ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সর্বাত্মক যুদ্ধ কি হবেই

ইরাকে মার্কিন রকেট হামলায় ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল কাশিম সোলেইমানি নিহত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি উঠেছে তা হচ্ছে : এ ঘটনা কি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বাধিয়ে দিতে পারে? এক হিসেবে দেখলে এ ঘটনা ইতিমধ্যেই যুদ্ধের সূচনা ঘটিয়েছে। ইরানি সশস্ত্রবাহিনীর অভিজাত নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বিষয়ক ইউনিট কুদস ফোর্সের প্রধান সোলেইমানির হত্যাকাণ্ড কার্যত যে কোনো বিচারেই যুদ্ধকাণ্ডের শামিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে যে ছায়াযুদ্ধ চলে আসছে তা থেকে এটি একেবারেই আলাদা। ইরানিদের দৃষ্টিতে এটি যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্রবাহিনীর জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ চেয়ারম্যানকে হত্যার নির্দেশ দেওয়ারই সমতুল্য। তবে কয়েক সপ্তাহের পাল্টাপাল্টি উত্তেজনা সৃষ্টির পর সংঘটিত এ মার্কিন হামলা পরিস্থিতিকে কোনদিকে নিয়ে যাবে তা এখনো অস্পষ্ট।

এ ঘটনা সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াবে কি?

বেশিরভাগ বিশ্লেষক বলছেন, জেনারেল সোলেইমানির হত্যাকাণ্ড ইরানের জন্য প্রতিশোধ নেওয়াকে প্রায় অনিবার্য করে তুলবে। এর মূল কারণ জাতীয় গৌরব বা মুখরক্ষা নয়, বরং যে কোনো রাষ্ট্রের মৌলিক প্রবণতা: আত্মরক্ষা। এর মধ্যে পড়ে নিজেদের শীর্ষ নেতৃত্বকে সুরক্ষিত রাখা। ওই নেতাদের কাউকে হত্যা করা কেবল দেশটির কর্তৃত্বকে চপেটাঘাত বা সামরিক সক্ষমতার ওপর আঘাত নয়, এটি খোদ রাষ্ট্রটির কার্যকারিতার ওপর রীতিমতো হুমকি। ইরান এ ঘটনার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য চরম তাগিদ অনুভব করবে। অন্তত এটা দেখাতে যে, তাদের কোনো নেতাকে হত্যা করলে এমন ভয়াবহ পরিণতি হবে যে যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের কাজ দ্বিতীয়বার করা থেকে বিরত থাকবে। তবে সেই প্রতিশোধ কতটা মারাত্মক হবে তার পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন। এ কারণে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশজুড়ে বিরাজ করছে এক অনিশ্চয়তার মেঘ। ইরানের জন্য কাজটা হবে খুবই কঠিন। দেশটি সম্ভবত এমন মাত্রার একটি হামলা চালাতে চেষ্টা করবে যাতে যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পারে এত বড় সামরিক শক্তি হয়ে ইরানের ওই পর্যায়ে আঘাত হানা তাদের উচিত হয়নি। আবার হামলাটা এমন হওয়া যাবে না যাতে করে সর্বাত্মক লড়াই বেধে যায়। ইরান কাজটা সফলভাবে করতে পারলে এর ফলাফল যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য বেশ পীড়াদায়ক হতে পারে। কিন্তু তাতে করে সরাসরি যুদ্ধ লাগবে না। তবে ঠিক কী করলে ইরানের জন্য দুই কূলই রাখা যাবে তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। হিসাব নিকাশে ভুল হলে পরিস্থিতি চলে যেতে পারে নিয়ন্ত্রণের বাইরে। গত মাসের অভিজ্ঞতা ইঙ্গিত দেয়, যুক্তরাষ্ট্র আর ইরান উভয়েই তাদের পাল্টা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে মাপজোক ঠিক রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। একেক পক্ষের নেওয়া ব্যবস্থা অন্যজনকে নমনীয় হতে বাধ্য করার বদলে বরং আরেকদফা তোড়জোড় বাড়াতে উৎসাহিত করছে। এতে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তা আগের চেয়ে এককাঠি বেশি উত্তপ্ত। একভাবে দেখলে, উভয়পক্ষই ইতিমধ্যে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চয়ই চায়নি তাদের বাগদাদ দূতাবাসে হামলা হোক। ইরানও তাদের কুদস বাহিনী কমান্ডারের মৃত্যুর জন্য তৈরি ছিল না।

সংঘাত কি অনিবার্য?

ঘটনাপ্রবাহের আরেকটি বৈশিষ্ট্য এর গতিপ্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন করে তুলেছে। মাঝেমাঝেই যুক্তরাষ্ট্রের মতিগতি বোঝা ছিল ভার। দেশটির সরকারি বক্তৃতা-বিবৃতিতে ইরানি হামলা প্রতিহত করার মতো সীমিত লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা কেউ কেউ ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে একঘরে করা এমনকি এর সরকারকে উৎখাত করার মতো ঢালাও ব্যবস্থার কথা বলেছেন। এই অনিশ্চয়তা আর যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বেশি সামরিক শক্তির কারণে ইরানি নেতারা মরিয়া হয়ে সবচেয়ে খারাপ কিছু ঘটিয়ে ফেলতে চাপের মুখে থাকতে পারেন। অস্তিত্বের হুমকির মুখে থাকা যে কোনো দেশের সামনে দুটি পথই থাকে। নত হয়ে আলোচনায় বসা বা হুমকির উৎসকে এমনভাবে আঘাত করা যাতে সে পিঠটান দেয়। সর্বশেষ ২০১৫ সালেই ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক অবরোধ থেকে রেহাই পেতে দেশটি এর আওতায় তার পরমাণু কর্মসূচির অধিকাংশ বন্ধ করে দেয়। তখন ইরানকে আশ্বস্ত করতে যুক্তরাষ্ট্র বেশ চেষ্টা তদবির করে তাদের বুঝিয়েছিল যে এ উদ্যোগ নিয়ে ইরান বিপদে পড়বে না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্টের হুটহাট নীতি পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক মতামতের প্রতি উপেক্ষা আর চুক্তি থেকে সরে আসার ঝোঁক (ইরানের সঙ্গে আলোচিত চুক্তিসহ) হয়তো ইরানের হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়ে থাকতে পারে। তারা হয়তো মনে করছে, প্রতিশোধের সম্ভাবনা ঝুলিয়ে রাখাই হবে নিরাপদ কৌশল।

সম্ভাব্য সংঘাতের চেহারা যেমন হতে পারে

ইরান একটি বড় আঞ্চলিক শক্তি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র যেসব দেশের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে তাদের যে কোনো দেশের চেয়ে ইরানের সামরিক সক্ষমতা বেশি। এর সঙ্গে সাদ্দাম হোসেনের নড়বড়ে ইরাক বা উত্তর ভিয়েতনামের অপেশাদার বাহিনীর তুলনাই হয় না। তাছাড়া সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য বছরের পর বছরের প্রস্তুতি রয়েছে দেশটির। ইরানের আক্রমণাত্মক তৎপরতাগুলো ছকবাঁধা না হয়ে এলোমেলো ধরনের হবে বলেই মনে হয়। অর্থাৎ মার্কিন বাহিনী, তাদের মিত্র বা অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপর বিক্ষিপ্ত ক্ষুদ্র আকারের ছায়া হামলা চালাতে পারে তারা। অতীতে দেশটি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার ব্যাপারেও আগ্রহ দেখিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের শত্র“রা ছোটখাটো বিক্ষিপ্ত হামলা চালিয়ে ওয়াশিংটনকে নত করার ক্ষেত্রে সাফল্য পায়নি বললেই চলে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রও এ ধরনের হামলা ঠেকানোর কোনো নির্ভরযোগ্য পন্থা খুঁজে পায়নি। সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটা সম্ভবত এখানেই যে, ইরানের বিক্ষিপ্ত ছায়াযুদ্ধের কৌশল কোনো বিশেষ পর্যায়ে পৌঁছলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সরাসরি আঘাত করতে প্ররোচিত হবে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এর ফলে সরাসরি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ বেধে যেতে পারে। তবে এটা ঘটার আশঙ্কা কতটা কেউ তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। ইরান অস্ত্রের জোরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পেরে উঠবে সে সম্ভাবনা খুব কম। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, দেশটির প্রচলিত বাহিনী স্থলযুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতির পরিমাণ বাড়িয়ে তুলবে। এছাড়া ইরানের মাঝারিপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সম্ভার বেশ সমৃদ্ধ যা মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি বা মিত্রদের আঘাত হানতে পারে।

সংঘাতের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে কি?

ইরান তার হয়ে ছায়াযুদ্ধ চালাতে লেবানন, ইয়েমেন, ইরাক ও সিরিয়ার মিলিশিয়াদের ডাক দিতে পারে। তবে কোনো দেশের সরকার তাদের হয়ে সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী হবে না। মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা (ইসরায়েল আর সৌদি আরবের মতো উপসাগরীয় দেশগুলো) ইরানের হামলার সরাসরি শিকার না হলে এ যুদ্ধে যোগ দেবে বলে মনে হয় না। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে কোনো একটিকে বেছে নেওয়ার জন্য ইরাকের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। মার্কিন সেনারা ইরাক ছাড়তে বাধ্য হলে ইরাকের উল্লেখযোগ্যরকম শক্তিশালী অবস্থানটি খোয়াবে যুক্তরাষ্ট্র। এতে সেখানে ইরানের প্রভাব আরও বাড়তে পারে। অনিচ্ছাকৃত যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব না হলেও ঘটনার পর পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কার কথা বলাবলি হয়েছে তা অতিরঞ্জিত। রাশিয়া ও চীন ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জোর বিরোধিতা করতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণ বা লিবিয়ার সরকার পতনে সহায়তা করার ঘটনার সময় যেমন ছিল তেমনি কার্যত নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে তারা। 

কোনো পক্ষই কি পরবর্তী পর্যায়ের জন্য প্রস্তুত?

এবারের উত্তেজনা বৃদ্ধির ঘটনাটি এমনই আচমকা যে, ট্রাম্প সরকার এর সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে কতটা ভাবনাচিন্তা করেছে তা বলা কঠিন। প্রাথমিক লক্ষণগুলো বলছে, ট্রাম্পের স্বভাবগত হুজুগেপনা এর পেছনে দায়ী হয়ে থাকতে পারে। ইউরোপীয় মিত্রদের আগে থেকে জানানো হয়েছিল কি না তা স্পষ্ট নয়। এমনকি ইসরায়েলি নেতারাও অপ্রস্তুত ছিলেন বলেই মনে হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়ার ব্যাপারে ইরানের আগ্রহ (মার্কিন হুমকির যে মাত্রা তাতে আর কোনো উপায়ই নেইÑ এ ধারণা হতে পারে তার কারণ) সব পক্ষের জন্য বিপদ বাড়িয়ে তুলেছে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকির বিষয়টা কিন্তু নেহাতই রাজনৈতিক নয়, মানবিকও। ইরান যে শুধুমাত্র এক প্রতিপক্ষ নয়, তা ৮ কোটি বেসামরিক মানুষের এক দেশ তা ভুলে যাওয়া মার্কিনিদের জন্য সহজ হতে পারে। ইরানিদের অনেকেই ইতিমধ্যে অবরোধের জাঁতাকলে পিষ্ট। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছায়াযুদ্ধ চলার সম্ভাবনা রয়েছে বলে আরও লাখো মানুষ ঝুঁকির মুখে পড়বে। বরাবরের মতো এ ক্ষেত্রেও ওই সাধারণ মানুষকেও সম্ভাব্য সংঘাতের দুঃসহ বোঝাটি বইতে হবে।

লেখক : আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত, কূটনীতি, সামাজিক পরিবর্তনসহ বিষয়ের লেখক ও নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর কলামনিস্ট।

নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে ভাষান্তর: আবু ইউসুফ