ডিএসসিসি ওয়ার্ড-১৫

ধানমণ্ডির বিষফোঁড়া বাণিজ্যিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

১৯৪৭ সালের পরে ঢাকা ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনিক কেন্দ্র। সে সময় সরকারি কর্মকর্তা, রাজনীতিক, পূর্ব বাংলার ভূস্বামী ও ব্যবসায়ীদের বাসস্থান হিসেবে নির্ধারণ হয় ধানম-ি এলাকা। ঢাকার অভিজাত আবাসিক এলাকা বোঝাতে গুলশান-বনানীর পাশাপাশি এখনো আসে ধানমণ্ডির নাম। তবে এ কথা এখন স্বীকার করতে চান না খোদ ধানমণ্ডির পুরনো বাসিন্দারা। অসংখ্য স্কুল-কলেজ আর বণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ওই এলাকার বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ধানম-ি আবাসিক এলাকা, ১৫ নম্বর স্টাফ কোয়ার্টার, রায়েরবাজার হাইস্কুল এলাকা, ঈদগাহ রোড, শেরেবাংলা রোডের পূর্বাংশ, মিতালী রোড, হাজি আফসারউদ্দীন রোড ও হাতেমবাগ নিয়ে গঠিত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ১৫ নম্বর ওয়ার্ড। প্রায় ৫৫ হাজার ভোটারের এলাকায় পড়েছে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাড়িও, যেটি বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে পরিচিত। এই এলাকার মধ্যেই পড়েছে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাড়ি ও রাজনৈতিক কার্যালয়। বর্তমান সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রভাবশালী রাজনীতিকের বাড়িও রয়েছে এ এলাকায়।

তবে অসংখ্য স্কুল, কলেজ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখা, রেস্টুরেন্ট, শপিং মল, হোটেল, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যালয়, মোড়ে মোড়ে চা, ফুচকার দোকান, লেক ঘিরে তরুণ-তরুণীদের অবাধ চলাফেরা, মাদক সেবন, পানিতে ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধসহ নানা সমস্যায় রাজধানীর প্রথম অভিজাত এলাকা ধানমণ্ডির চরিত্র এখন ঢাকার আর দশটি এলাকার চরিত্র ধারণ করেছে।

১৫ নম্বর এলাকার বাসিন্দা মমতাজ বেগম (৭৫) জানান, গেল শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত ধানমণ্ডির তার অভিজাত চরিত্র ধরে রেখেছিল। ২০০০ সালের পর চরম অব্যবস্থাপনায় ঢাকার আর দশটা আবাসিক এলাকার মতোই হয়ে উঠেছে এই এলাকা। 

মমতাজ বেগমের মতোই এলাকাবাসীর অভিযোগ এখানকার প্রধান সমস্যা আবাসিক এলাকা ঘিরে গড়ে ওঠা অসংখ্য ইংরেজি মাধ্যম স্কুল ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের চাপে সকাল সাতটা থেকে সাড়ে নয়টা ও দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত দিনে দুবার সড়কে এতটাই যানজট থাকে যে হাঁটারও উপায় থাকে না।

ধানম-ি ঘিরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে কমপক্ষে ১০টি। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস আবাসিক এলাকার ভেতরেই। ধানমণ্ডির থেকে বাণিজ্যিক ও অবৈধ স্থাপনা সরাতে ২০১৭ সালের জুলাই মাসে উচ্চ আদালত ১০ মাসের সময়সীমা বেঁধে দিলেও দেড় বছরেও তা কার্যকর হয়নি। উল্টো নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান গজিয়ে উঠেছে।  

এলাকাবাসীর অভিযোগ, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাবের কারণে হাইকোর্টের আদেশ বাস্তবায়ন করতে পারছে না রাজউক। ব্যবসা করার সুযোগ দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ফুটপাতে দোকান বসিয়ে স্থানীয় নেতারা চাঁদাবাজি করেন বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এ ক্ষেত্রে পুলিশ প্রশাসন সহযোগীর ভূমিকা পালন করে।

সরেজমিনে দেখা যায়, আবাসিক এলাকা হলেও ধানমণ্ডির অলিগলিতে ময়লা-আবর্জনা স্তূপ করে রাখা হয়েছে। অধিকাংশ সড়কের অবস্থাও ভালো নয়। বৃষ্টি হলেই সড়ক ডুবে যায় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এলাকার জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ধানমণ্ডির লেকের বড় ভূমিকা থাকলেও অব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের গাফিলতির কারণে লেকের অবস্থাও খারাপ হয়ে পড়েছে। ভারী বৃষ্টিপাত হলে পানি ধারণের ক্ষমতা থাকে না লেকে। এ ছাড়া লেক ঘিরে তরুণ-তরুণী শ্রেণির অবাধ মেলামেশা, রাতভর মাদক সেবনও ধানমণ্ডির বাসীর উদ্বেগের কারণ।

আবাসিক এলাকায় না পড়া এলাকাগুলোর অবস্থা আরও শোচনীয়। ১৫ নম্বর স্টাফ কোয়ার্টার মোড় থেকে রায়েরবাজার হাইস্কুল-হাইস্কুল থেকে শেরেবাংলা রোডের টালি অফিস মোড় পর্যন্ত সড়ক ভাঙাচোরা। ১০ বছর ধরে এই সড়কের অবস্থা এমন বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

১৫ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর জাকির হোসেন স্বপন। তিনি এবার আওয়ামী লীগের সমর্থন চেয়ে পাননি। সমর্থন পেয়েছেন দলটির ধানমণ্ডি থানা শাখার সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বাবলা। অন্যদিকে বিএনপি থেকে দলের সমর্থন পেয়েছেন থানা বিএনপির সাংগাঠনিক সম্পাদক শফিকউদ্দিন ভূঁইয়া।

গতকাল সোমবার একাধিকবার রফিকুল ইসলামের ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।

বিএনপি সমর্থিত শফিকউদ্দিন ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, সময়ের ব্যবধানে ধানমণ্ডির  চেহারা বদলেছে ঠিকই তবে এখনো সব শেষ হয়ে যায়নি। এই ওয়ার্ডে আমরা দুজন কাউন্সিলর প্রার্থী। আমাদের মধ্যে কোনো সমস্যা নেই। আমাকে হয়রানিও করছে না কেউ। আমি নির্বাচিত হলে নিঃশ্বাস থাকা পর্যন্ত এলাকার উন্নয়নে কাজ করে যাব ইনশা আল্লাহ।