যতিক্রম ঘটছে না, তা নয়। ফ্রান্সে তো ম্যারি লা পেন জিততে পারেননি। তবে তিনি যে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছেন, এটা অবশ্য খারাপ বার্তা বহন করে। কেননা, তার পিতা জমারি লা পেন তো খুব কম ভোট পেতেন। তিনি তো একেবারেই মার্জিনাল ছিলেন। দুই শতাংশ বা পাঁচ শতাংশ ভোট পেতেন। সেখান থেকে ম্যারি লা পেন যে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছেন, এটা ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা। জার্মানিতে চরম ডানপন্থিরা খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। ছোট ছোট কিছু দেশে ডানপন্থিরা ক্ষমতায় এসেছে। সর্বোপরি, পৃথিবীর রাজনীতি ডানদিকে মোড় নিয়েছে। এটা পৃথিবীর জন্য মঙ্গলজনক নয়। আবার আমাদের জন্যও মঙ্গলজনক নয়। কিন্তু এ ব্যাপারে আমাদের তো কিছু করার নেই। নিজেদের এক্ষেত্রে সংহত থাকতে হবে। আমাদের চারদিকে নজর রাখতে হবে। এবং আমাদের এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে যাতে আমরা কম ক্ষতিগ্রস্ত হই।
দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, এনআরসি এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। কিন্তু অমিত শাহসহ অনেক বিজেপি নেতার মুখে যেভাবে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’র কথা উচ্চারিত হচ্ছে এবং নাগরিকত্ব সংশোধন আইনে বাংলাদেশসহ তিনটি দেশের যে উল্লেখ রয়েছে তাতে কি এটাকে শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ রয়েছে?
মো. তৌহিদ হোসেন : ভারত যতই এটাকে অভ্যন্তরীণ বিষয় বলুক না কেন, এটা এখন আর অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। বিষয়টি যেহেতু বাংলাদেশকে স্পর্শ করে, তাই এটি আর অভ্যন্তরীণ বিষয় নেই। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এটাকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বললেও তার উদ্বেগ রয়েছে। এই আইন পাস হওয়ার পর আমাদের দুটি উচ্চ পর্যায়ের সফর বাতিল হয়েছে। আমি মনে করি, সেটি ভারতের প্রতি আমাদের একটি বার্তা বহন করে। আমার মনে হয়, বিষয়টিকে আমরা যে ভালোভাবে নিইনি, তার বার্তা ভালোভাবেই প্রকাশ পেয়েছে।
দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কেমন হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
মো. তৌহিদ হোসেন : বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বহুমাত্রিক। কোনো একটা ঘটনার কারণে এটা উল্টে পাল্টে যাবে না। এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিন্ত রয়েছি। ভারতের যত উদ্বেগ ছিল, গত দশ বছরে তা আমরা দূর করতে পেরেছি। সে তুলনায় ভারতের কাছ থেকে দৃশ্যমান কিছু পাচ্ছি না। আমরা আশা করব যে ভারত আমাদের উদ্বেগগুলো দূর করবে। এই দূরীকরণের মধ্য দিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে।
দেশ রূপান্তর : ভারতের সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ কি বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে পারে?
মো. তৌহিদ হোসেন : এটার ঝুঁকি তো আছেই। ভারতে সাম্প্রদায়িকতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে, তার সুযোগ নিতে পারে এদেশের কিছু সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন মানুষ। এ ব্যাপারে আমাদের সাবধান থাকতে হবে। আমাদের এখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যেন বিনষ্ট না হয়, সেজন্য সজাগ থাকতে হবে। সতর্ক থাকতে হবে।
দেশ রূপান্তর : দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ দেশই এখন চীনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। ভারতের বর্তমান পরিস্থিতির ফলে বাংলাদেশেরও কি চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে?
মো. তৌহিদ হোসেন : না, এটা আমার মনে হয় না। প্রত্যেক দেশেরই ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান আলাদা। পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের যে সম্পর্ক, তা বাংলাদেশের পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়। চীনের সঙ্গে আমাদের কোনো সীমান্ত নেই। দ্বিতীয়ত, আমরা তিনদিক থেকে ভারত দ্বারা বেষ্টিত। এবং ভারতের সঙ্গে আমাদের অনেক স্বার্থ জড়িত। কাজেই ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক থাকবে, ভারতকেও আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হবে। এভাবেই জিনিসটা থাকবে। আমি মনে করি না যে চীন ও ভারতের মধ্যে কোনো বড় ধরনের দ্বান্দ্বিক অবস্থান রয়েছে। বস্তুত, অনেক সময়ে তো চীন-ভারত একসঙ্গে আমাদের স্বার্থের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যে রোহিঙ্গা ইস্যু, তাতে তো চীন ও ভারত একইসঙ্গে আমাদের স্বার্থের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আমাদের পক্ষে তো কেউই অবস্থান নেয়নি। তাই আমাদের এভাবে চিন্তা করলে চলবে না যে শুধু ভারত বা শুধু চীনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখব। তাই আমাদের উভয়ের সঙ্গেই সম্পর্ক রাখতে হবে। যে বিষয়টি আমরা বিবেচনা করব, সেটা হলো কখন কতটুকু প্রয়োজনে আমরা কার সঙ্গে কী রকম সম্পর্ক রাখব।