সংকটের আবর্তে তৈরি পোশাক খাত। ক্রমেই এই সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই কমছে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, একের পর এক বন্ধ হচ্ছে কারখানা। ফলে চাকরিচ্যুত হচ্ছে শ্রমিকরা। বেশ কয়েকটি কারণেই এই সংকট আরও বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে মুদ্রা বিনিয়ম হার, বৈশ্বইক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারানো, প্রতিযোগী দেশগুলোর সরকার থেকে নীতি সহায়তা, ব্যবসায়িক ব্যয় বৃদ্ধি অন্যতম। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিকট ভবিষ্যতে খুব ভালো সুসংবাদও নেই। এই অবস্থায় তৈরি পোশাক খাতকে টিকিয়ে রাখতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬ মাসে দেশের রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি কমে ৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এর মূল কারণ তৈরি পোশাক খাত। ২০১৯-২০ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে তৈরি পোশাক খাতে পণ্য রপ্তানি থেকে আয়ে প্রবৃদ্ধি কমেছে ৬ দশমিক ২১ শতাংশ। প্রবৃদ্ধি কমার পাশাপাশি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি তৈরি পোশাক খাত। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ কম আয় হয়েছে।
ইপিবির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত ছয় মাসে নিট পোশাক রপ্তানি থেকে আয় এসেছে ৮২০ কোটি ৫ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের ৫ দশমিক ১৬ শতাংশ কম। একই সঙ্গে লক্ষ্যমাত্রা কমেছে ১০ দশমিক ৪৮ শতাংশ। অন্যদিকে ওভেন পোশাক রপ্তানি করে আয় হয়েছে ৭৮১ কোটি ৮২ লাখ ডলার, যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ কম। পাশাপাশি ১৬ দশমিক ৯২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা কমেছে ওভেনে।
তৈরি পোশাক খাতে প্রবৃদ্ধি কমার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বন্ধ হচ্ছে কারখানা। তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র হিসাব অনুযায়ী ২০১৯ সালে কারখানা বন্ধ হয়েছে ৬২টি এবং চাকরি হারিয়েছেন ৩১ হাজার ৮০০ শ্রমিক।
তৈরি পোশাকের রপ্তানির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারখানা বন্ধ ও শ্রমিকদের চাকরি হারানো এবং পোশাক খাতের সংকটে আবর্ত হওয়ার পেছনে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে মার্কিন ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রা টাকার মান ধরে রাখা, প্রতিযোগী দেশগুলোর নানা কারণে সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে কারখানার শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। কিন্তু বিশ^বাজারে তৈরি পোশাকের দাম বাড়েনি। এছাড়া শ্রমিকদের দক্ষতা ঘাটতি ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে দুর্বলতা রয়েছে, যা প্রতিযোগী অন্য দেশগুলো অনেকখানি এগিয়ে গেলেও বাংলাদেশ সে হারে পারেনি। একই সঙ্গে তৈরি পোশাকের বাজার ও পণ্য বহুমুখীকরণের সাফল্য আসছে না। মুষ্টিমেয় কয়েকটি পণ্যের ওপর নির্ভর করে ইউরোপ-আমেরিকার পুরনো বাজারে পণ্য রপ্তানি করতে হচ্ছে।
বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি থাকলেও অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম এই বছরের প্রথম ১০ মাসে পোশাক রপ্তানি করেছে ২৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের রপ্তানিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা পোশাক খাত এখন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এই মুহূর্তে পোশাক খাতের জন্য চার ধরনের ডাইভার্সিফিকেশন (বহুমুখীকরণ) জরুরি। এগুলো হলোÑ পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণ, প্রক্রিয়াগত বৈচিত্র্য এবং দক্ষতা বাড়ানো। এক্ষেত্রে প্রতিযোগী দেশগুলো যে হারে এগিয়ে যাচ্ছে আমরা সেটা পারছি না। এক্ষেত্রে বিশেষ প্রণোদনা দরকার।
তিনি বলেন, রপ্তানির ভবিষ্যৎ গতি-প্রকৃতি নিয়ে ধারণা দেওয়া কঠিন। কেননা বৈশ্বিক বাজার খুবই অস্থির। সম্প্রতি বৈশ্বিক বাজার অস্থির হয়েছে বেশ কয়েকটি কারণে। ফলে নিকট ভবিষ্যতে তৈরি পোশাকে খাতের জন্য কোনো সুখবর দেওয়া যাচ্ছে না। তবে ২০২১ সাল নাগাদ ৫০ মিলিয়ন ডলার রপ্তানির যে টার্গেট ধরা হয়েছিল, সেটা যে অর্জন সম্ভব নয় সেটা নিশ্চিত।
তিনি বলেন, একের পর ছোট কারখানা বন্ধ হচ্ছে। কারণ তারা টিকে থাকতে পারছে না। পুঁজির বিরাট সংকট রয়েছে। রপ্তানিকারকদের জন্য মুদ্রা বিনিময় হার একটি বড় সমস্যা হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে আমরা প্রতি ডলার বিনিময় হারে অতিরিক্ত ৫ টাকা করে চেয়েছি। এছাড়া ১ শতাংশ বিশেষ প্রণোদনা পাওয়ার শর্তগুলো তুলে দিতে এবং প্রণোদনার ওপর ধার্য কর প্রত্যাহারের জন্যও সরকারকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জানিয়েছেন, ডলারের বিপরীতে কোনোভাবেই মুদ্রার মানের অবমূল্যায়ন করবে না সরকার। কেননা এই অবস্থার মধ্যেই রেমিট্যান্স ব্যাপক হারে বেড়েছে। এজন্য অবমূল্যায়ন ছাড়াও ব্যবসা বাণিজ্য বাড়তে অন্য উপায়ও রয়েছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ^ব্যাংকের ঢাকা অফিসের পরামর্শক ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিশ্ব বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা এবং রপ্তানি বৃদ্ধি ও এতে বৈচিত্র্য আনার ক্ষেত্রে দক্ষ সরবরাহ ব্যবস্থা অন্যতম চালিকাশক্তি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অবশ্যই উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা উন্নত করা হলে তা বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাক ও বস্ত্রের রপ্তানি বাড়বে, নতুন বাজারের সুযোগ নিয়ে আসবে। এছাড়া বৈশি^ক বাজার ধরতে দক্ষতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। প্রযুক্তির এই যুগে যেটায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, সাময়িকভাবে টাকাকে মার্কিন ডলারের বিপরীতে কিছুটা দুর্বল করে রেখেছে সরকার। এক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট রপ্তানিযোগ্য পোশাক বিশেষ সুবিধা পেতে পারে। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ কমিয়ে সুদের হার কমাতে হবে। এছাড়া তৈরি পোশাকসহ সর্বক্ষেত্রে ব্যবসার সুযোগ বাড়াতে ডুয়িং বিজনেসে উন্নতি করতে হবে।
ইপিবি সূত্রে জানা যায়, দেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এই খাত থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ডিসেম্বর পর্যন্ত রপ্তানি আয় এসেছিল ৩ হাজার ৪১৩ কোটি ৩২ লাখ ডলার।