নিত্যপণ্যের দামে আগুন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নিন

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, তিনি আগুনের ওপর বসে রয়েছেন এবং দাম নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ না থাকা ও ব্যবসায়ীদের পক্ষ নেওয়ায় মানুষ তার পদত্যাগ চাচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। সন্দেহ নেই যে, তার এই বক্তব্যে ভোগ্যপণ্যের নিয়ন্ত্রণহীন বাজার পরিস্থিতি ও জনমতের প্রতিফলন রয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রীকে নিয়ে মানুষ কেন এমন ভাবছে, সে উত্তরও খুঁজে পাওয়া যাবে ভোগ্যপণ্যের বাজারদর নিয়ে তারই মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বার্ষিক পর্যালোচনায়। গত এক বছরে ভোগ্যপণ্যের বাজারদর তুলনা করে ওই পর্যালোচনা তৈরি করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এতে দেখা যাচ্ছে, গত এক বছরে পেঁয়াজ, রসুন, চিনি, সয়াবিন তেল, মসুর ডাল ও নানা সুস্বাদু মসলার দাম সাড়ে চার শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ১৬৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। পেছনে ফেলে আসা ২০১৯ সালে পেঁয়াজের আকাশছোঁয়া দাম নিয়ে তুমুল হইচই হয়। তবে শুধু পেঁয়াজই নয়, অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিতেও মারাত্মক চাপে পড়েছে সাধারণ মানুষ। তিন মাস পর আসন্ন রমজানকে ঘিরে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি তাই বছরের শুরুতেই সামনে চলে এসেছে।

শুক্রবার দেশ রূপান্তরের ‘রান্না সুস্বাদু করার সবকিছুই চড়া’ শিরোনামের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে গত এক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা ভোগ্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি। ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বরের সঙ্গে ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বরের ভোগ্যপণ্যের বাজারদর তুলনা করে ওই পর্যালোচনা তৈরি করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এতে দেখা যাচ্ছে, কেবল পেঁয়াজ-রসুনই নয়, রান্না সুস্বাদু করতে ব্যবহৃত ভোজ্য তেল, লবণ, আদা, জিরাসহ অন্যান্য মসলার দামও এক বছরে অনেক বেড়েছে। গরিবের আমিষ নামে পরিচিত মসুর ডালের দামও তথৈবচ। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, এক বছরের ব্যবধানে পেঁয়াজের বাজারদর ১৬৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ বেড়েছে। এক বছর আগে পেঁয়াজের কেজি ছিল ২৫ থেকে ৩৫ টাকা। এখন টিসিবির হিসাবে, প্রতি কেজি আমদানি করা পেঁয়াজের দর ৫৫ থেকে ১২০ টাকা, আর দেশি নতুন পেঁয়াজের দাম ১২০ থেকে ১৩০ টাকা কেজি। এই সময়ে সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে ৭ দশমিক ৪১ শতাংশ। আর টিসিবির হিসাবে, এক বছরে খোলা সয়াবিনের দাম বেড়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ। একই সময়ে রসুনের দাম বেড়েছে ১৭৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। অথচ দেশে রসুনের কোনো ঘাটতি নেই। দেশে লবণের কোনো ঘাটতি নেই এবং লবণ আমদানিও করতে হয় না। তথাপি লবণের দাম বেড়েছে প্রায় ৫ শতাংশ। জিরার দামও প্রায় ৪ শতাংশ বেড়েছে এক বছরে। ছোট এলাচের দাম বেড়েছে ১৪০ শতাংশ ও দারুচিনির বেড়েছে ৩১ শতাংশের মতো। তবে একমাত্র ব্যতিক্রম হিসেবে লবঙ্গের দাম কমেছে ৩০ শতাংশের বেশি।

নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণের বাজারদর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বৃহস্পতিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বৃহৎ ব্যবসায়ী গ্রুপের প্রতিনিধি, আমদানিকারক, পাইকারি ব্যবসায়ী এবং সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বছরের শুরুতেই এমন একটি বৈঠক আশাব্যঞ্জক বটে। তবে, বৈঠকের যে বিবরণী সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে তা খুবই কৌতূহলোপদ্দীক। সংসদীয় কমিটির সভাপতি ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ধরপাকড় বা কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে বাজারে পণ্যমূল্য স্বাভাবিক রাখা যাবে না। ব্যবসায়ীদের আপন করে নিতে হবে।’ অন্যদিকে, বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমি একজন ব্যবসায়ী। সেজন্য সবাই বলছে আমি ব্যবসায়ীদের পক্ষ নিচ্ছি।’ সাবেক ও বর্তমান দুই মন্ত্রীই ব্যবসাবান্ধব সরকারের কথা উল্লেখ করে, মাত্রাতিরিক্ত মুনাফা করে রাতারাতি বড়লোক হওয়ার চেষ্টা না করতে ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানান। কিন্তু ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, চিনি, ভোজ্য তেলে ভ্যাট-ট্যাক্স কমিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। আদা, রসুন, ডাল, চিনির কোনো ঘাটতি নেই। তবে ডলারের দাম বেড়ে গেছে, ভোক্তাদেরও কম দামে পণ্য দিতে হবে। আবার ভ্যাট-ট্যাক্সও বেশি দিতে হবে। এই ত্রিমুখী নীতি থেকে সরকারকে বেরিয়ে আসতে হবে। তা না হলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বাঁচবে না। সভার এই আলোচনা থেকে এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, ব্যবসাবান্ধব সরকার তাহলে অসৎ ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফার রাশ টেনে ধরতে ‘লাঠি না ভেঙে সাপ মারার’ কৌশলটি বের করতে পারছে না কেন?

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, সঠিক তদারকি ও প্রশাসনিক শিথিলতার সুযোগ নিয়ে কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বাজারের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করার অপপ্রয়াস চালিয়ে থাকে। কারসাজি বা সিন্ডিকেটের এমন তৎপরতায় যেমন ভোক্তাস্বার্থ ক্ষুণœ হয়, তেমনি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও পড়ে এর বিরূপ প্রভাব। এছাড়া পেঁয়াজ, রসুন, চাল, ডাল, তেল, নুনের মতো নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবও অনেক। এ অবস্থায় নিত্যপণ্যের দামে আগুন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।