ঢাবি ছাত্রীকে ভবঘুরে ভেবে অপহরণের পরিকল্পনা ছিল

মজনু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থীকে ভবঘুরে ভেবে কুর্মিটোলা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল বলে জানিয়েছেন পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) কর্মকর্তারা। আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গতকাল বৃহস্পতিবার তাকে আদালতের মাধ্যমে সাত দিনের রিমান্ডে নিয়েছে ডিবি পুলিশ। এদিকে ওই শিক্ষার্থীর ধর্ষকের ফাঁসির দাবিতে গতকালও ঢাবিতে নানা কর্মসূচি পালিত হয়েছে। ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুর দাবি করেছেন, কুর্মিটোলার ঘটনায় গ্রেপ্তার মজনু আসল ধর্ষক কি না, জনগণ সে প্রশ্ন তুলেছে। ঘটনার পর থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওই শিক্ষার্থী গতকাল হাসপাতাল ছেড়েছেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি)

ডিবি কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, মজনু তাদের জিজ্ঞাসাদে আরও বলেছে, ফুটপাত ধরে হেঁটে চলা ঢাবি ছাত্রীকে সে পেছন দিক থেকে আচমকা আক্রমণ করে। এরপর গলা চেপে ধরে পাঁজাকোলা করে ক্ষিপ্রগতিতে ঝোপের আড়ালে নিয়ে যাওয়ার সময় চেঁচামেচি করলে তাকে কিল-ঘুষি ও চড়-থাপ্পড় মারে। তলপেটে লাথি দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয়। বুকের ওপর দাঁড়িয়ে হত্যার হুমকি দিয়ে ধর্ষণ করে।

গত বুধবার ভোরে রাজধানীর শেওড়া রেল ক্রসিং এলাকা থেকে র‌্যাব-১ মজনুকে গ্রেপ্তার করে। এরপর তার মাধ্যমে ঢাবির ওই ছাত্রীর ব্যাগ, মোবাইল পাওয়ার ব্যাংক উদ্ধার করে। পরে রাতেই উদ্ধার করা আলামতসহ মজনুকে ডিবির কাছে হস্তান্তর করে র‌্যাব।

গতকাল ডিবি পুলিশ মজনুকে আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের কাছে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করে। আবেদনে বলা হয়, ৫ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই ছাত্রী রাজধানীর কুর্মিটোলা বাসস্ট্যান্ড থেকে ফুটপাত দিয়ে হেঁটে গলফ ক্লাবসংলগ্ন স্থানে পৌঁছান। এ সময় আসামি মজনু তাকে পেছন থেকে গলা ধরে মাটিতে ফেলে দেয়। তার গলা চেপে ধরে। ছাত্রী চিৎকার করতে গেলে মজনু তাকে কিল-ঘুষি মারে। ভয়ভীতি দেখায়। ছাত্রী অজ্ঞান হয়ে গেলে তাকে ধর্ষণ করে আসামি মজনু। আসামির স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, তার কাছ থেকে ভুক্তভোগী ছাত্রীর খোয়া যাওয়া সামগ্রী উদ্ধার করা হয়। আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছে। মজনু অভ্যাসগত ধর্ষক। প্রতিবন্ধী ও ভ্রাম্যমাণ নারীদের ধর্ষণ করে আসছে সে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় আর কেউ জড়িত কি না, তা জানতে এই আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা জরুরি। আদালত বক্তব্য শুনে মজনুকে সাত দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমতি দেয়।

ডিবির উত্তর বিভাগের উপকমিশনার মশিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, র‌্যাবের কাছ থেকে আসামি বুঝে পাওয়ার পর বুধবার রাত থেকেই জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়। জিজ্ঞাসাবাদে মজনু মেয়েটির ওপর নানা ধরনের নির্যাতনের কথা স্বীকার করেছে। নির্যাতনের পরও সেখানে উপস্থিত থাকার কারণ হিসেবে মজনু জানায়, মেয়েটিকে তার মতোই বাবা-মা ছাড়া ভবঘুরে মনে হয়েছে। এ কারণে তাকে সেখান থেকে তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা করছিল। ভেবেছিল, বিভিন্ন কৌশলে বশ করে তাকে বউ বানাবে।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, ধর্ষণের পর মেয়েটির কাছে ৫০০ টাকা দাবি করেছিল। মেয়েটি তখন তার ব্যাগে টাকা আছে জানালে মজনু অন্ধকারে ওই ব্যাগ খুঁজতে থাকে। একপর্যায়ে ব্যাগ পাওয়ার পর সেখানে টাকা খুঁজতে থাকে। এই ফাঁকেই মেয়েটি পালিয়ে যান। তারা আরও জানান, মেয়েটির ব্যাগ তল্লাশি করে মোবাইল ফোন ও কিছু টাকা খুঁজে পায় মজনু। এরপর ব্যাগে আরও টাকা খুঁজতে খুঁজতেই মেয়েটিকে হারিয়ে ফেলে। ঘটনাস্থলে মজনুর সঙ্গে মেয়েটির ধস্তাধস্তি হওয়ায় মেয়েটির হাতঘড়ি খুলে পড়ে যায়। অন্ধকার থাকায় মজনুর চোখে পড়েনি ঘড়িটি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট অপর এক কর্মকর্তা বলেন, সিরিয়াল রেপিস্ট মজনুর বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের জন্য তার দীর্ঘ সময়ের একাধিক সঙ্গীকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, মজনুর শরীরে নানা ধরনের জটিল রোগ বাসা বেঁধেছে। এ ছাড়া কিছুদিন আগে নারায়ণগঞ্জের ভাসমান যৌনকর্মীদের এক দালাল মজনুকে ধরে নিয়ে ভ্যাসেকটমি করিয়ে দিয়েছে।

ডিবির উপকমিশনার মশিউর রহমান বলেন, ‘আমাদের জিজ্ঞাসাবাদে ঢাবির ছাত্রীকে নির্যাতনের কথা স্বীকার করেছে মজনু। মজনুর ছবিও শনাক্ত করেছেন তিনি। এ ছাড়া তার কাছ থেকে উদ্ধার করা বিভিন্ন আলামত শনাক্ত করেছেন তিনি।’ জিজ্ঞাসাবাদকারী অপর এক কর্মকর্তা জানান, মজনু সাইকো-টাইপের ভবঘুরে। দিনের পর দিন ভবঘুরে নারী, ভিক্ষুক ও প্রতিবন্ধী নারীদের ধর্ষণের ঘটনা ঘটিয়েছে। তিনি জানান, কুর্মিটোলার ফুটপাত থেকে ঢাবি ছাত্রীকে তুলে নিয়ে ধর্ষণের আগে ও পরে পৈশাচিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটিয়েছে মজনু। প্রথমদিকে মেয়েটি তার হাত থেকে বাঁচার জন্য চিৎকার করেছিলেন, কিন্তু রাস্তায় চলাচলকারী দ্রুতগতির যানবাহনের শব্দের কারণে তার আর্তনাদের কথা কেউ জানতে পারেনি। কেউ এগিয়ে যাননি। এতে মজনু আরও বেপরোয়া আচরণ শুরু করে। নোয়াখালী আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় নাটকীয় সংলাপ ও খিস্তি-খেউর করতে থাকে। এতে মেয়েটি চরম বিপর্যস্ত অবস্থায় পড়েন। কিছু সময় অচেতন থাকেন। আবার চেতনা ফিরে পাওয়ার পর বেহুঁশ হওয়ার ভান ধরে পালানোর পথ খুঁজতে থাকেন। কিন্তু মজনু তাকে ঘিরে নানা ধরনের জঙ্গি আচরণ করায় সাহস হারিয়ে ফেলেন।

এদিকে ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-ের দাবিতে গতকাল বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত রাজু ভাস্কর্যের সামনে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী’ ব্যানারে অবস্থান কর্মসূচি ও ফ্ল্যাশমব কর্মসূচি পালন করেছেন একদল শিক্ষার্থী। এ সময় তারা ‘আজ না হলে হবে কবে? টনক তোমার নড়বে কবে?’ ‘ধর্ষকের শাস্তি, ফাঁসি ফাঁসি’, ‘আমার সোনার বাংলায় ধর্ষকের ঠাই নাই’ ইত্যাদি সেøাগান দেন।

দুপুর ১২টায় অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ থেকে ডাকসুর সদস্য তানভীর হাসান সৈকতের নেতৃত্বে কালো পতাকা মিছিল বের করা হয়। সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যে ধর্ষকের কুশপুত্তলিকা দাহ করার মধ্য দিয়ে মিছিলটি শেষ হয়। এর আগে সকাল ১০টায় অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে মানববন্ধন করেন বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থীরা। একই স্থানে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মানববন্ধন করেন ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

গতকাল বিকেলে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশ থেকে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ আয়োজন করে ধর্ষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে পদযাত্রা কর্মসূচি। এতে ডাকসুর ভিপি নুর বলেন, ধর্ষক গ্রেপ্তার হয়েছে। কিন্তু এখানে স্বস্তির পরিবর্তে একটি উদ্বেগের জায়গা তৈরি হয়েছে যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি কতটুকু অনাস্থা থাকলে, মানুষ অপরাধীকে ধরা নিয়েও প্রশ্ন তুলতে পারে। আপনারা দেখছেন, মানুষ প্রশ্ন তুলেছে সে আসল ধর্ষক নাকি ‘জজ মিয়া নাটক’। তিনি বলেন, আমরা জানি না কে আসল ধর্ষক। ধরে নিচ্ছি সেই প্রকৃত অপরাধী, কিন্তু দেশের জন্য এটি এলার্মিং যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি দিন দিন এভাবে অনাস্থা তৈরি হয়েছে। সুতরাং সরকারকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। এ সময় সব নিপীড়নের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজকে সোচ্চার থাকার আহ্বান জানান ভিপি নুর।

হাসপাতাল ছাড়লেন ঢাবি ছাত্রী : কুর্মিটোলায় ধর্ষণের শিকার হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ঢাবি ছাত্রীকে গতকাল দুপুরে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিন জানান, মেডিকেল বোর্ড গতকাল সকালেও মেয়েটিকে সার্বিকভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে এবং এরপরই তারা মেয়েটিকে ছাড়পত্র দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তাকে ছাড়পত্র দেন। মেয়েটি শারীরিক ও মানসিকভাবে এখন ভালো আছে। তার পরবর্তী চিকিৎসার জন্য কিছু উপদেশ ও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এক সপ্তাহ পরে তাকে পরবর্তী চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আসতে বলা হয়েছে। মেয়েটির বাবা প্রধানমন্ত্রী, বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ, চিকিৎসক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, মিডিয়াকর্মীসহ সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন বলে জানান তিনি। ছাত্রীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক বলেন, ‘মেয়েটি খুব সাহসী। এত বড় একটি বিষয় ফেস করেছে। হাসপাতালসহ সবার সহযোগিতা পাওয়ায় মেয়েটি বড় কোনো ট্রমার মধ্য ছিল না। ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির জন্য যে স্ট্যান্ডার্ড প্রটোকল, তা ফলো করা হয়েছে। ধর্ষণের কারণে মেয়েটি যাতে কোনো সংক্রমণ রোগে আক্রান্ত না হয়, তার জন্য সার্বিক ব্যবস্থাপনা নেওয়া হয়েছে।’ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হাসপাতাল ছাড়ার পর তিনি একটি শেল্টার হোমে থাকবেন।