ড্রোন হামলায় ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সুলেইমানি নিহতের প্রতিশোধ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনায় সামরিক হামলা চালানো হবে। গতকাল রবিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির সামরিক উপদেষ্টা হুসেইন দেঘান সিএনএন’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন।
দেঘান বলেন, ‘সামরিক স্থাপনার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানই চালানো হবে। আমাদের নেতৃত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণায় বলেছেন, আমরা কখনো যুদ্ধ চাইনি এবং চাইবও না। এই যুদ্ধ শুরু করেছে আমেরিকা। তাদের কর্মের প্রতিক্রিয়া তাদের গ্রহণ করা উচিত। এই যুদ্ধের সমাপ্তি হতে পারে মাত্র এক উপায়েই। আমেরিকানরা যে ধাক্কা দিয়েছে, তার সমান ধাক্কা তাদেরও গ্রহণ করতে হবে। এরপর তাদের উচিত হবে না একই চক্রের পুনরাবৃত্তি করা। আমেরিকার কোনো সামরিক কর্মকর্তা, রাজনৈতিক কেন্দ্র, সামরিক ঘাঁটি ও কোনো আমেরিকান নৌযান নিরাপদ থাকবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘ট্রাম্প আন্তর্জাতিক আইন জানেন না। তিনি জাতিসংঘের
প্রস্তাবনাকেও স্বীকৃতি দেন না। মূলত তিনি একজন সত্যিকারের গুণ্ডা ও জুয়াড়ি। তিনি কোনো রাজনীতিক নন। তার মানসিক স্থিতিশীলতা নেই।’
গতকাল তেহরানের প্রতিক্রিয়ার আগে এক টুইটবার্তায় ইরানকে হুঁশিয়ারি দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদে আঘাত করবে। কিন্তু এমনটা হলে আমরা দ্রুত এবং মারাত্মকভাবে ইরানের ওপর হামলা চালাব। এমন ৫২টি স্থাপনা লক্ষ্য করে রেখেছি আমরা। যুক্তরাষ্ট্র কোনো হুমকির মুখোমুখি হতে চায় না।’
ট্রাম্পের ওই হুঁশিয়ারির পর এ নিয়ে কথা বলেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ। গতকাল টুইটারে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, সাংস্কৃতিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা একটি যুদ্ধাপরাধ।
ইরাকি নিরাপত্তাকর্মীদের যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি থেকে কমপক্ষে এক কিলোমিটার দূরে থাকার পরামর্শ দিয়ে নির্দেশনা জারি করেছে ইরাকের ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া গ্রুপ কাতাইব হিজবুল্লাহ। গত শনিবার ওই নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। নির্দেশনায় স্থানীয় সময় গতকাল রবিবার বিকেল ৫টা থেকে ইরাকি নিরাপত্তাকর্মীদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
বাগদাদের গ্রিন জোনে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের কাছেই গতকাল একটি রকেট আঘাত হেনেছে। এছাড়া গ্রিন জোনের কাছের জাদ্রিয়া এলাকা এবং বালাদ বিমান ঘাঁটি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যরা রয়েছে, সেখানেও রকেট নিক্ষেপ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় কেউ নিহত হয়নি বলে ইরাকের সেনাবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে। তবে জাদ্রিয়ায় অন্তত পাঁচজন আহতের খবর দিয়েছে পুলিশ।
মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত তিন হাজার সেনা পাঠানোর প্রতিবাদে গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের বড় শহরগুলোতে বিক্ষোভ হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য দায়ী করেছেন বিক্ষোভকারীরা। ওয়াশিংটনসহ বেশ কয়েকটি বড় শহরের বিক্ষোভ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্য ছাড়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৮০টি স্থানে বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শনিবার বেশ কয়েকটি বিক্ষোভের আয়োজন করে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরোধী জোট অ্যাক্ট নাউ টু স্টপ ওয়ার অ্যান্ড এন্ড রেসিজম। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় আরও বেশ কয়েকটি সংস্থা। বিক্ষোভ হয়েছে হোয়াইট হাউজের বাইরে, নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কয়ার, শিকাগোর ট্রাম্প টাওয়ারের বাইরেও।
যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে জার্মানির বার্লিন শহরের ব্রান্ডেনবার্গ গেটেও বিক্ষোভ হয়েছে। স্লোগান উঠেছে ‘ন্যায়বিচার নেই, শান্তি নেই, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য ছাড়ো’। ওয়াশিংটনের বিক্ষোভে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন পেন্টাগনের নথি ফাঁস করে দেওয়া হুইসেলব্লোয়ার ড্যানিয়েল এলসবার্গ ও অভিনেত্রী জেন ফন্ডে।
এদিকে ইরাকে দফায় দফায় জানাজা শেষে দেশে পৌঁছেছে ইরানের প্রভাবশালী কুদস ফোর্সের কমান্ডার কাসেম সুলেইমানির মরদেহ। গতকাল ভোরে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় আহওয়াজ বিমানবন্দরে তার মরদেহ পৌঁছায়। এ সময় দেশটির শীর্ষস্থানীয় সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এর আগে গত শনিবার ইরাকের কাজেমাইন, বাগদাদ, কারবালা ও নাজাফ শহরে কাসেম সুলেইমানি এবং তার সঙ্গে নিহত অন্যদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরাকের লাখো মানুষ এসব জানাজায় অংশ নেন।
রবিবার সকালে খুজিস্তান প্রদেশের কেন্দ্রীয় শহর আহওয়াজে জানাজা শেষে তার মরদেহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মাশহাদ নগরীতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ইমাম রেজার মাজার প্রাঙ্গণে আরেক দফা জানাজা হয়। এরপর যথাক্রমে তেহরান, কোম ও জেনারেল সুলেইমানির জন্মস্থান দক্ষিণ ইরানের কেরমান শহরে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সুলেইমানির ইচ্ছা অনুযায়ী নিজ শহর কেরমানে তার দাফন সম্পন্ন হবে বলে জানিয়েছে মিডলইস্ট মনিটর।
গতকাল ইরাকি পার্লামেন্টের জরুরি অধিবেশন বসে সুলেইমানি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়। পার্লামেন্টে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আদেল আবদুল মাহদি বলেন, আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ইরাকের মাটি থেকে সব বিদেশি সৈন্যকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য সরকারকে অবশ্যই একটি সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে। ইরাক কোনো রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড মেনে নিতে পারে না।
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ব্যাপক উত্তেজনার মধ্যে হরমুজ প্রণালীতে ব্রিটিশ পতাকাবাহী জাহাজের সুরক্ষা নিশ্চিতে থাকা দুটি যুদ্ধজাহাজ ফেরত এনেছে যুক্তরাজ্যের নৌবাহিনী। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস ব্রিটিশ নৌবাহিনীর দুটি ডেস্ট্রয়ারকে ফেরতের এ নির্দেশনা দেন বলে দি গার্ডিয়ান জানিয়েছে।