বাঙালির জীবন মাছে-ভাতে। এই মাছ ও ভাত উভয়ই আনে নদী। বাংলার জমিতে ধান, গাছে ফল, নদীতে মাছ। বাঙালি জন্মে তাই জ্ঞান হওয়ামাত্র সবার আগে যাকে চেনে, সে তার নদী। এই নদী তার বাড়ির অনতিদূরে, একটি সীমানা, তার চলাচলের পথে। সাঁকো বা নৌকায় পার হতে হয়। এই সেই নদী যাকে নিয়ে সে গল্প শোনে বুড়োদের মুখে। কী ছিল তার রূপ, কী ছিল তার স্রোত। কোনো এক অতীতে, বর্ষাকালে। এখন বর্ষাকালে পানি থাকলেও শীতকালে প্রায় পুরোটাই ধানক্ষেত। নদীর পেটের মধ্যে সামান্য এক ধার ঘেঁষে স্রোত চলে, নৌকা চলে। অনেকের বাড়ির কাছে এমন নদী আছে যেখানে বছরব্যাপী নৌকো চলত, তবে এখন কেবল বর্ষাকালেই চলে। বাংলার আদি রূপ ছিল নদীময়, জলময়, আর বনময়। বাংলার সেই আদি রূপ আর নেই। বাংলার অতীতের যত সব নদনদী, খালবিল তাদের বেশিরভাগই এখন মৃত। এসব মরে গেছে যতটা না প্রাকৃতিক কারণে, তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষেরই কারণে। যেসব ধারা বা জলা এখনো অবশিষ্ট আছে তাদের অনেকগুলোই কেবল বর্ষাকালে জেগে ওঠে। সেখানে বৈশাখে নয়, বর্ষায় হাঁটুজল থাকে। বৈশাখে তারা একেবারেই মৃত।
বাংলাদেশের মোট নদনদী
বাংলাদেশে মোট নদীর সংখ্যা ১১৮২ (বাংলাদেশের নদনদী, ম ইনামুল হক, অনুশীলন, জুলাই ২০১৭)। প্রধান ও মাঝারী নদী ৩৬০, ছোট নদী ৮২২। বাংলাদেশের ভূখ-কে চারটি নদী অববাহিকা তথা গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা ও দক্ষিণ-পূর্ব নদীসমূহের অববাহিকায় ভাগ করা হয়। বাংলাদেশের বাইরে ভারত থেকে দেশের ভেতরে প্রবেশ করা গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র দুটি বড় নদী। এছাড়াও প্রায় ১৫০টির অধিক নদী ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশে বাহির থেকে যেসব নদী প্রবেশ করেছে তাদের প্রবাহ উৎস ও প্রবাহপথ তথা অববাহিকা ভারত, চীন, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার জুড়ে বিস্তৃত। বাংলাদেশসহ এর মোট এলাকা ১৭,৪৯,০০০ বর্গ কিলোমিটার। বাংলাদেশের এলাকা ১,৫০,০০০ বর্গ কিলোমিটার যা মোট এলাকার ৮.৫৭ শতাংশ মাত্র।
তবে বাংলাদেশ মৌসুমি বায়ুর দেশ। এর ফলে গ্রীষ্ম, বর্ষা ও শরৎকালে এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। বাংলদেশে গড় বৃষ্টিপাত ২৩০০ মিলিমিটার। এর ফলে বাংলাদেশের ভেতরেই ১,১০০-এর বেশি নদীর প্রবাহ আছে। বাংলাদেশের বাহির থেকে আসা ও ভেতরে বৃষ্টিপাতের ফলে মোট ১,০৯৪ মিলিয়ন একর ফিট বা ১,৩৫০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার জলসম্পদ উৎপন্ন হয়। বাংলাদেশের স্থানীয় উৎপাদন ২৭৬ মিলিয়ন একর ফিট (২৫%) ও বাহির থেকে আসে ৮১৮ মিলিয়ন একর ফিট (৭৫%) বাংলাদেশে প্রায় ২৫,০০০ কিলোমিটার এর বেশি নদীপথ এবং বাংলাদেশের ভূভাগের দক্ষিণে প্রায় ২৫০ নটিক্যাল মাইল দীর্ঘ মহীসোপানে পলিপাতন ও মৎস্য ক্ষেত্রের জন্য এই পানির প্রবাহ অতীব জরুরি।
বাংলাদেশের মোট জলক্ষেত্র
বাংলাদেশ ভূখণ্ডে নদী ও মোহনা ১০,৩২,০০০ হেক্টর , বিল ও হাওর ১,১৪,০০০ হেক্টর, কাপ্তাই লেক ৬৮,০০০ হেক্টর, প্লাবিত ভূমি ২৮,৩৩,০০০ হেক্টর, মোট উন্মুক্ত জলক্ষেত্র ৪০,৪৭,০০০ হেক্টর। এ ছাড়াও পুকুর ২,১৫,০০০ হেক্টর, বাঁওড় ৫,০০০ হেক্টর, উপকূলীয় জলাশয় ১,৪১, ০০০ হেক্টর, মোট বদ্ধ জলক্ষেত্র ৩,৫১,০০০ হেক্টর।
নদী ও পানির ওপর অধিকার
সুপেয় পানি মানুষের মৌলিক অধিকার, বেঁচে থাকার জন্য জন্মগত অধিকার। এই সুপেয় পানির উৎস আমাদের নদীগুলো হাজার হাজার বছর ধরে প্রবাহিত হচ্ছে। এর ওপর আমাদের জনবসতি, কৃষি, অর্থনীতি এবং যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। তাই নদীতে পানির প্রবাহ থাকাটা আমাদের ঐতিহাসিক অধিকার। কিন্তু এই অধিকার হরণ করা হয়েছে।
প্রথমত, উজানে অবস্থিত ভারত আন্তর্জাতিক নদীগুলোর ওপর ব্যারাজ নির্মাণ করে পানি সরিয়ে নিয়ে তাদের সেচ প্রকল্পে নিচ্ছে ও নৌপথ সচল রাখার কাজে ব্যবহার করছে। দ্বিতীয়ত, খরার সময় অভ্যন্তরীণ নদীগুলোর প্রবাহের ওপর মাটির বাঁধ দিয়ে পানি তুলে নিয়ে সেচকাজে লাগানো হচ্ছে। তৃতীয়ত, নদীর হাঁটুজল প্রবাহের উৎস বিল ও জলাশয়গুলোকে অতি নিষ্কাশন করে চাষের আওতায় আনা হয়েছে। চতুর্থত, সারা দেশে নলকূপ বসিয়ে সেচের জন্য পানি অতিউত্তোলন করে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামিয়ে ফেলা হয়েছে। পঞ্চমত, নদীগুলোর পাড়ের খাসজমি দখল করে ও ভরাট করে বাড়িঘর এবং অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। ষষ্ঠত, নদী খাল ও জলাভূমিতে শিল্পবর্জ্য ও শহুরে কঠিন বর্জ্য ফেলে ভরাট করা ও চরমভাবে দূষিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার
বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৭ সালে টাঙ্গুয়ার হাওর ও সুন্দরবনকে বন্যপাখী সংরক্ষণ করার জন্য ‘রামসার সাইট’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশ সরকার ২০০০ সালে হাকালুকি হাওরকে জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য ‘পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকা’ (Environmentally Critical Area) ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশ সরকার প্রণীত জাতীয় পানিনীতি ১৯৯৯ এর ৪.১৩ ধারায় হাওর, বাঁওড় এবং বিলগুলোর গুরুত্ব বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে, এবং এগুলো সংরক্ষণের জন্য সরকারের নীতি বিবৃত করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার তার পানি আইন ২০১৩ এর ২০ ধারায় ভূ-উপরিস্থ জলস্রোতের স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ২২ নম্বর ধারায় অতিথি পাখিদের নিরাপদ অবস্থানের জন্য জলাধার সংরক্ষণ করতে বলা হয়েছে। ২৬ ধারায় প্রাকৃতিক জলাধারকে কোনোমতেই নিঃশেষ না করতে বলা হয়েছে।
নদীর জল ও মানবাধিকার
নদীর জল তথা প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত জলের ওপর মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো হচ্ছে পান, রান্না, স্নান, যাপন, গৃহপালিত জীবের চাহিদা। এছাড়াও মানুষের কিছু ঐতিহাসিক অধিকার আছে, যথা: বছরব্যাপী প্রবাহ, বাৎসরিক প্রবাহ পানির গুণ, মাছ, কৃষি ও নৌ চলাচল। প্রাকৃতিকভাবে প্রবাহপথ পরিবর্তন, উৎসমুখ বন্ধ হলে মানুষ এই অধিকার হারায়। তবে প্রাকৃতিক এই পরিবর্তন ধীরে ধীরে হয় বিধায় মানুষ তাতে সয়ে নেয় বা বসতির স্থান পরিবর্তন করে বেঁচে থাকে। অপ্রাকৃতিক পরিবর্তন বা মনুষ্যসৃষ্ট বন্যা প্রতিরোধ বাঁধ, বর্জ্য, দূষণ/ভরাট/দখল, ড্যাম ও ব্যারাজ নির্মাণ, অতি নিষ্কাশন নদীগুলোকে মেরে ফেলে ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় সৃষ্টি করে।
নদী ও জলাভূমি রক্ষা
বাংলাদেশে আইনের মাধ্যমে সৃষ্ট ‘বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড’ ও ‘বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর’ এর কর্মকা-ে বা ভূমি অধিদপ্তরের ‘জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতি ২০০৯’ কোনোটাতেই জলাভূমি সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নেই। ২০১৩ সালের ‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন’ করা হয়, কিন্তু এর ধারা ১২ অনুযায়ী এর কার্যাবলি সরকারের কাছে নানা বিষয়ে সুপারিশ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ করা হয়েছে।
নদী ও জলাভূমি দূষণরোধ
বাংলাদেশে ১৯৯৫ সালে ‘বাংলাদেশ পরিবেশ আইন’ করা হয়, যে আইনটি ২০১০ পর্যন্ত সংশোধন করেও নদীদূষণ রোধে অকার্যকর রয়ে গেছে। এই আইন অনুযায়ী বর্জ্য দূষণকারীর বিরুদ্ধে মামলা একমাত্র পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকই করতে পারবেন। ১৯৯৫ সালে এর ১৭ নম্বর ধারায় বলা ছিল, ‘মহাপরিচালক হইতে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তির লিখিত অভিযোগ ছাড়া কোনো আদালত এই আইনের অধীন কোনো মামলা বিচারের জন্য গ্রহণ করিবেন না।’ ২০১০ সালে আইনটির ১৭ নম্বর ধারা সংশোধন করে বলা হয়েছে, ‘এই আইন বা তদধীন প্রণীত বিধি লঙ্ঘনের ফলে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী, জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হইলে উক্ত ব্যক্তি, গোষ্ঠী, ক্ষতিগ্রস্ত জনগণ অথবা তাহাদের পক্ষে মহাপরিচালক পরিবেশ আদালতে মামলা দায়ের করিতে পারিবেন।’ এর ফলে শহরের ও শিল্পাঞ্চলের গৃহস্থালি ও শিল্প বর্জ্যে নদীদূষণ নিয়ন্ত্রণহীন ও বাধাহীনভাবে বেড়েই চলছে। বর্জ্য দূষণরোধে মামলা করার ক্ষমতা অন্ততপক্ষে স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের ওপর ন্যস্ত করা দরকার। তবে, প্রকৃতপক্ষে এ বিষয়ে যে কোনো সংক্ষুব্ধ নাগরিকেরই মামলা করার অধিকার থাকা দরকার।
লেখক
প্রকৌশলী ও চেয়ারম্যান
জল পরিবেশ ইনস্টিটিউট
minamul@gmail.com