হলফনামার তথ্য যাচাই করবে কে?

উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পর জাতীয় সংসদসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, আয়ের উৎস ও ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতাসহ আট ধরনের তথ্য নিলেও তা যাচাই-বাছাই করছে না নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ কারণে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটিতে প্রার্থীদের দেওয়া হলফনামার তথ্যের সত্যতা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। আসন্ন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দুই মেয়র প্রার্থী হলফনামায় মার্সিডিজ বেঞ্জ, টয়োটা প্রাডো, মিৎসুবিশি পাজারো, লেক্সাস জিপসহ চারটি গাড়ির মূল্য উল্লেখ করেছেন ২৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এ ছাড়া কোটিপতি অন্য দুই মেয়র প্রার্থী বলেছেন, তাদের ব্যক্তিগত কোনো গাড়ি নেই। প্রার্থীদের হলফনামার এসব তথ্য নিয়েও মানুষের মনে দেখা দিয়েছে সন্দেহ। হলফনামার তথ্য কে যাচাই-বাছাই করবে—এ বিষয়ে ইসিসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে কোনো সদুত্তর মেলেনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনে হলফনামায় মিথ্যা বা ভুল তথ্যের জন্য মনোনয়নপত্র বাতিলের বিধান আছে। এমনকি নির্বাচিত হওয়ার পরও প্রার্থিতা বাতিলের সুযোগও রয়েছে ইসির। কিন্তু রাজনৈতিক চাপের কারণে ইসি বরাবরই বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার গাড়ির দামের তুলনামূলক পার্থক্যের তথ্য তুলে ধরে নির্বাচন কমিশনার (ইসি) রফিকুল ইসলাম গত শুক্রবার সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গাড়ির এই মূল্য কীভাবে জাস্টিফাই করবেন?’ তিনি আরও বলেন, ‘রিটার্নিং অফিসারের টেকনিক্যাল নলেজ নেই এবং আইনও পারমিট করে না। তবে কারও অভিযোগ থাকলে দুদকের কাছে আবেদন জানাতে পারে। তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখবে।’ সময় স্বল্পতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, ‘এক দিনের মধ্যে এ কাজ করা সম্ভব নয়।’

২০০৫ সালের ২৪ মে এক রিট আবেদনের নিষ্পত্তি করে প্রার্থীদের ইসিতে আট ধরনের তথ্য সরবরাহের নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। এরপর এ সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৬ সালের ১৯ ডিসেম্বর হাইকোর্টের রায় স্থগিত করেন আপিল বিভাগের অবকাশকালীন চেম্বার বিচারপতি। পরে ২০০৭ সালের ১১ ডিসেম্বর আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ ওই আপিল খারিজ করে দেয়। ফলে হাইকোর্টের রায় বহাল থাকে। এরপর ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ (আরপিও) সংশোধন করে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রার্থীদের আট তথ্যসহ হলফনামা জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়।

এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রার্থীরা হলফনামায় যে তথ্যগুলো উল্লেখ করেন, সেগুলোর সত্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। এগুলো তো গ্রহণযোগ্য তথ্য নয়। ইলেকশন কমিশন যদি এগুলো না দেখে তাহলে কোনো লাভ নেই। এই হলফনামার কোনো দরকার নেই।’ এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায় রয়েছে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘দুদকের দায় নেই। কিন্তু দুদক বিষয়গুলো দেখতে পারে।’

ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনের প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দক্ষিণ সিটিতে জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী সাইফুদ্দিন আহম্মেদ মার্সিডিজ বেঞ্জ, টয়োটা প্রাডো, মিৎসুবিশি পাজেরো জিপের মতো বিলাসবহুল তিনটি গাড়ির মূল্য উল্লেখ করেছেন মাত্র ১৭ লাখ টাকা। আর স্ত্রীর নামে বিএমডব্লিউ, নিশান ও ব্লু-বার্ড গাড়ি রয়েছে—হলফনামায় এ তথ্য দিলেও এর দাম উল্লেখ করেননি তিনি। ২০১৫ সালের সিটি নির্বাচনের সময় দেওয়া হলফনামায়ও নিজের ও স্ত্রীর নামে ওই ছয়টি গাড়ির তথ্য উল্লেখ করেছিলেন সাইফুদ্দিন।

এদিকে ব্যবসায়ী আবদুল আউয়াল মিন্টুর ছেলে ও ৩৭টি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ঢাকার উত্তর সিটিতে বিএনপির মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল। হলফনামায় তিনি লেক্সাস জিপের মূল্য দেখিয়েছেন ৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এর আগে ২০১৫ সালে উত্তর সিটি নির্বাচনের সময় কোনো গাড়ি ছিল না বলে হলফনামায় বলেছিলেন তাবিথ।

তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও ১৬টি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার উত্তর সিটির সাবেক মেয়র ও এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আতিকুল ইসলাম ব্যক্তিগত কোনো গাড়ি নেই বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন।

দক্ষিণ সিটিতে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ইশরাক হোসেন চারটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ও একটি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী।

হলফনামায় ব্যক্তিগত কোনো গাড়ি নেই বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। অবিভক্ত ঢাকা সিটির প্রয়াত মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাক ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। তখনো হলফনামায় ব্যক্তিগত কোনো গাড়ি নেই বলে জানিয়েছিলেন ইশরাক।

দক্ষিণ সিটিতে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপসের রয়েছে তিনটি গাড়ি। ঢাকা-১০ আসনের সাবেক এই সাংসদ হলফনামায় গাড়িগুলোর মূল্য উল্লেখ করেছেন ১ কোটি ৬৬ লাখ ৭৩ হাজার ৫২৫ টাকা। আর স্ত্রীর নামে থাকা একটি গাড়ির মূল্য দেখিয়েছেন ১ কোটি ৬২ লাখ টাকা। হলফনামায় তাপস নিজের ও তার স্ত্রীর নামে থাকা চারটি গাড়ির মূল্য উল্লেখ করেছেন ৩ কোটি টাকারও বেশি। তবে গাড়িগুলোর ব্র্যান্ড ও মডেল উল্লেখ করেননি তিনি।

এর আগে ২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচনের আগে ইসিতে দেওয়া হলফনামায় নিজের ও স্ত্রীর কোনো গাড়ি নেই বলে জানিয়েছিলেন ব্যারিস্টার তাপস। পরে ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনের সময় দেওয়া হলফনামায় তাপস ব্যক্তিগত তিনটি গাড়ির মূল্য ১ কোটি ৬৬ লাখ ৭৩ হাজার ৫২৫ টাকা উল্লেখ করেন। তবে তখনো গাড়ির ব্র্যান্ড ও মডেল উল্লেখ করেননি তিনি। সে সময় স্ত্রীর একটি গাড়ির তথ্যও উল্লেখ করেছিলেন তাপস। কিন্তু ওই গাড়িটিরও ব্র্যান্ড, মডেল ও মূল্য উল্লেখ করা হয়নি।

স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) নির্বাচন বিধিমালা-২০১০ অনুসারে, হলফনামার মাধ্যমে কোনো প্রার্থী তথ্য না দিলে, অসত্য তথ্য দিলে বা তথ্য গোপন করলে রিটার্নিং কর্মকর্তা নিজ উদ্যোগে অথবা কারও আপত্তি আমলে নিয়ে তদন্ত করতে ও মনোনয়নপত্র বাতিল করতে পারবেন। এ ছাড়া মিথ্যা বা ভুল তথ্য প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইনে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত হবে। সিটি করপোরেশন নির্বাচন পরিচালনার জন্য প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত ম্যানুয়েলে বলা আছে, প্রার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ভোটারদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে। লিফলেট আকারে ভোটারদের মধ্যে তা বিতরণ করতে হবে। তবে হলফনামার তথ্য যাচাই-বাছাইয়ে ইসির তরফ থেকে এখনো কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।