রাজধানীর কুর্মিটোলায় ধর্ষণের শিকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ছাত্রীর বর্ণনা অনুযায়ী স্কেচ এঁকে অপরাধী শনাক্তের কাজ করছে পুলিশ। ঘটনাস্থলের কাছে থাকা বেশ কয়েকটি সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করে ফুটেজে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে ছাত্রীর বর্ণনা মিলিয়ে দেখার চেষ্টাও চলছে। পুলিশ বলছে, ঘটনাটি একটি ব্যস্ত সড়কের পাশে। সেখানে বহু মানুষের যাতায়াত। ভিডিও ফুটেজ ঝাপসা-অন্ধকারের মধ্যে, ফলে এখনো কিছু সুনির্দিষ্ট করা যায়নি। তবে গতকাল দুপরে টঙ্গী থেকে সন্দেহভাজন এক সিএনজিচালককে হেফাজতে নিয়েছে র্যাব। গতকাল রাতে র্যাবের গণমাধ্যম শাখার এক কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।
এদিকে ঢামেকের ওসিসিতে চিকিৎসাধীন ওই ছাত্রীর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিন। হাসপাতালে ওই ছাত্রী জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগমকে জানিয়েছেন, অপরাধী দেখলে তিনি চিনতে পারবেন।
রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানায় হওয়া মামলাটি মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে (ডিবি) হস্তান্তর করা হয়েছে। গতকাল ঢাকা মহানগর হাকিম বেগম ইয়াসমিন আরা মামলার এজাহার আমলে নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৮ জানুয়ারি দিন ধার্য করেছেন।
গতকাল মঙ্গলবার ডিবির উত্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও ডিএমপির গুলশান বিভাগের উপকমিশনারসহ (ডিসি) পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারেও (ওসিসি) ছাত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন।
গুলশানের ডিসি সুদীপ কুমার চক্রবর্তী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঘটনাস্থলের আশপাশে কয়েকটি সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেছে। সেটা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ঘটনাটি একটি ব্যস্ত সড়কের পাশে। সেখানে বহু মানুষের যাতায়াত। সেখান থেকে প্রকৃত ঘাতক শনাক্ত করার চেষ্টা করছি আমরা। প্রযুক্তিগত তদন্তের পাশাপাশি বিশ্বস্ত গুপ্তচর নিয়োগ করে তদন্ত করা হচ্ছে। মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনা করে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থানা থেকে ডিবি উত্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ডিবির তদন্তে অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে মামলার তদন্তকাজ এগিয়ে নেবেন।
ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. শাহজাহান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেসব ফুটেজ পাওয়া গেছে সেগুলো আসলে ঝাপসা এবং অন্ধকারের মধ্যে। এসব ফুটেজ থেকে প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত করা খুবই দুরূহ। তারপরও বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করে ফুটেজগুলো পরিচ্ছন্ন করার চেষ্টা চলছে।’ তদন্তে অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি বলেন, এখন উল্লেখ করার মতো কোনো অগ্রগতি হয়নি।
ডিবি উত্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পরিদর্শক দেশ রূপান্তরকে বলেন, গতকাল পুলিশের একটি দল ভিকটিমের (ঢাবি ছাত্রী) সঙ্গে কথা বলেছে। ওই তরুণী অপরাধীর একটি বিবরণ পুলিশকে বলেছেন। সেখান থেকে আসামির একটি স্কেচ আঁকার চেষ্টা চলছে। স্কেচের সঙ্গে ফুটেজে থাকা ছবিগুলো মিলিয়ে অপরাধীকে শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলে ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
এদিকে গতকালও পুলিশের একাধিক টিম ঘটনাস্থলে গিয়েছে। তারা ঘটনাস্থলের ম্যাপ এঁকেছে। তাতে তরুণী কোন দিক থেকে এসেছেন, তার সামনে-পেছনে কারা ছিল, সম্ভাব্য কোন স্থান থেকে মুখ চেপে তাকে তুলে নেওয়া হয়েছে সেসব বিষয়ে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক শাখার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ঘটনাস্থল থেকে বেশ কয়েকটি হাত ও পায়ের ছাপ সংগ্রহ করা হয়েছে। সেগুলো প্রযুক্তির মাধ্যমে বায়োমেট্রিক করে এনআইডিতে রক্ষিত আঙুলের ছাপের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। এর মাধ্যমে অপরাধী শনাক্তের কাছাকাছি পৌঁছতে পারবে পুলিশ।
ঘটনাস্থলের কাছে রফিক নামে এক ভ্রাম্যমাণ চা বিক্রেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঝোপঝাড়ে ঢাকা অন্ধকারের মধ্যে যে স্থানটিতে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে সেখানে মাঝেমধ্যে কিছু তরুণকে গাঁজাসহ মাদকদ্রব্য সেবন করতে দেখা যায়। তবে সেখানে লোকজনের যাতায়াত থাকে খুবই কম।
ছাত্রীর শারীরিক অবস্থার উন্নতি : ঢামেকের ওসিসিতে চিকিৎসাধীন ছাত্রীর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিন। গতকাল দুপুরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ছাত্রীর জন্য গঠিত সাত সদস্যের মেডিকেল বোর্ড সকালেও মেয়েটিকে দেখেছে। তারা মেয়েটির ফিজিক্যাল কন্ডিশনে ট্রমা বা বিশেষ কিছু পায়নি। সে প্রথম থেকেই মানসিকভাবে শক্ত রয়েছে। সার্বিকভাবে গতকাল আরেকটু স্বাভাবিকের দিকে এগোচ্ছে। আশা করি দুয়েক দিনের মধ্যে তাকে ছেড়ে দিতে পারব।
অপরাধীকে দেখলে চিনতে পারবেন ওই ছাত্রী : জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম বলেছেন, তিনি ধর্ষণের শিকার ছাত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। সে অপরাধীকে দেখলে চিনতে পারবে। তার কথার ভিত্তিতে অপরাধীর একটা স্কেচ করা যেতে পারে। এতে আসামি দ্রুত শনাক্ত হবে। নাছিমা বেগম গতকাল দুপুরে ঢামেকের ওসিসিতে ওই ছাত্রীকে দেখতে যান। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
নাছিমা আরও বলেন, মেয়েটি সাহসী। তাকে ধর্ষণের সব আলামত পাওয়া গেছে। তিনি আশা করেন, দ্রুত আসামি ধরা পড়বে। মেয়েটি বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে। কোনো আলামত নষ্ট হতে দেয়নি। এখন পরীক্ষা করে ডিএনএ মিলিয়ে প্রকৃত ধর্ষককে শনাক্ত করা কঠিন হবে না।
প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ২৮ জানুয়ারি : গতকাল ঢাকা মহানগর হাকিম বেগম ইয়াসমিন আরা মামলার এজাহার আমলে নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৮ জানুয়ারি দিন ধার্য করেন। ওই ছাত্রীর বাবা রবিবার রাতেই ক্যান্টনমেন্ট থানায় একটি মামলা করেন। সোমবার এজাহারটি আমলে নেয় আদালত। এছাড়া ঢাবি কর্র্তৃপক্ষ আরও একটি অভিযোগ শাহবাগ থানায় দিয়েছে। দুটি অভিযোগই তদন্ত করবে ডিবি পুলিশ।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, রাজধানীর শেওড়াপাড়া এলাকায় বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে করে গত রবিবার বিকেল ৫টা ৪০ মিনিটের দিকে রওনা দেন ওই শিক্ষার্থী। রাত ৭টার দিকে বাসটি কুর্মিটোলায় থামে। বাস থেকে নেমে ওই শিক্ষার্থী ফুটপাত দিয়ে শেওড়াপাড়ার দিকে হাঁটা শুরু করেন। গলফ ক্লাব মাঠসংলগ্ন স্থানে গেলে পেছন থেকে অজ্ঞাতনামা আসামি (বয়স ২৫ থেকে ৩০) তার গলা চেপে ধরেন। এতে ওই ছাত্রী অচেতন হয়ে পড়েন। এরপর তাকে ধর্ষণ করা হয়। পাশাপাশি মারধরও করা হয় তাকে। ছাত্রীর ব্যাগ, মোবাইল ফোন ও দুই হাজার টাকা নিয়ে যায় ধর্ষক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী গত রবিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে রাজধানীর শেওড়া এলাকায় বান্ধবীর বাসার উদ্দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে ওঠেন। তিনি ‘ভুলবশত’ কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের কাছে নেমে পড়েন। সেখান থেকে হেঁটে বান্ধবীর বাসার দিকে যাওয়ার সময় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি মুখ চেপে ধরলে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। পরে তাকে পাশের ঝোপের মধ্যে নিয়ে দুদফা ধর্ষণ করা হয়। রাত ১০টার দিকে চেতনা ফেরার পর তিনি বান্ধবীর বাসায় যান এবং তাকে ঘটনাটি জানান। খবর পেয়ে সহপাঠীরা তাকে ঢাবি ক্যাম্পাসে নিয়ে যায়। পরে রাতে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) ভর্তি করা হয়। পরদিন সোমবার ঘটনাস্থল থেকে ছাত্রীর ব্যবহৃত ব্যাগ, ঘড়ি, বইখাতা, ইনহেলারসহ বেশকিছু আলামত উদ্ধার করা হয়।