নতুন বছরের শুরুতেই মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ইরাকের বাগদাদ বিমানবন্দরে গত ৩ জানুয়ারি ইরানি ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ডের কদুস্ বাহিনীর প্রধান জেনারেল কাসেম সুলেইমানিকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় হত্যার মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ নিল। মার্কিন প্রশাসনের এই হত্যাকাণ্ড বিশ্বরাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতময় পরিস্থিতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
কাসেম সুলেইমানির হত্যার মধ্য দিয়ে চির-বৈরী মার্কিন-ইরান সম্পর্ক এখন যুদ্ধাবস্থায় পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অনেকে মহাসমরের আশঙ্কাও দেখছেন। কারণ উভয় পক্ষই অস্ত্র ভাণ্ডারে বেশ শক্তিশালী এবং উভয়ের সঙ্গেই রয়েছে পরশক্তি মিত্র। জেনারেল সুলেইমানি ইরানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তি বলে খ্যাত। যিনি স্বীয় কাজের জন্য সরাসরি একমাত্র ইরানের আধ্যাত্মিক নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কাছেই জবাবদিহি করতেন। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরায়েল-সৌদি-বলয়ের প্রভাব মোকাবিলা এবং ইরানের আধিপত্য বিস্তারে যার ভূমিকা ও তৎপরতা ছিল সবচেয়ে বেশি। ফলে কাসেম সুলেইমানিকে হত্যা করা মার্কিন প্রশাসনের কাছে যেমন বড় বিজয়, তেমনি ইরানের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। ২০০৫ সালের জেনারেল সুলেইমানি আমেরিকার কালো তালিকাভুক্ত হন এবং গত ২০ বছর থেকে তাকে হত্যার অনেক পরিকল্পনা করা হলেও, কোনো মার্কিন রাষ্ট্রপতিই এ ঝুঁকি নিতে চাননি বা কূটনৈতিক পরিস্থিতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার কথা ভেবে বাস্তবায়ন করেননি। এমনকি ২০১৮ সালে তুরস্কে সৌদি দূতাবাসে সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যার আগে জেনারেল সুলেইমানিকে হত্যার জন্য মার্কিন প্রশাসন নতুন পরিকল্পনা করেছিল কিন্তু কোনো কারণবশত সেটা আর বাস্তবায়ন করেনি। বর্তমান মার্কিন প্রশাসন এমন একসময় কাসেম সুলেইমানিকে হত্যা করল, যখন কূটনৈতিক ক্ষেত্রে মার্কিন-ইরান সম্পর্ক ইতিহাসের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি উত্তেজনাপূর্ণ এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে মার্কিন-ইসরায়েল-সৌদি আরব ক্রমে ইরানের নীতি ও প্রভাব বিস্তারের কৌশলের কাছে পরাস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট যখন খুব বাজে সময় পার করছেনÑ অভিশংসন নিয়ে।
এ বছরের শেষদিকে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ফলে নির্বাচনের আগে ট্রাম্প নিজের ক্ষমতা দেখাতে এবং বিরোধী দলের অভিশংসনের কৌশলী মোকাবিলার জন্যও কাসেম সুলেইমানিকে হত্যা করে মার্কিনিদের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করে থাকতে পারেন বলেও ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। ট্রাম্প ২০১৬ সালে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে বলেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্য ও আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করবেন। কিন্তু গত প্রায় চার বছরে তিনি তা করতে পারেননি। ফলে তার এই ব্যর্থতা ঢাকার জন্য মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করছেন বলেও অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন। এই পরিস্থিতির ওপর ভর করে আগামী নির্বাচনের ফল নিজের অনুকূলে টানার একটা চেষ্টাও রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ২০০৮ সালে নির্বাচনে জয়ের পর সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ২০১০ সালে ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার মধ্য দিয়ে মার্কিনিদের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। ২০১২ সালের নির্বাচনে পুনরায় জয়ের পেছনে লাদেন হত্যার বিষয়টিও ফল দিয়েছিল। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, কাসেম সুলেইমানির মতো একজন ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ ব্যক্তিকে হত্যার ফলে মার্কিন রাজনীতিতে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিকে ইস্যু করে আগামী নির্বাচনের ফল নিজের অনুকূলে টানার ইচ্ছেও কাজ করছে। জেনারেল সুলেইমানিকে হত্যার পেছনে এসব দৃশ্যমান কারণের বাইরেও আরও কিছু কারণ রয়েছে।
মার্কিন আধিপত্য ও স্বার্থে আঘাত করে এমন যেকোনো ব্যক্তিকে হত্যার জন্য মার্কিন সেনাদের এবং সিআইএর চোরাগোপ্তা হামলার ইতিহাস অনেক লম্বা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গত শতকের ষাটের ও সত্তরের দশকে সিআইএ বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক বিরুদ্ধ মতের অনেক ব্যক্তির ওপর চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়েছে। সিআইএ যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিরোধী শক্তিকে হত্যা করতে হেন কোনো কাজ নেই যা করেনি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হামলা হচ্ছে, ১৯৬০ সালে কঙ্গোতে বিষাক্ত ইনজেকশনের মাধ্যমে প্যাট্রিক লুমুম্বাকে হত্যা, ডমিনিকান রিপাবলিকের রাফায়েল রুজিল্লো, কিউবা বিপ্লবের সঙ্গে জড়িত আর্নেস্ত চে গুয়েভারা হত্যাসহ আরও অসংখ্য রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে সমাজতন্ত্রের জাগরণের ভয় থেকে অসংখ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে। এল সালভাদরে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার উৎখাত করে সিআইএর প্রত্যক্ষ মদদে অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। তেমনি মেক্সিকোতে হত্যা করা হয় অনেক বিরোধী মতাদর্শের মানুষকে। এমনকি লাতিন আমেরিকার অনেক দেশে মার্কিন আধিপত্যের বিরোধিতার জন্য চার্চের অনেক যাজককে হত্যা করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য আরও কিছু চেষ্টা হচ্ছে ভিয়েতনামে নাগো দিয়েম ও কিউবার নেতা ফিদেল ক্যাস্ত্রোর ওপর হামলা। ক্যাস্ত্রোকে হত্যার জন্য সিআইএ খাদ্যে বিষ মেশানোর মতো ঘৃণ্য পন্থাও নিয়েছিল। এ ছাড়া ১৯৮৬ সালে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের সরাসরি নির্দেশে লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফির ওপর বোমা হামলা করা হয়। ২০০৮ সালে সিআইএ হিজবুল্লাহ নেতা ইমাদ মুঘনিয়াহকে হত্যার চেষ্টা চালায়। এতসব হত্যার জন্য যুক্তরাষ্ট্র কখনো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কেবল ‘প্রথাগত নিন্দা’ বাদে আর কোনো ধরনের বাধা বা প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়নি। তবে কাসেম সুলেইমানিকে হত্যার জন্য যেভাবে সরাসরি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং গণমাধ্যমের সামনে স্বীকারোক্তি দেওয়া হচ্ছে, এটা অতীতে কখনো দেখা যায়নি। তাই গুরুত্বের দিক থেকে কাসেম সুলেইমানির হত্যা অন্য সব হত্যাকাণ্ডের চেয়ে ভিন্নমাত্রা পেয়েছে।
জেনারেল সুলেইমানিকে হত্যার পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যে এই জেনারেলের কাছে মার্কিন-ইসরায়েল-সৌদি-বলয়ের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা পরাস্ত হওয়াকে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরায়েল-সৌদি-বলয়ের অন্যতম ও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইরান। ১৯৭৯ সালে বিপ্লবের পর থেকে ইরানের প্রধান বিরোধী পক্ষ যুক্তরাষ্ট্র। গত চল্লিশ বছর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতির অন্যতম বিরোধী পক্ষ ইরান। জেনারেল সুলেইমানি ১৯৯৮ সালের পর থেকে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা ও মধ্যপ্রাচ্যের আরব রাষ্ট্রগুলোতে ইরানের প্রভাব বিস্তারে নায়কের ভূমিকা পালন করে আসছেন। তখন থেকে ইরানিদের কাছে তিনি জাতীয় বীরের মর্যাদা লাভ করেন। আফগানিস্তান থেকে আফ্রিকার সুদান, লিবিয়া, মিসর পর্যন্ত ইরানের প্রভাব বৃদ্ধির পেছনে তার ভূমিকা ছিল অন্যতম। লিবিয়ায় হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহী, ইরাকে শিয়া মিলিশিয়া পপুলার মবিলাইজেশন, সিরিয়ার শিয়া মিলিশিয়া, ফিলিস্তিনে ইসলামিক জিহাদ, হামাসসহ অসংখ্য শিয়া মিলিশিয়া গ্রুপ পরিচালনার এবং রণকৌশল নির্ধারণে তার ভূমিকা ছিল প্রধান। আর এই সশস্ত্র বাহিনীগুলোর মূল লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে, মার্কিন-ইসরায়েল-সৌদি আধিপত্য মোকাবিলা করা; স্বীয় দেশগুলোর জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা ও ইরানের স্বার্থ রক্ষা করা। ফলে জেনারেল কামেস সুলেইমানি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতির অন্যতম শত্রু ও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। যার শেষ পরিণতি গত ৩ জানুয়ারি মার্কিন হামলায় তার মৃত্যু। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এক সুলেইমানি হত্যার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের এবং ওই সশস্ত্র গ্রুপগুলোর তৎপরতা কি বন্ধ করা সম্ভব হবে?
জেনারেল কাসেম সুলেইমানির মৃত্যু ইরানের জন্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের ওই সশস্ত্র বাহিনীগুলোর জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এর ফলে কখনোই ইরানের প্রভাব বিস্তার বন্ধ হবে না বা ওই সশস্ত্র বাহিনীগুলোর তৎপরতাও বন্ধ হবে না। এমনকি মিইয়েও পড়বে না। কেবল সংঘাতময় পরিস্থিতিকে আরও বাড়িয়ে দেওয়াই হয়েছে। এর ফলে ইরান প্রতিশোধ নিতে আরও তৎপর হবে। আর সেটা সরাসরি আঘাতের মাধ্যমে হবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ইরান কৌশলগত হামলার আশ্রয় নেবে। ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়বে এবং শিয়া মিলিশিয়া বাহিনীগুলোর গোপন হত্যা ও আক্রমণের তৎপরতা আরও বৃদ্ধি পাবে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-সৌদি স্বার্থ ও দেশগুলোর নাগরিকদের জীবন আরও বেশি হুমকির মুখে পড়বে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানভিত্তিক আন্তঃদেশীয় ঐক্য আরও সুদৃঢ় হবে। ইরাক-ইরান-সিরিয়া-ইয়েমেন-লেবাননে শিয়ারা বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছে। জেনারেল সুলেইমানি হত্যার মধ্য দিয়ে ওই দেশগুলোতে ধর্মীয় ও সংস্কৃতিগতভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টা আরও জোরালো হবে। তাই ট্রাম্প দৃশ্যমান যে উদ্দেশ্য নিয়ে সুলেইমানিকে হত্যা করেছে, তা হয়তো পূরণ হবে না। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যকে আরও জটিল ও সংঘাতময় পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেওয়া হলো বলেই বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এ ছাড়া সুলেইমানিকে হত্যার জন্য মার্কিন হামলা নিয়ে স্বীয় মিত্র দেশগুলো ‘নৈতিক বিড়ম্বনায়’ পড়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলোও এর নিন্দা জানিয়েছে এবং তারা মার্কিন নীতি নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত। অন্যদিকে পরাশক্তি চীন-রাশিয়া ইরানের পক্ষ নিয়েই কথা বলছে।
মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সংঘাতময় পরিস্থিতি তেলের দামের সঙ্গে অস্ত্রবাজারকেও চাঙ্গা করেছে। সৌদি-ইসরায়েল নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা আরও জোরদার করছে। ইরানের সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় সৌদি-বলয়ের রাষ্ট্রগুলো আরও অত্যাধুনিক অস্ত্র আমদানির দিকে ঝুঁকবে। এই অস্ত্রের সিংহভাগই আসবে আমেরিকা এবং তার মিত্র ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে। সুলেইমানি হত্যার ফলে ‘অস্ত্র অর্থনীতির’ অগ্রগতি হবে। আমেরিকা সন্ত্রাস দমন ও শান্তিপ্রতিষ্ঠার নামে জেনারেল কাসেম সুলেইমানিকে হত্যার মাধ্যমে সম্ভবত ইরানের ক্ষমতাসীনদের আরও সংহতই করল। এ ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। ট্রাম্প নিজের স্বার্থ কিছুটা হাসিল করতে পারলেও শান্তিপ্রতিষ্ঠায় বড় ধরনের অন্তরায় সৃষ্টি করলেন।
লেখক
সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
sadikiu 099 @gmail. com